ইপেপার । আজরবিবার, ২১ জুলাই ২০২৪, ৬ শ্রাবণ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

শিক্ষকদের কর্মবিরতিতে অচল ৫৫ বিশ্ববিদ্যালয়

সমীকরণ প্রতিবেদন:
  • আপলোড টাইম : ১১:৫২:৩১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২ জুলাই ২০২৪
  • / ২২ বার পড়া হয়েছে

নতুন সর্বজনীন পেনশন স্কিম ‘প্রত্যয়’কে বৈষম্যমূলক ও কম সুবিধার মনে করছেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা। তাই প্রচলিত সরকারি পেনশনে থাকার দাবিতে গতকাল সোমবার থেকে সর্বাত্মক কর্মবিরতি শুরু করেছেন তারা। এই কর্মবিরতির কারণে ৫৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস, পরীক্ষা, প্রশাসনিক কার্যক্রমসহ সব ধরনের অ্যাকাডেমিক কাজ অচল হয়ে পড়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের কর্মসূচিও গতকাল সোমবার সীমিত আকারে পালন করা হয়েছে। ওই কর্মসূচিতে প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা শিক্ষক ছাড়া আর কোনো শিক্ষকদের দেখা যায়নি। ৫৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক রয়েছেন ১৬ হাজারের কিছু বেশি। কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সংখ্যা ৩৪ হাজার।
দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সব বিশ্ববিদ্যালয়েই ক্লাস, পরীক্ষা ও অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ আছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অফিসার ও কর্মচারী সমিতিও শিক্ষকদের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে কর্মবিরতিতে গেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরি খোলার দাবিতে শিক্ষার্থীরা গতকাল সোমবার লাইব্রেরির সামনে ইটপাটকেল ছুঁড়েছেন। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের ব্যানারে দাবি না মানা পর্যন্ত অনির্দিষ্টকালের জন্য এই কর্মবিরতি চলবে বলে জানিয়েছেন ফেডারেশনের সভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. নিজামুল হক ভুঁইয়া। তারা সর্বজনীন পেনশন ‘প্রত্যয়’-এর প্রজ্ঞাপন বাতিল ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের সুপার গ্রেডে অন্তর্ভুক্তি এবং শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন স্কেল চালুর দাবিতে কর্মবিরতি শুরু করেছেন।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. মমিন উদ্দিন বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সর্বজনীন পেনশনে অন্তর্ভুক্ত করার প্রজ্ঞাপন জারির পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচজন অধ্যাপকের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি বৈষম্যের জায়গাগুলো স্পষ্ট করেছে। ওই প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে দেয়া হয়েছে। প্রতিবেদনের সঙ্গে আমরা সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা একমত। তাই আমরা আন্দোলন শুরু করেছি। আমরা আগের সরকারি পেনশনেই থাকতে চাই।’ তিনি জানান, ‘এখন যে সরকারি নিয়মে আমরা পেনশন পাই, তাতে আমাদের বেতন থেকে কোনো টাকা কাটা হয় না। পুরোটাই সরকার বহন করে। কিন্তু নতুন নিয়মে আমাদের বেতনের শতকরা ১০ ভাগ কেটে রাখা হবে। আর একজন অধ্যাপক অবসরের সময় গ্রাচ্যুইটি হিসেব এককালীন ৮০ লাখ টাকা পান। উনি যতদিন বেঁচে থাকবেন, ততদিন পেনশন পাবেন। মারা যাওয়ার পর তার স্ত্রী বা স্বামী মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত ওই পেনশন পাবেন। কিন্তু নতুন নিয়মে গ্রাচ্যুইটি নাই। আবার ৭৫ বছর বয়স পর্যন্ত পেনশন দেয়া হবে। পেনশন ভোগীর স্বামী বা স্ত্রীর ক্ষেত্রেও তাই।’
