ইপেপার । আজবৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০২৪, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ, হাইকোর্টের আদেশে নিয়োগ কার্যক্রম স্থগিত

কেরু অ্যান্ড কোম্পানির মৌসুমি শ্রমিক স্থায়ীকরণের জন্য ১০৪ পদে জনবল নিয়োগ

নিজস্ব প্রতিবেদক:
  • আপলোড টাইম : ০৮:২৮:৫৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৬ মে ২০২৪
  • / ৪৩ বার পড়া হয়েছে
  • বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়নি সংবাদপত্রে
  • শিল্প মন্ত্রণালয় গঠন করেছে তদন্ত কমিটি
  • শ্রমিকরা যোগদান করলেও নিয়োগ টিকবে কি না সেটা অনিশ্চিত
  • জনপ্রতি ৫ থেকে ৯ লাখ টাকা করে ঘুষ নেওয়ার গুঞ্জন
  • নিয়ম-নীতি তোয়াক্কা না করে অবৈধভাবে নিয়োগের দিনেই যোগদান

কেরু অ্যান্ড কোম্পানিতে মৌসুমি শ্রমিক স্থায়ীকরণের জন্য ১০৪ পদে জনবল নিয়োগ নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াসা। অনেকটাই অনিয়মের মধ্যদিয়ে সম্পন্ন হওয়া এই নিয়োগ নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা জটিলতা। স্থানীয়ভাবে নিয়োগপ্রাপ্তদের কোনো প্রকার ঝামেলা না হওয়ার আশ্বাস দিলেও মন্ত্রণালয় বলছে হাইকোর্টের আদেশে নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত করা হয়েছে। এছাড়া শিল্প মন্ত্রণালয় গঠন করেছে একটি তদন্ত কমিটি। যোগদান করে কাজ চালিয়ে গেলেও নিয়োগ টিকবে কি না, সে নিয়ে নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে চিন্তা বেড়েছে। কিন্তু তড়িঘড়ি করে নিয়োগ শেষ করা কেরু অ্যান্ড কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলছেন সবকিছু ঠিক করা হয়েছে। তবে অভিযোগ উঠেছে, এই নিয়োগ নিয়ে মোটা টাকার ঘুষ বাণিজ্য হয়েছে। এমনকি বিধান থাকা সত্ত্বেও বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়নি সংবাদপত্রে। গুঞ্জনে শোনা যাচ্ছে, নিয়োগ দেওয়ার নাম করে শ্রমিকদের কাছ থেকে ৫ থেকে ৯ লাখ টাকা করে নেয়া হয়েছে।

জানা যায়, দেশের অন্যতম ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান দর্শনা কেরু অ্যান্ড কোম্পানিতে একযুগ পর ১০৪ জন শ্রমিক-কর্মচারী মৌসুমি থেকে স্থায়ীভাবে নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে শুরু থেকেই বিভিন্ন অভিযোগ উঠে। পরীক্ষা শুরুর ৪৮ ঘণ্টা পর বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন থেকে জনবল স্থায়ীকরণের সকল কার্যক্রম স্থগিত রাখার একটি নির্দেশনা জারি করা হলেও কেরু অ্যান্ড কোম্পানি কর্তৃপক্ষ সে নির্দেশনা না মেনে স্ব স্ব পদে জনবল স্থায়ীকরণের জন্য চিঠি ইস্যু করে। অভিযোগ ওঠে, ঘুষ বাণিজ্যের কারণে কেরু অ্যান্ড কোম্পানি তড়িঘড়ি করে এসব পদে স্থায়ীকরণের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। আবার স্থায়ীকরণে মুক্তিযোদ্ধা কোটা না মানায় কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বিরুদ্ধে লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছেন কারখানার মৌসুমি ফিল্টার হেল্পার মুক্তিযোদ্ধার সন্তান বাবুল আকতার নামে এক শ্রমিক।

