ইপেপার । আজরবিবার, ২১ জুলাই ২০২৪, ৫ শ্রাবণ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

চলতি আউশ মৌসুমেও পানি নেই চুয়াডাঙ্গার জিকে ক্যানেলে

বাড়তি সেচ খরচে দিশাহারা কৃষকরা

সমীকরণ প্রতিবেদক:
  • আপলোড টাইম : ০৮:১৮:২৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৩ জুন ২০২৪
  • / ১৭ বার পড়া হয়েছে

ছবি: পানিশূন্য জিকে সেচ খাল। সদর উপজেলার আমিরপুর গ্রাম থেকে তোলা ছবি।


গত বোরো মৌসুমে গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্পের (জিকে) চুয়াডাঙ্গা জেলার খালগুলোতে পানি ছিল না। পাম্প নষ্ট থাকায় পানি সরবরাহ করা যায়নি। এখন চলতি আউশ ধান রোপনের মৌসুমেও একই অবস্থা। খালে পানি নেই। ভুগর্ভস্ত থেকে পানি তুলে জমি প্রস্তুত করে কৃষকরা আউস ধান চাষাবাদ করছেন। এ কারণে শুরুতেই মোটা অংকের টাকা খরচ হয়ে যাচ্ছে কৃষকদের। একইভাবে বোরো মৌসুমেও বাড়তি সেচ খরচের কারণে কৃষক লাভবান হতে পারেননি। কৃষকরা বলছেন, গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্পের মতো বড় আয়োজন এখন আর কৃষকদের কোনো কাজে আসছে না।

চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক বিভাস চন্দ্র সাহা জানান, জিকে সেচ প্রকল্পের আওতাধীন চাষযোগ্য জমির পরিমাণ ৭ হাজার ৫০০ হেক্টর। এখন চলছে আউশ মৌসুম। চলতি জুন মাসের ৩০ তারিখ পর্যন্ত আউশ ধান রোপন করবেন কৃষকরা। জেলায় ৪৬ হাজার ৭০০ হেক্টর জমিতে আউশ চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ বছর লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করবে বলে আশা করা যাচ্ছে। চুয়াডাঙ্গা জেলায় জিকে সেচ প্রকল্প আছে আলমডাঙ্গা ও সদর উপজেলায়। এই দুটি উপজেলায় আউশের লক্ষ্যমাত্রা আছে ২৩ হাজার ১৮০ হেক্টর জমিতে। আউশ বৃষ্টিনির্ভর চাষ। এই সময়ে বৃষ্টি থাকে। অথচ এ বছর এখন পর্যন্ত চুয়াডাঙ্গায় বৃষ্টি নেই। কৃষকরা জমি প্রস্তুত করেছেন সেচ দিয়ে। জিকে সেচ খালে পানি থাকলে কৃষকদের সুবিধা হতো। বাড়তি সেচ খরচ লাগতো না। এসময়ে বৃষ্টি হয়। এ কারণে সেচের প্রয়োজন পড়ে না। এবারের আবহাওয়া ভিন্ন। আশানুরুপ বৃষ্টি হয়নি।

জেলার আলমডাঙ্গা উপজেলা ও চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার জিকে সেচ খালের আওতাধীনের কৃষকদের অভিযোগ, অন্তত ৭-৮ বছর আগে থেকেই কৃষকরা ঠিকভাবে সেচ খালে পানি পাচ্ছেন না। অথচ সেচ সুবিধা দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েই জিকে সেচ প্রকল্প চালু করা হয়েছিল। এ বছর বোরো মৌসুমের আগে থেকেই সেই সুবিধা একেবারেই নেই। এখন আউশ মৌসুমেও সেচ খালে পানি নেই, আকাশেও বৃষ্টি নেই। এসময় জিকে সেচ খালে পানি থাকলে কৃষকদের অনেক সুবিধা হতো।

চুয়াডাঙ্গা পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৫১ সালে প্রাথমিক জরিপের পর ১৯৫৪ সালে জিকে সেচ প্রকল্প অনুমোদন পায়। চালু হয় ১৯৬২-৬৩ সালে। শুরুতে বছরের ১০ মাস (১৫ জানুয়ারি থেকে ১৫ অক্টোবর) দিনরাত ২৪ ঘণ্টা তিনটি পাম্পের মাধ্যমে পানি তোলা হতো। বাকি দুই মাস চলতো রক্ষণাবেক্ষণ। ১৯৩ কিলোমিটার প্রধান খাল, ৪৬৭ কিলোমিটার শাখা খাল ও ৯৯৫ কিলোমিটার প্রশাখা খালের মাধ্যমে সেচ প্রকল্পের পানি কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ ও মাগুরা জেলার ১৩টি উপজেলায় সরবরাহ করা হয়।