তার কথা, ‘এই নতুন পেনশন এখন থেকে যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতায় যোগ দেবেন, তাদের জন্য কার্যকর হবে। আমরা অধ্যাপকেরা অবসরে গেলে পেনশন পাবো সরকারি নিয়মে মাসিক ৪৫ হাজার টাকা করে। কিন্তু এখন লেকচারার হিসেবে যোগ দিয়ে যারা অবসরে যাবেন, তারা বেতনের ১০ শতাংশ করে দিয়ে অধ্যাপক হওয়ার পর অবসরে গেলে মাসে পাবেন এক লাখ ২৪ হাজার টাকা করে পেনশন। আমরা হিসাব করে দেখেছি তারা চাকরি জীবনে যে পরিমাণ টাকা দেবেন, তা ব্যাংকে রাখলে যে আসল ও প্রিমিয়াম পাবেন, তাও সমপরিমাণ। ‘ফলে নতুন পেনশনে নানা দিক থেকেই আমাদের সুবিধা কমিয়ে দেয়া হচ্ছে। এবং এটা বৈষ্যম্যমূক। এটা আমাদের ওপর প্রভাব না ফেললেও নতুন যারা আসবেন, তাদের ওপর প্রভাব ফেলবে। সরকারি চাকরি বা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার একটি বিষয় হলো অবসর জীবনে একটু ভালো থাকা, নিশ্চিত থাকা। কিন্তু এরকম হলে তো মেধাবীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা পেশায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন,’ যোগ করেন তিনি।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান বলেন, ‘নতুন পেনশন ব্যবস্থায় আমাদের অন্তর্ভূক্ত করার প্রজ্ঞাপন জরি করে আমাদের ক্ষতির মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আমাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনাও করা হয়নি। আমাদের কাছ থেকে নেয়া টাকাই আসলে সুদসহ আমাদের ফেরত দেয়া হবে। এখানে সরকারের কোনো অংশগ্রহণ আসলে থাকবে না। এটা নিরাপত্তাহীনতাও তৈরি করবে।’ ‘আর নতুন নিয়মে অবসরের বয়স বলা হয়েছে ৬০ বছর। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অবসরের বয়স ৬৫ বছর। অর্জিত ছুটির বিপরীতে টাকা পাওয়ার ব্যবস্থা নাই। বছরে পেনশন পাঁচ শতাংশ হারে বাড়ে। নতুন নিয়মে বাড়বে না। অবসর প্রস্তুতিমূলক ছুটির ব্যাপারে কিছু বলা নাই। মাসিক চিকিৎসা ভাতা, উৎসব ভাতার ব্যাপারে কিছু বলা নেই,’ জানান তিনি। তিনি বলেন, ‘এই পরিস্থিতি নিয়ে আমরা আমাদের রিপোর্টের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের একাধিক বৈঠকে আলোচনা ও বিশ্লেষণ করে চূড়ান্ত পর্যায়ে আন্দোলনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
অর্থ বিভাগ গত ১৩ মার্চ সর্বজনীন পেনশন কর্সসূচি ‘প্রত্যয়ের’ প্রজ্ঞাপন জারি করে। এই কর্মসূচি বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ), ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশসহ (আইসিবি) সব রাষ্ট্রমালিকানাধীন ও সরকারি ব্যাংক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, সাধারণ বীমা করপোরেশনসহ সব করপোরেশন, পেট্রোবাংলা, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি), বিএসটিআইসহ প্রায় ৪০০ সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের নতুন কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য। ১ জুলাই সোমবার থেকে এটা কার্যকর করা হয়েছে। ১ জুলাই থেকে যারা এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে যোগ দেবেন, তারা এই নতুন পেনশনের আওতায় পড়বেন।
এদিকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এখনো প্রচলিত সরকারি পেনশন নীতির আওতায়ই আছেন। তবে অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী তার বাজেট বক্তৃতায় সরকারি চাকরিজীবীদেরও সর্বজনীন পেনশনের আওতায় আনার কথা বলেছেন। সেটা ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে চালু হবে। তার নাম হবে ‘সেবক’। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের সভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক নিজামুল হক ভুঁইয়া বলেন, ‘সরকারি চাকরিজীবীদের আগামী বছর সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় নেয়া হবে। তাদেরটার নাম হবে সেবক। তাদের জন্য আলাদা কেন? আর এক বছর পরে কেন? আমাদেরও সরকার সেবকে নিক এবং একই সময়ে নিতো। আমাদের ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়া হলো কেন? এসব কী? এর নিশ্চয়ই ভিন্ন উদ্দেশ্য আছে। এটা অবশ্যই বৈষ্যম্যমূলক।’
