Auto Draft

271

unnamedআলমডাঙ্গা অফিস: মহান মুক্তিযুদ্ধোত্তর ৪৫ বছরেও অগ্নিসেনা হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাননি পাকিস্থানের জাতীয় পতাকায় অগ্নি সংযোগের দায়ে কারাভোগকারি আলমডাঙ্গা কালিদাসপুর গ্রামের অসম সাহসি বীর মুক্তিযোদ্ধা মঈন উদ্দীন। জীবন সায়াহ্নে পাকিস্থান বিরোধি আন্দোলনে এ অসামান্য অবদানের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দাবি করেছেন তিনি। ১৯৭০সালের মে মাস। প্রতাবশালী সামরিকজান্তা ইয়াহিয়া খান পাকিস্থানের রাষ্ট্র প্রধান। দেশে মার্শাল ল জারি করা হয়েছে। ন্যায্য দাবিতে আন্দোলনরত ঢাকার পোস্তাগোলা ও চট্রগ্রামের শ্রমিকদের উপর নির্বিচারে গুলি বর্ষণ করে শ্রমিক হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় বিষ্ফোরনোন্মুখ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্থানের মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়ে। সারা দেশের মত আলমডাঙ্গায়ও তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা কাজী কামালের নেতৃত্বে আলমডাঙ্গা পাইলট হাইস্কুলের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল বের করে। মার্শাল ল উপেক্ষা করে শহরের হাইরোডে মিছিল এগিয়ে চলে। মিছিল অল্পক্ষণেই পৌঁছে যায় আলমডাঙ্গা থানার সামনে। মিছিলের পুরোভাগে থেকে রাস্তার দু’পাশের সকল ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কালো পতাকা তোলার দায়িত্ব পালন করছিলেন কালিদাসপুরের মৃত গঞ্জের আলির ছেলে মঈন উদ্দীন। মিছিল থানার সামনে পৌঁছলে তৎকালীন ছাত্র মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল লতিফ ও ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ুয়া নজরুল ইসলামকে সাথে নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা মঈন উদ্দীন ঢুকে পড়েন থানা চত্ত্বরে। দাবি তোলেন পাকিস্থানের জাতীয় পতাকার পাশাপাশি কালো পতাকা উড্ডীয়নের। কিন্তু আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্রস্তাব মানতে রাজি হয় না পুলিশ কর্মকর্তা এসআই সিরাজুল ইসলাম। পুলিশের সাথে তর্কাতর্কির এক পর্যায়ে মঈন উদ্দীন থানায় উড্ডীয়ন পাকিস্থানের জাতীয় পতাকা নামিয়ে তাতে অগ্নি সংযোগ করে ভস্মিভূত করেন বলে দাবি করেন তিনি। পতাকার দন্ডে উড়িয়ে দিলেন আন্দোলনকারীদের কালো পতাকা। স্তম্ভিত হয়ে পড়েন পুলিশ-প্রশাসন। এ দুঃসাহসিক ঘটনাকে তৎকালীন সরকার রাষ্ট্রদ্রোহ হিসেবে নেয়। তখন তিনি আলমডাঙ্গা পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ১০ম শ্রেণির ছাত্র। মামলা করা হয় মার্শাল ল আইনে। গ্রেফতার হন মঈন উদ্দিন ও আঃ লতিফ ও নজরুল। পরবর্তীকালে নজরুলকে ছেড়ে দিলেও মঈন উদ্দিন ও আঃ লতিফকে চুয়াডাঙ্গা জেলা হাজতে প্রেরণ করা হয়। সামরিক বিধিতে বিচারে ১৯৭০ সালে ২১ জুনে ৬ মাসের কারাদন্ডাদেশ হয় ২ জনের। কিশোর অপরাধি হিসেবে শাস্তি কিছুটা লঘু করা হয়। ওই বছর ১৭ ডিসেম্বর তারা কারামুক্ত হন। জেল থেকে বের হয়ে দেখেন দেশে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে। ৭১ সালের এপ্রিল মাসে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়ে তিনি ভারতের বেতাই ও আসামের লোয়ার হাফলং-এ ট্রেইনিং –এ যোগদান করেন। ট্রেইনিং শেষে সর্বাত্মক যুদ্ধ করেছেন থানা মুজিব বাহিনির কমান্ডার কাজী কালাল ও মারফত আলির নেতৃত্বে। মিরপুর উপজেলার খলিষাকুন্ডি, কাকিলাদহ, হালসা ও আলমডাঙ্গা উপজেলার বিভিন্নস্থানে যুদ্ধ করেছেন বীরত্বের সাথে। খলিষাকুন্ডির সম্মুখ যুদ্ধে এ কিশোর ফায়ারিং গ্রুপের লিডার ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে তার অসামান্য অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে। অথচ তার এ অসামান্য অবদানের যথার্থ স্বীকৃতি তিনি আজও পাননি। স্বাধীনতা ও মুক্তি সংগ্রামে তার অসাম্য অবদানকে স্বীকৃতি দিতে মুক্তিযোদ্ধাসহ এলাকাবাসি তাকে অগ্নিসেনা উপাধি দিয়েছেন। আলমডাঙ্গা পৌরসভা কর্তৃক ২০১২ সালে তাকে অগ্নিসেনা হিসেবে স্বর্ণ পদকে ভূষিত করেছে। ১৯৯৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদের সন্ধ্যাকালীন অধিবেশনে এলাকাবাসির ইচ্ছার সাথে সঙ্গতি বিধান করে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতির জন্য মাননীয় স্পীকারের নিকট অনুরোধ করেছিলেন চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের তৎকালীন সাংসদ শামসুজ্জামান দুদু। আলমডাঙ্গা পৌরসভার মেয়র মীর মহিউদ্দীনও তাঁর রাষ্টীয় স্বীকৃতির জন্য প্রধানমন্ত্রির দফতরে বেশ কিছু প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন। তবে সে চেষ্টার কোন শুভ ফলোদয় হয়নি। বয়সের ভারে ন্যূজ অসুস্থ্য এ বীর মুক্তিযোদ্ধা জীবনের এই সায়াহ্নে পৌঁছে তার আর কোন উচ্চাভিলাষ নেই। শুধু মৃত্যুর আগে রাষ্ট্রীয়ভাবে অগ্নিসেনা হিসেবে স্বীকৃতি দাবি তার।