ইপেপার । আজবৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০২৪, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

গভীর ক্ষত রেখে গেছে রেমাল ; উপকূলে বাড়তি সহায়তা দরকার

সমীকরণ প্রতিবেদন
  • আপলোড টাইম : ১০:২৪:০২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৩ জুন ২০২৪
  • / ১৬ বার পড়া হয়েছে

ঘূর্ণিঝড় রেমাল উপকূলে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষয়ক্ষতির ছাপ রেখে গেছে। এর বিস্তৃতি ছিল ৪০০ কিলোমিটার এলাকা। বাংলাদেশের ১৯ জেলা রেমালের আওতায় পড়েছে। এর প্রভাবে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা ছিল ১২ ফুট। এতে ৪৬ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে ইতোমধ্যে একটি সমীক্ষা চালানো হয়। ত্রাণ মন্ত্রণালয়, জাতিসঙ্ঘের একটি অঙ্গ সংস্থা এবং দেশী-বিদেশী আরো কয়েকটি সংস্থা মিলে চালিত সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, রেমাল উপকূলের জনপদে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। উপকূলে ক্রমে বৈরী হয়ে ওঠা জীবনযাপন আরো কঠিন করে তুলবে রেমালের ক্ষতি। নতুন করে দুস্থ হয়ে পড়বে আরো মানুষ। তাদের সুরক্ষায় প্রয়োজন হবে নতুন সহায়তার।

সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত আটটি জেলার ৮০ হাজার ৫৯১ হেক্টর জমি জলোচ্ছ্বাসে তলিয়ে যায়। এতে ফসলের ৪৭ শতাংশ বিনষ্ট হয়েছে। সবচেয়ে ভয়াবহ দিকটি হলো- পানি ও মাটি লবণাক্ত হওয়া। এতে প্রাণপ্রকৃতি আরো প্রতিকূলতায় পড়েছে। গবাদিপশুর খাদ্যসঙ্কট দেখা দিয়েছে। অথচ এসব এলাকার মানুষের অর্থনীতি মূলত সামান্য ফসলি জমি এবং গবাদিপশু। এ অবস্থায় পশুখাদ্য কেনা অনেকের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফসল উৎপাদন কষ্টসাধ্য হবে। খাদ্য উৎপাদন হবে ব্যাহত। সমীক্ষায় জানা যাচ্ছে, এর মধ্যে গবাদিপশু বিক্রি করে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছেন অনেকে।

ক্ষতিগ্রস্ত ৪২ শতাংশ পরিবারের মধ্যে ৮৫ শতাংশ তাৎক্ষণিকভাবে গবাদিপশু বিক্রি করে এবং খাবার কম খেয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করছে। ৮৬ শতাংশ পরিবার রান্নার জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারছে না। ৮৪ শতাংশ পরিবারের আয় কমে গেছে। তাদের মধ্যে ৯৪ শতাংশ কোনো সহায়তা পাচ্ছে না। ৪৩ শতাংশ মানুষের পক্ষে বাসস্থানে ফিরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু করা সম্ভব হয়নি। ৭০ শতাংশ গবাদিপশুর খাবার ও ৮২ শতাংশ মানুষের সুপেয় পানি সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়েছে।

দুরে‌্যাগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযাযী, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় নগদ পাঁচ কোটি ৭৫ লাখ টাকা, পাঁচ হাজার ৫০০ টন চাল এবং শিশু ও গো-খাদ্যের জন্য চার কোটি ৯০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে, যা চাহিদার তুলনায় খুবই কম। তা ছাড়া সরকারি সাহায্য প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে পৌঁছতে পারছে কি না তা নিয়েও যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। আক্রান্ত এলাকায় ২০ হাজার ২৬০টি পুকুরে নোনা পানি ঢুকেছে। এগুলোর পানি মূলত ঘরগৃহস্থালির কাজে ব্যবহার হয়; পাশাপাশি মাছের চাহিদা পূরণ করে। ভূগর্ভের পানি উত্তোলনের চাপকলও ঝড়ে নষ্ট হয়েছে। এবার তীব্র তাপদাহের সময় দক্ষিণাঞ্চলজুড়ে সুপেয় পানির অভাব দেখা দেয়। রেমালের আঘাতে ওই পরিস্থিতি আরো জটিল করে তুলেছে।

লক্ষণীয়, এ অঞ্চলের স্যানিটেশন ব্যবস্থা দুর্বল। ঘূর্ণিঝড় স্বাস্থ্যঝুঁকি আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। এক দিকে সুপেয় পানির অভাব, অন্য দিকে স্যানিটেশন ঝামেলায় আশঙ্কা করা হচ্ছে; পানিবাহিত রোগের প্রকোপ বাড়তে পারে। একই সাথে স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো রেমালের আঘাতের সময় আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করায় এগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব এলাকায় মানুষের সাথে সাথে পশুপাখিও ঝুঁকিতে পড়েছে। মানুষের জন্য শুকনো খাবার সরবরাহের পরামর্শ দেয়া হয়েছে। সেই সাথে গবাদিপশুর জন্যও পর্যাপ্ত খাবার পৌঁছাতে হবে। সাথে জরুরি কৃষি উপকরণ সরবরাহ করতে হবে। বীজ-সারের পাশাপাশি নগদ অর্থ সহায়তাও দিতে হবে কৃষকদের।