পাউবো কর্মকর্তারা জানান, মূলত আমন চাষে পানির ঘাটতি মেটাতে প্রকল্প শুরু হয়েছিল। পরে তা সারা বছরই তিন মৌসুমেই কাজে আসছিল। পদ্মার পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় ৩-৪ বছর আগে থেকে বোরো মৌসুমে শুধু কুষ্টিয়া ও চুয়াডাঙ্গা জেলায় পানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা হয়। সরেজমিনে সেচ খাল এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, খাল পানি শূন্য। খালের মাঝখানে কৃষকরা গরু চরাচ্ছেন।

কৃষকদের সংগঠন চুয়াডাঙ্গা জেলা কৃষক জোটের সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান আলী বিশ্বাস বলেন, এ বছর বোরো মৌসুমে জিকে সেচ খালে পানি ছিল না। কৃষকরা জমিতে আবাদ করতে পারছিলেন না। ওইসময় আমরা পানির জন্য পাউবোর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলেছি। আলমডাঙ্গা উপজেলা পরিষদের নির্বাহী কর্মকর্তার সাথে কথা বলেছি। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমরা ভালো সাড়া পেয়েছি। কিন্তু পানি উন্নয়ন বোর্ড কৃষকদের কোনো উপকারে আসতে পারেনি। তারা ব্যর্থ হয়েছেন পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে। যেসব অসুবিধার কারণে সেচ খালগুলোতে পানি সরবরাহ বিঘ্নিত হয় সেগুলোর দিকে বিশেষ নজর দিয়ে পানি সরবরাহ নিশ্চিত রাখা দরকার। বছরের যে সময়ে সেচের প্রয়োজন কম, সেই সময়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড তাদের যান্ত্রিক ত্রুটিগুলো ঠিক করে নিতে পারেন। প্রয়োজনে দেশের বাইরে থেকেও বিশেষজ্ঞ এনে হলেও পানি সরবরাহ নিশ্চিত রাখা দরকার।

তিনি বলেন, এ বছর চুয়াডাঙ্গা জেলায় বোরো মৌসুমে বৃষ্টিপাত হয়নি। তীব্র খরার খারণে পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে ভুগর্ভস্ত থেকে পানি তুলতেও ব্যর্থ হয়েছেন কৃষক। এ বছর জিকে খালে পানি থাকা কতো যে জরুরি ছিল, তা একমাত্র ভুক্তভোগী কৃষকই অনুধাবন করেছেন। এখন আউশ মৌসুম। এখনো আশানুরুপ বৃষ্টি নেই। সেচ খালে পানিও নেই। এ অবস্থা যেন আগামী বছর না হয় সেই লক্ষে এখন থেকেই উদ্যোগী হতে হবে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে।

চুয়াডাঙ্গা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফ আহমেদ বলেন, জিকে সেচ খালে পানি সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ উদ্যোগ নিয়েছেন। আশা করা যায়, জিকে সেচ খালে পানি সমস্যার সমাধান হবে।

ট্যাগ :

নিউজটি শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন

চলতি আউশ মৌসুমেও পানি নেই চুয়াডাঙ্গার জিকে ক্যানেলে

বাড়তি সেচ খরচে দিশাহারা কৃষকরা

আপলোড টাইম : ০৮:১৮:২৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৩ জুন ২০২৪


গত বোরো মৌসুমে গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্পের (জিকে) চুয়াডাঙ্গা জেলার খালগুলোতে পানি ছিল না। পাম্প নষ্ট থাকায় পানি সরবরাহ করা যায়নি। এখন চলতি আউশ ধান রোপনের মৌসুমেও একই অবস্থা। খালে পানি নেই। ভুগর্ভস্ত থেকে পানি তুলে জমি প্রস্তুত করে কৃষকরা আউস ধান চাষাবাদ করছেন। এ কারণে শুরুতেই মোটা অংকের টাকা খরচ হয়ে যাচ্ছে কৃষকদের। একইভাবে বোরো মৌসুমেও বাড়তি সেচ খরচের কারণে কৃষক লাভবান হতে পারেননি। কৃষকরা বলছেন, গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্পের মতো বড় আয়োজন এখন আর কৃষকদের কোনো কাজে আসছে না।

চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক বিভাস চন্দ্র সাহা জানান, জিকে সেচ প্রকল্পের আওতাধীন চাষযোগ্য জমির পরিমাণ ৭ হাজার ৫০০ হেক্টর। এখন চলছে আউশ মৌসুম। চলতি জুন মাসের ৩০ তারিখ পর্যন্ত আউশ ধান রোপন করবেন কৃষকরা। জেলায় ৪৬ হাজার ৭০০ হেক্টর জমিতে আউশ চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ বছর লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করবে বলে আশা করা যাচ্ছে। চুয়াডাঙ্গা জেলায় জিকে সেচ প্রকল্প আছে আলমডাঙ্গা ও সদর উপজেলায়। এই দুটি উপজেলায় আউশের লক্ষ্যমাত্রা আছে ২৩ হাজার ১৮০ হেক্টর জমিতে। আউশ বৃষ্টিনির্ভর চাষ। এই সময়ে বৃষ্টি থাকে। অথচ এ বছর এখন পর্যন্ত চুয়াডাঙ্গায় বৃষ্টি নেই। কৃষকরা জমি প্রস্তুত করেছেন সেচ দিয়ে। জিকে সেচ খালে পানি থাকলে কৃষকদের সুবিধা হতো। বাড়তি সেচ খরচ লাগতো না। এসময়ে বৃষ্টি হয়। এ কারণে সেচের প্রয়োজন পড়ে না। এবারের আবহাওয়া ভিন্ন। আশানুরুপ বৃষ্টি হয়নি।