কেরুর শ্রমিক ও কর্মচারী এবং অফিস সূত্রে জানা গেছে, স্থায়ী লোকবলের সংকট থাকায় গত ১৪ মার্চ লোকবল চেয়ে নীতিমালা প্রস্তুত করে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশনের সদর দপ্তরে পাঠানো হয়। এরপর সদর দপ্তর ২৫ মার্চ শূন্যপদ পূরণে নিয়োগের আহ্বান জানায়। এর প্রেক্ষিতে কেরু অ্যান্ড কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন ৫ সদস্য কমিটি গঠন করে ২ এপ্রিল স্থায়ীকরণ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। তবে বিজ্ঞপ্তিটি কোনো সংবাদপত্রে না দিয়ে কেরুর এমডি শুধুমাত্র নোটিশ বোর্ডে দেয়। গত ২৪ এপ্রিল আবেদনকারীদের কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করেন সদর দপ্তরের প্রতিনিধি সাইফুল আলম। পরে ১৩ ও ১৪ তারিখ নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নেয় প্রায় ১৪০ জন শ্রমিক-কর্মচারী। তার মধ্যে ৩৬ জন শ্রমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হওয়ায় তাদেরকে বাদ দেওয়া হয়। গত ১৫ মে বেলা ১১টার দিকে ১০৯ জনের বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ থাকলেও ৫টি পদে কোন লোকবল না থাকায় ৫টি পদ শূন্য রেখে ১০৪ জন শ্রমিককে স্থায়ী নিয়োগ প্রদান করা হয়। বিজ্ঞপ্তি সংবাদপত্রে প্রকাশের বিধান থাকলেও তা মানা হয়নি। ওই বিজ্ঞপ্তিতে জনপ্রতি ২-৩ শ টাকা করে ব্যাংক ড্রাফটের কথাও উল্লেখ করা হয়।

দুই দিন পরীক্ষা নেওয়ার পর ১৫ মে দুপুরের দিকে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন থেকে কেরুসহ সব চিনিকলে জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়া স্থগিত করার নির্দেশনা দেন বিএসএফআইসি সচিব চৌধুরী রুহুল আমিন কায়ছার। ১৫ মে এ নির্দেশ দেওয়ার পর সব চিনিকল জনবল নিয়োগ বন্ধ রাখলেও ১৫ মে তারিখে কেরুর এমডি স্বাক্ষরিত চিঠি কেরুর শ্রমিক ও কর্মচারীদের হাতে ধরিয়ে দেয়া হয়। এবং তড়িঘড়ি করে নিয়োগ সেরে চাকরির নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে ১৫ই মে তারিখেই নিয়োগপ্রাপ্তদের যোগদান করানো হয়। দেশের সব চিনিকল বিএসএফআইসি-এর আদেশ মানলেও চুয়াডাঙ্গার কেরু অ্যান্ড কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সে নির্দেশ মানেননি।

পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান শেখ শোয়েবুল আলম এনডিসি স্বাক্ষরিত এক পত্রে কেরু অ্যান্ড কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মোশারফ হোসেনকে বাখ্যা প্রদানের জন্য নির্দেশ দেয়া হয়। ওই পত্রে স্পষ্টভাবে কেরুর এমডিকে বলা হয়, ‘আপনার বিরুদ্ধে এই মর্মে অভিযোগ পাওয়া গেছে যে, আপনি ১৩-০৫-২০২৪ ও ১৪-০৫-২০২৪ তারিখে মিলের মৌসুমি জনবল থেকে স্থায়ী জনবল নিয়োজনের জন্য মৌখিক ও লিখিত পরীক্ষা গ্রহণ শেষে ১০৪ জন মৌসুমী শ্রমিক/কর্মচারীকে ১৫-০৫-২০২৪ খ্রি. তারিখে নিয়োজন পত্র দিয়ে একই দিনে চাকরির নিয়ম-নীতি তোয়াক্কা না করে অবৈধভাবে তাদের যোগদান করিয়েছেন। এছাড়া সদর দপ্তরের ১৫-০৫-২০২৪ খ্রি. তারিখের ৩৬.০৪,০০০০.০০১,১৮.০০১.২৩.১২৪ নং স্মারকে মৌসুমি জনবল থেকে স্থায়ীকরণ সংক্রান্ত সকল কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দিলে আপনি তা অমান্য করে নিয়োজন দিয়েছেন। এতে প্রমাণিত হয় যে, আপনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অমান্য করে পূর্ব পরিকল্পিতভাবে নিজ স্বার্থ চরিতার্থে লাভবানের নিমিত্ত লোকজন নিয়োজনে অনিয়ম করেছেন। যা বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন কর্মচারী প্রবিধানমালা ১৯৮৯ এর পরিপন্থি ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ জন্য অপনার বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না, তার জন্য লিখিত জবাব আগামী তিন দিনের মধ্যে নিম্নস্বাক্ষরকারীর নিকট প্রদানের জন্য নির্দেশ দেয়া হলো। জবাব প্রদানে ব্যর্থ হলে আপনার বিরুদ্ধে একতরফাভাবে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিয়োগপ্রাপ্ত এক শ্রমিক বলেন, ‘আমরা বুঝতে পারছি না আমাদের রুটি রুজির কী হবে? এখান থেকে বোঝানো হচ্ছে কোনো সমস্যা হবে না। আবার গুঞ্জনে শুনছি, নিয়োগ নাকি স্থগিত করা হয়েছে। শুনলাম এমডি স্যারের ওপরেই নাকি চাপ আসছে, তাকেও নাকি বদলি করা হবে। আসলে আমরা বুঝতেছি না কী হচ্ছে আমাদের সাথে?’ আরেক শ্রমিকও নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আসলে যাইহোক পয়সা তো কমবেশি নিয়েছে। অতো টেনশন করছি না। তবে নিয়োগ না হলে বড় ঝামেলা হবে।
কেরু অ্যান্ড কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন বলেন, ‘প্রত্যকটি পদক্ষেপে নিয়ম মেনে এবং স্বচ্ছতার মধ্যদিয়ে প্রতিষ্ঠানের ১০৯টি শূন্য পদের জন্য গত ১৩ ও ১৪ মে সকালে কেরুজ হাইস্কুলে শ্রমিক-কর্মচারীদের স্থায়ী নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এ নিয়োগ পরীক্ষায় প্রায় ২০০ শ্রমিক-কর্মচারী অংশ নেয়। পরে ওই দিনই যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্তভাবে ১০৪ জনকে স্থায়ী করে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এর মধ্যে ৫টি পদে আবেদনকারীরা তাদের যোগ্যতার মূল্যায়নে না টেকায় তাদের নিয়োগ দেয়া হয়নি। গত ১৫ মে সকালে স্থায়ীকরণ শ্রমিক-কর্মচারীরা প্রতিষ্ঠানে যোগদান করার পর এদিন সন্ধ্যায় বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান শেখ শোয়েবুল আলম নিয়োগ স্থগিতের আদেশ দিয়ে একটি পত্র পাঠান। অফিস চলাকালীন এ পত্রটি হাতে না পাওয়ায় এ আদেশ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। আমার কাছে ব্যাখা চাওয়া হয়েছিল। আমি বিষয়টির লিখিত জবাব দিয়েছি। পরবর্তীতে হেড অফিস যেটা করে সেটি হবে।’

হাইকোর্টের রিটের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা শুনেছি নীতিমালা নিয়ে হাইকোর্টের একটি রিট হয়েছে। তবে আমরা কোনো লিখিত কাগজ হাতে পাইনি।’ তবে এই কর্মকর্তা ঘুষ বাণিজ্য নিয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি।

কেরুজ শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি ফিরোজ আহম্মেদ সবুজ বলেন, ‘স্থায়ী নিয়োগ সকল নিয়ম মেনেই করা হয়েছে। এতে শ্রমিক-কর্মচারীরা যথেষ্ট সন্তুষ্ট। সমন্বয়ে মুক্তিযোদ্ধা কোটার কথা উল্লেখ নেই। তারপরও আমরা এখানে সমন্বয় করেছি। ১৯ জন মুক্তিযোদ্ধা কোটা আলোকে নেয়া হয়েছে। সাধারণ কোটাতেই আমরা সব পার করে দিয়েছি। মুক্তিযোদ্ধা কোটার মাত্র দুইজন নিয়োগ পায়নি। একটা কাজ করলে, আজ ১০ জনের হবে, পরের বার আরেকজনের হবে, পর্যায়ক্রমে হবে। আনলিগ্যাল (ইললিগ্যাল, অনিয়ম) আমরা কিছু করিনি।’