তার কথা, ‘আমরা এই পেনশনে যে ক্ষতি ও বৈষম্য, তা গবেষণা করে সরকারকে জানিয়েছি। শিক্ষামন্ত্রী এবং শিক্ষামন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের সঙ্গে দেখা করেছি। কিন্তু আমরা কোনো সমাধান পাইনি। তাই বাধ্য হয়ে আমরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা সর্বাত্মক কর্মবিরতি শুরু করেছি। আমাদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এই কর্মবিরতি চলবে। এটা আমাদের মর্যাদা এবং অস্তিত্বের প্রশ্ন।’ এদিকে সরকারের দিক থেকে এই কর্মবিরতির ব্যাপারের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া গতকাল সোমবার পাওয়া যায়নি। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন কোনো প্রতিক্রিয়া জানাতে অপারগতা প্রকাশ করে।
তবে শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী গত রোববার এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘পেনশন বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্তটি শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নয়, সব স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের জন্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আলাদা কিছু করতে হলে সেইভাবেই অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে।’ সর্বাত্মক কর্মবিরতির ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অচলবস্থা হলে কী হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘গণতান্ত্রিক দেশে সবার রাজনীতি ও বাকস্বাধীনতার অধিকার আছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’ চারটি আলাদা কর্মসূচি নিয়ে সর্বজনীন পেনশন শুরু হয় গত বছরের ১৭ আগস্ট থেকে। এগুলো হলো প্রগতি, সুরক্ষা, প্রবাস ও সমতা। কর্মসূচিগুলোর আওতায় এখন পর্যন্ত তিন লাখ ৩২ হাজার ৭৭৩ জন গ্রাহক হয়েছেন। জমা পড়েছে ৯৭ কোটি টাকা। আর ১ জুলাই থেকে শুরু হলো আরেকটি স্কিম প্রত্যয়।

ট্যাগ :

নিউজটি শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন

শিক্ষকদের কর্মবিরতিতে অচল ৫৫ বিশ্ববিদ্যালয়

আপলোড টাইম : ১১:৫২:৩১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২ জুলাই ২০২৪

নতুন সর্বজনীন পেনশন স্কিম ‘প্রত্যয়’কে বৈষম্যমূলক ও কম সুবিধার মনে করছেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা। তাই প্রচলিত সরকারি পেনশনে থাকার দাবিতে গতকাল সোমবার থেকে সর্বাত্মক কর্মবিরতি শুরু করেছেন তারা। এই কর্মবিরতির কারণে ৫৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস, পরীক্ষা, প্রশাসনিক কার্যক্রমসহ সব ধরনের অ্যাকাডেমিক কাজ অচল হয়ে পড়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের কর্মসূচিও গতকাল সোমবার সীমিত আকারে পালন করা হয়েছে। ওই কর্মসূচিতে প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা শিক্ষক ছাড়া আর কোনো শিক্ষকদের দেখা যায়নি। ৫৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক রয়েছেন ১৬ হাজারের কিছু বেশি। কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সংখ্যা ৩৪ হাজার।
দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সব বিশ্ববিদ্যালয়েই ক্লাস, পরীক্ষা ও অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ আছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অফিসার ও কর্মচারী সমিতিও শিক্ষকদের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে কর্মবিরতিতে গেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরি খোলার দাবিতে শিক্ষার্থীরা গতকাল সোমবার লাইব্রেরির সামনে ইটপাটকেল ছুঁড়েছেন। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের ব্যানারে দাবি না মানা পর্যন্ত অনির্দিষ্টকালের জন্য এই কর্মবিরতি চলবে বলে জানিয়েছেন ফেডারেশনের সভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. নিজামুল হক ভুঁইয়া। তারা সর্বজনীন পেনশন ‘প্রত্যয়’-এর প্রজ্ঞাপন বাতিল ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের সুপার গ্রেডে অন্তর্ভুক্তি এবং শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন স্কেল চালুর দাবিতে কর্মবিরতি শুরু করেছেন।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. মমিন উদ্দিন বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সর্বজনীন পেনশনে অন্তর্ভুক্ত করার প্রজ্ঞাপন জারির পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচজন অধ্যাপকের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি বৈষম্যের জায়গাগুলো স্পষ্ট করেছে। ওই প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে দেয়া হয়েছে। প্রতিবেদনের সঙ্গে আমরা সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা একমত। তাই আমরা আন্দোলন শুরু করেছি। আমরা আগের সরকারি পেনশনেই থাকতে চাই।’ তিনি জানান, ‘এখন যে সরকারি নিয়মে আমরা পেনশন পাই, তাতে আমাদের বেতন থেকে কোনো টাকা কাটা হয় না। পুরোটাই সরকার বহন করে। কিন্তু নতুন নিয়মে আমাদের বেতনের শতকরা ১০ ভাগ কেটে রাখা হবে। আর একজন অধ্যাপক অবসরের সময় গ্রাচ্যুইটি হিসেব এককালীন ৮০ লাখ টাকা পান। উনি যতদিন বেঁচে থাকবেন, ততদিন পেনশন পাবেন। মারা যাওয়ার পর তার স্ত্রী বা স্বামী মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত ওই পেনশন পাবেন। কিন্তু নতুন নিয়মে গ্রাচ্যুইটি নাই। আবার ৭৫ বছর বয়স পর্যন্ত পেনশন দেয়া হবে। পেনশন ভোগীর স্বামী বা স্ত্রীর ক্ষেত্রেও তাই।’
তার কথা, ‘এই নতুন পেনশন এখন থেকে যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতায় যোগ দেবেন, তাদের জন্য কার্যকর হবে। আমরা অধ্যাপকেরা অবসরে গেলে পেনশন পাবো সরকারি নিয়মে মাসিক ৪৫ হাজার টাকা করে। কিন্তু এখন লেকচারার হিসেবে যোগ দিয়ে যারা অবসরে যাবেন, তারা বেতনের ১০ শতাংশ করে দিয়ে অধ্যাপক হওয়ার পর অবসরে গেলে মাসে পাবেন এক লাখ ২৪ হাজার টাকা করে পেনশন। আমরা হিসাব করে দেখেছি তারা চাকরি জীবনে যে পরিমাণ টাকা দেবেন, তা ব্যাংকে রাখলে যে আসল ও প্রিমিয়াম পাবেন, তাও সমপরিমাণ। ‘ফলে নতুন পেনশনে নানা দিক থেকেই আমাদের সুবিধা কমিয়ে দেয়া হচ্ছে। এবং এটা বৈষ্যম্যমূক। এটা আমাদের ওপর প্রভাব না ফেললেও নতুন যারা আসবেন, তাদের ওপর প্রভাব ফেলবে। সরকারি চাকরি বা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার একটি বিষয় হলো অবসর জীবনে একটু ভালো থাকা, নিশ্চিত থাকা। কিন্তু এরকম হলে তো মেধাবীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা পেশায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন,’ যোগ করেন তিনি।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান বলেন, ‘নতুন পেনশন ব্যবস্থায় আমাদের অন্তর্ভূক্ত করার প্রজ্ঞাপন জরি করে আমাদের ক্ষতির মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আমাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনাও করা হয়নি। আমাদের কাছ থেকে নেয়া টাকাই আসলে সুদসহ আমাদের ফেরত দেয়া হবে। এখানে সরকারের কোনো অংশগ্রহণ আসলে থাকবে না। এটা নিরাপত্তাহীনতাও তৈরি করবে।’ ‘আর নতুন নিয়মে অবসরের বয়স বলা হয়েছে ৬০ বছর। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অবসরের বয়স ৬৫ বছর। অর্জিত ছুটির বিপরীতে টাকা পাওয়ার ব্যবস্থা নাই। বছরে পেনশন পাঁচ শতাংশ হারে বাড়ে। নতুন নিয়মে বাড়বে না। অবসর প্রস্তুতিমূলক ছুটির ব্যাপারে কিছু বলা নাই। মাসিক চিকিৎসা ভাতা, উৎসব ভাতার ব্যাপারে কিছু বলা নেই,’ জানান তিনি। তিনি বলেন, ‘এই পরিস্থিতি নিয়ে আমরা আমাদের রিপোর্টের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের একাধিক বৈঠকে আলোচনা ও বিশ্লেষণ করে চূড়ান্ত পর্যায়ে আন্দোলনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