জেলার আলমডাঙ্গা উপজেলা ও চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার জিকে সেচ খালের আওতাধীনের কৃষকদের অভিযোগ, অন্তত ৭-৮ বছর আগে থেকেই কৃষকরা ঠিকভাবে সেচ খালে পানি পাচ্ছেন না। অথচ সেচ সুবিধা দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েই জিকে সেচ প্রকল্প চালু করা হয়েছিল। এ বছর বোরো মৌসুমের আগে থেকেই সেই সুবিধা একেবারেই নেই। এখন আউশ মৌসুমেও সেচ খালে পানি নেই, আকাশেও বৃষ্টি নেই। এসময় জিকে সেচ খালে পানি থাকলে কৃষকদের অনেক সুবিধা হতো।

চুয়াডাঙ্গা পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৫১ সালে প্রাথমিক জরিপের পর ১৯৫৪ সালে জিকে সেচ প্রকল্প অনুমোদন পায়। চালু হয় ১৯৬২-৬৩ সালে। শুরুতে বছরের ১০ মাস (১৫ জানুয়ারি থেকে ১৫ অক্টোবর) দিনরাত ২৪ ঘণ্টা তিনটি পাম্পের মাধ্যমে পানি তোলা হতো। বাকি দুই মাস চলতো রক্ষণাবেক্ষণ। ১৯৩ কিলোমিটার প্রধান খাল, ৪৬৭ কিলোমিটার শাখা খাল ও ৯৯৫ কিলোমিটার প্রশাখা খালের মাধ্যমে সেচ প্রকল্পের পানি কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ ও মাগুরা জেলার ১৩টি উপজেলায় সরবরাহ করা হয়।

পাউবো কর্মকর্তারা জানান, মূলত আমন চাষে পানির ঘাটতি মেটাতে প্রকল্প শুরু হয়েছিল। পরে তা সারা বছরই তিন মৌসুমেই কাজে আসছিল। পদ্মার পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় ৩-৪ বছর আগে থেকে বোরো মৌসুমে শুধু কুষ্টিয়া ও চুয়াডাঙ্গা জেলায় পানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা হয়। সরেজমিনে সেচ খাল এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, খাল পানি শূন্য। খালের মাঝখানে কৃষকরা গরু চরাচ্ছেন।

কৃষকদের সংগঠন চুয়াডাঙ্গা জেলা কৃষক জোটের সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান আলী বিশ্বাস বলেন, এ বছর বোরো মৌসুমে জিকে সেচ খালে পানি ছিল না। কৃষকরা জমিতে আবাদ করতে পারছিলেন না। ওইসময় আমরা পানির জন্য পাউবোর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলেছি। আলমডাঙ্গা উপজেলা পরিষদের নির্বাহী কর্মকর্তার সাথে কথা বলেছি। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমরা ভালো সাড়া পেয়েছি। কিন্তু পানি উন্নয়ন বোর্ড কৃষকদের কোনো উপকারে আসতে পারেনি। তারা ব্যর্থ হয়েছেন পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে। যেসব অসুবিধার কারণে সেচ খালগুলোতে পানি সরবরাহ বিঘ্নিত হয় সেগুলোর দিকে বিশেষ নজর দিয়ে পানি সরবরাহ নিশ্চিত রাখা দরকার। বছরের যে সময়ে সেচের প্রয়োজন কম, সেই সময়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড তাদের যান্ত্রিক ত্রুটিগুলো ঠিক করে নিতে পারেন। প্রয়োজনে দেশের বাইরে থেকেও বিশেষজ্ঞ এনে হলেও পানি সরবরাহ নিশ্চিত রাখা দরকার।

তিনি বলেন, এ বছর চুয়াডাঙ্গা জেলায় বোরো মৌসুমে বৃষ্টিপাত হয়নি। তীব্র খরার খারণে পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে ভুগর্ভস্ত থেকে পানি তুলতেও ব্যর্থ হয়েছেন কৃষক। এ বছর জিকে খালে পানি থাকা কতো যে জরুরি ছিল, তা একমাত্র ভুক্তভোগী কৃষকই অনুধাবন করেছেন। এখন আউশ মৌসুম। এখনো আশানুরুপ বৃষ্টি নেই। সেচ খালে পানিও নেই। এ অবস্থা যেন আগামী বছর না হয় সেই লক্ষে এখন থেকেই উদ্যোগী হতে হবে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে।

চুয়াডাঙ্গা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফ আহমেদ বলেন, জিকে সেচ খালে পানি সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ উদ্যোগ নিয়েছেন। আশা করা যায়, জিকে সেচ খালে পানি সমস্যার সমাধান হবে।