এ বিষয়ে শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মাসুদুর রহমান মাসুদ বলেন, ‘২০-২৫ বছর ধরে শ্রমিকরা চাকরি করে যাচ্ছে। তাদের কোনো পদোন্নতি হয় না। তাই সবার প্রচেষ্টায় গত ১৫ মে ১০৪ জন শ্রমিককে স্থায়ীকরণ করা হয়েছে এবং মুক্তিযোদ্ধা সন্তানদের অগ্রাধিকার দিয়ে এ স্থায়ীকরণের নিয়োগ শেষ করা হয়েছে। কোনো প্রকার তড়িঘড়ি করা হয়নি। ১৩ ও ১৪ তারিখ ইন্টারভিউ ছিল। ১৪ তারিখে সব কমপ্লিট করে দেয়া হয়েছে। পরের দিন সাথে সাথে চিঠি বের করা হয়েছে। ১৫ তারিখ সকালেই যোগদান করেছে।’ হাইকোর্টের স্টে আদেশের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, না না স্টে অবস্থায় থাকবে কেন? তারা অলরেডি কাজে যোগদান করেছে। কাজ করছে।

এদিকে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন চেয়ারম্যান শেখ সোয়েবুল আলম (গ্রেড-১) জানান, শুধু কেরু নয়, ১৫ মে সবকটি চিনিকলের জনবল স্থায়ীকরণের কার্যক্রম স্থগিত রাখার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়। তারপরও কেরুর এমডি জনবল নিয়োগ দিয়েছেন। অনিয়মের বিষয়ে পত্রের মাধ্যমে ব্যাখা দিতে নির্দেশ দেয়া হয়। তাছাড়া, হাইকোর্টের নির্দেশে ওই নীতিমালায় কেরুর নিয়োগ কার্যক্রমটি বন্ধ করা হয়েছে। আপাতত ওই প্রক্রিয়াটি বন্ধ।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব জাকিয়া সুলতানা বলেন, এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের একটি তদন্ত কমিটি হয়েছে। আবার হাইকোর্টের একটি স্টে অর্ডারও হয়েছে। অতএব ওই নিয়োগ কার্যক্রম বহাল থাকবে না। যে রুলস অনুযায়ী নিয়োগ কার্যক্রম হয়েছিল, সেই নীতিমালাটিকে চ্যালেঞ্জ করে স্টে করা হয়েছে। যেহেতু হাইকোর্টের রায় হয়েছে, এটি সন্দেহের অবকাশ নেই। নিয়োগ কার্যক্রমটি স্থগিত করা হয়েছে।

ট্যাগ :

নিউজটি শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন

ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ, হাইকোর্টের আদেশে নিয়োগ কার্যক্রম স্থগিত

কেরু অ্যান্ড কোম্পানির মৌসুমি শ্রমিক স্থায়ীকরণের জন্য ১০৪ পদে জনবল নিয়োগ

আপলোড টাইম : ০৮:২৮:৫৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৬ মে ২০২৪
  • বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়নি সংবাদপত্রে
  • শিল্প মন্ত্রণালয় গঠন করেছে তদন্ত কমিটি
  • শ্রমিকরা যোগদান করলেও নিয়োগ টিকবে কি না সেটা অনিশ্চিত
  • জনপ্রতি ৫ থেকে ৯ লাখ টাকা করে ঘুষ নেওয়ার গুঞ্জন
  • নিয়ম-নীতি তোয়াক্কা না করে অবৈধভাবে নিয়োগের দিনেই যোগদান