অর্থ বিভাগ গত ১৩ মার্চ সর্বজনীন পেনশন কর্সসূচি ‘প্রত্যয়ের’ প্রজ্ঞাপন জারি করে। এই কর্মসূচি বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ), ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশসহ (আইসিবি) সব রাষ্ট্রমালিকানাধীন ও সরকারি ব্যাংক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, সাধারণ বীমা করপোরেশনসহ সব করপোরেশন, পেট্রোবাংলা, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি), বিএসটিআইসহ প্রায় ৪০০ সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের নতুন কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য। ১ জুলাই সোমবার থেকে এটা কার্যকর করা হয়েছে। ১ জুলাই থেকে যারা এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে যোগ দেবেন, তারা এই নতুন পেনশনের আওতায় পড়বেন।
এদিকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এখনো প্রচলিত সরকারি পেনশন নীতির আওতায়ই আছেন। তবে অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী তার বাজেট বক্তৃতায় সরকারি চাকরিজীবীদেরও সর্বজনীন পেনশনের আওতায় আনার কথা বলেছেন। সেটা ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে চালু হবে। তার নাম হবে ‘সেবক’। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের সভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক নিজামুল হক ভুঁইয়া বলেন, ‘সরকারি চাকরিজীবীদের আগামী বছর সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় নেয়া হবে। তাদেরটার নাম হবে সেবক। তাদের জন্য আলাদা কেন? আর এক বছর পরে কেন? আমাদেরও সরকার সেবকে নিক এবং একই সময়ে নিতো। আমাদের ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়া হলো কেন? এসব কী? এর নিশ্চয়ই ভিন্ন উদ্দেশ্য আছে। এটা অবশ্যই বৈষ্যম্যমূলক।’
তার কথা, ‘আমরা এই পেনশনে যে ক্ষতি ও বৈষম্য, তা গবেষণা করে সরকারকে জানিয়েছি। শিক্ষামন্ত্রী এবং শিক্ষামন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের সঙ্গে দেখা করেছি। কিন্তু আমরা কোনো সমাধান পাইনি। তাই বাধ্য হয়ে আমরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা সর্বাত্মক কর্মবিরতি শুরু করেছি। আমাদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এই কর্মবিরতি চলবে। এটা আমাদের মর্যাদা এবং অস্তিত্বের প্রশ্ন।’ এদিকে সরকারের দিক থেকে এই কর্মবিরতির ব্যাপারের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া গতকাল সোমবার পাওয়া যায়নি। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন কোনো প্রতিক্রিয়া জানাতে অপারগতা প্রকাশ করে।
তবে শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী গত রোববার এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘পেনশন বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্তটি শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নয়, সব স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের জন্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আলাদা কিছু করতে হলে সেইভাবেই অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে।’ সর্বাত্মক কর্মবিরতির ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অচলবস্থা হলে কী হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘গণতান্ত্রিক দেশে সবার রাজনীতি ও বাকস্বাধীনতার অধিকার আছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’ চারটি আলাদা কর্মসূচি নিয়ে সর্বজনীন পেনশন শুরু হয় গত বছরের ১৭ আগস্ট থেকে। এগুলো হলো প্রগতি, সুরক্ষা, প্রবাস ও সমতা। কর্মসূচিগুলোর আওতায় এখন পর্যন্ত তিন লাখ ৩২ হাজার ৭৭৩ জন গ্রাহক হয়েছেন। জমা পড়েছে ৯৭ কোটি টাকা। আর ১ জুলাই থেকে শুরু হলো আরেকটি স্কিম প্রত্যয়।