ট্যাগ :

নিউজটি শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন

গভীর ক্ষত রেখে গেছে রেমাল ; উপকূলে বাড়তি সহায়তা দরকার

আপলোড টাইম : ১০:২৪:০২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৩ জুন ২০২৪

ঘূর্ণিঝড় রেমাল উপকূলে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষয়ক্ষতির ছাপ রেখে গেছে। এর বিস্তৃতি ছিল ৪০০ কিলোমিটার এলাকা। বাংলাদেশের ১৯ জেলা রেমালের আওতায় পড়েছে। এর প্রভাবে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা ছিল ১২ ফুট। এতে ৪৬ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে ইতোমধ্যে একটি সমীক্ষা চালানো হয়। ত্রাণ মন্ত্রণালয়, জাতিসঙ্ঘের একটি অঙ্গ সংস্থা এবং দেশী-বিদেশী আরো কয়েকটি সংস্থা মিলে চালিত সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, রেমাল উপকূলের জনপদে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। উপকূলে ক্রমে বৈরী হয়ে ওঠা জীবনযাপন আরো কঠিন করে তুলবে রেমালের ক্ষতি। নতুন করে দুস্থ হয়ে পড়বে আরো মানুষ। তাদের সুরক্ষায় প্রয়োজন হবে নতুন সহায়তার।

সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত আটটি জেলার ৮০ হাজার ৫৯১ হেক্টর জমি জলোচ্ছ্বাসে তলিয়ে যায়। এতে ফসলের ৪৭ শতাংশ বিনষ্ট হয়েছে। সবচেয়ে ভয়াবহ দিকটি হলো- পানি ও মাটি লবণাক্ত হওয়া। এতে প্রাণপ্রকৃতি আরো প্রতিকূলতায় পড়েছে। গবাদিপশুর খাদ্যসঙ্কট দেখা দিয়েছে। অথচ এসব এলাকার মানুষের অর্থনীতি মূলত সামান্য ফসলি জমি এবং গবাদিপশু। এ অবস্থায় পশুখাদ্য কেনা অনেকের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফসল উৎপাদন কষ্টসাধ্য হবে। খাদ্য উৎপাদন হবে ব্যাহত। সমীক্ষায় জানা যাচ্ছে, এর মধ্যে গবাদিপশু বিক্রি করে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছেন অনেকে।

ক্ষতিগ্রস্ত ৪২ শতাংশ পরিবারের মধ্যে ৮৫ শতাংশ তাৎক্ষণিকভাবে গবাদিপশু বিক্রি করে এবং খাবার কম খেয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করছে। ৮৬ শতাংশ পরিবার রান্নার জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারছে না। ৮৪ শতাংশ পরিবারের আয় কমে গেছে। তাদের মধ্যে ৯৪ শতাংশ কোনো সহায়তা পাচ্ছে না। ৪৩ শতাংশ মানুষের পক্ষে বাসস্থানে ফিরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু করা সম্ভব হয়নি। ৭০ শতাংশ গবাদিপশুর খাবার ও ৮২ শতাংশ মানুষের সুপেয় পানি সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়েছে।

দুরে‌্যাগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযাযী, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় নগদ পাঁচ কোটি ৭৫ লাখ টাকা, পাঁচ হাজার ৫০০ টন চাল এবং শিশু ও গো-খাদ্যের জন্য চার কোটি ৯০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে, যা চাহিদার তুলনায় খুবই কম। তা ছাড়া সরকারি সাহায্য প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে পৌঁছতে পারছে কি না তা নিয়েও যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। আক্রান্ত এলাকায় ২০ হাজার ২৬০টি পুকুরে নোনা পানি ঢুকেছে। এগুলোর পানি মূলত ঘরগৃহস্থালির কাজে ব্যবহার হয়; পাশাপাশি মাছের চাহিদা পূরণ করে। ভূগর্ভের পানি উত্তোলনের চাপকলও ঝড়ে নষ্ট হয়েছে। এবার তীব্র তাপদাহের সময় দক্ষিণাঞ্চলজুড়ে সুপেয় পানির অভাব দেখা দেয়। রেমালের আঘাতে ওই পরিস্থিতি আরো জটিল করে তুলেছে।

লক্ষণীয়, এ অঞ্চলের স্যানিটেশন ব্যবস্থা দুর্বল। ঘূর্ণিঝড় স্বাস্থ্যঝুঁকি আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। এক দিকে সুপেয় পানির অভাব, অন্য দিকে স্যানিটেশন ঝামেলায় আশঙ্কা করা হচ্ছে; পানিবাহিত রোগের প্রকোপ বাড়তে পারে। একই সাথে স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো রেমালের আঘাতের সময় আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করায় এগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব এলাকায় মানুষের সাথে সাথে পশুপাখিও ঝুঁকিতে পড়েছে। মানুষের জন্য শুকনো খাবার সরবরাহের পরামর্শ দেয়া হয়েছে। সেই সাথে গবাদিপশুর জন্যও পর্যাপ্ত খাবার পৌঁছাতে হবে। সাথে জরুরি কৃষি উপকরণ সরবরাহ করতে হবে। বীজ-সারের পাশাপাশি নগদ অর্থ সহায়তাও দিতে হবে কৃষকদের।