কেরু অ্যান্ড কোম্পানিতে মৌসুমি শ্রমিক স্থায়ীকরণের জন্য ১০৪ পদে জনবল নিয়োগ নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াসা। অনেকটাই অনিয়মের মধ্যদিয়ে সম্পন্ন হওয়া এই নিয়োগ নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা জটিলতা। স্থানীয়ভাবে নিয়োগপ্রাপ্তদের কোনো প্রকার ঝামেলা না হওয়ার আশ্বাস দিলেও মন্ত্রণালয় বলছে হাইকোর্টের আদেশে নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত করা হয়েছে। এছাড়া শিল্প মন্ত্রণালয় গঠন করেছে একটি তদন্ত কমিটি। যোগদান করে কাজ চালিয়ে গেলেও নিয়োগ টিকবে কি না, সে নিয়ে নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে চিন্তা বেড়েছে। কিন্তু তড়িঘড়ি করে নিয়োগ শেষ করা কেরু অ্যান্ড কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলছেন সবকিছু ঠিক করা হয়েছে। তবে অভিযোগ উঠেছে, এই নিয়োগ নিয়ে মোটা টাকার ঘুষ বাণিজ্য হয়েছে। এমনকি বিধান থাকা সত্ত্বেও বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়নি সংবাদপত্রে। গুঞ্জনে শোনা যাচ্ছে, নিয়োগ দেওয়ার নাম করে শ্রমিকদের কাছ থেকে ৫ থেকে ৯ লাখ টাকা করে নেয়া হয়েছে।

জানা যায়, দেশের অন্যতম ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান দর্শনা কেরু অ্যান্ড কোম্পানিতে একযুগ পর ১০৪ জন শ্রমিক-কর্মচারী মৌসুমি থেকে স্থায়ীভাবে নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে শুরু থেকেই বিভিন্ন অভিযোগ উঠে। পরীক্ষা শুরুর ৪৮ ঘণ্টা পর বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন থেকে জনবল স্থায়ীকরণের সকল কার্যক্রম স্থগিত রাখার একটি নির্দেশনা জারি করা হলেও কেরু অ্যান্ড কোম্পানি কর্তৃপক্ষ সে নির্দেশনা না মেনে স্ব স্ব পদে জনবল স্থায়ীকরণের জন্য চিঠি ইস্যু করে। অভিযোগ ওঠে, ঘুষ বাণিজ্যের কারণে কেরু অ্যান্ড কোম্পানি তড়িঘড়ি করে এসব পদে স্থায়ীকরণের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। আবার স্থায়ীকরণে মুক্তিযোদ্ধা কোটা না মানায় কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বিরুদ্ধে লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছেন কারখানার মৌসুমি ফিল্টার হেল্পার মুক্তিযোদ্ধার সন্তান বাবুল আকতার নামে এক শ্রমিক।

কেরুর শ্রমিক ও কর্মচারী এবং অফিস সূত্রে জানা গেছে, স্থায়ী লোকবলের সংকট থাকায় গত ১৪ মার্চ লোকবল চেয়ে নীতিমালা প্রস্তুত করে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশনের সদর দপ্তরে পাঠানো হয়। এরপর সদর দপ্তর ২৫ মার্চ শূন্যপদ পূরণে নিয়োগের আহ্বান জানায়। এর প্রেক্ষিতে কেরু অ্যান্ড কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন ৫ সদস্য কমিটি গঠন করে ২ এপ্রিল স্থায়ীকরণ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। তবে বিজ্ঞপ্তিটি কোনো সংবাদপত্রে না দিয়ে কেরুর এমডি শুধুমাত্র নোটিশ বোর্ডে দেয়। গত ২৪ এপ্রিল আবেদনকারীদের কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করেন সদর দপ্তরের প্রতিনিধি সাইফুল আলম। পরে ১৩ ও ১৪ তারিখ নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নেয় প্রায় ১৪০ জন শ্রমিক-কর্মচারী। তার মধ্যে ৩৬ জন শ্রমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হওয়ায় তাদেরকে বাদ দেওয়া হয়। গত ১৫ মে বেলা ১১টার দিকে ১০৯ জনের বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ থাকলেও ৫টি পদে কোন লোকবল না থাকায় ৫টি পদ শূন্য রেখে ১০৪ জন শ্রমিককে স্থায়ী নিয়োগ প্রদান করা হয়। বিজ্ঞপ্তি সংবাদপত্রে প্রকাশের বিধান থাকলেও তা মানা হয়নি। ওই বিজ্ঞপ্তিতে জনপ্রতি ২-৩ শ টাকা করে ব্যাংক ড্রাফটের কথাও উল্লেখ করা হয়।

দুই দিন পরীক্ষা নেওয়ার পর ১৫ মে দুপুরের দিকে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন থেকে কেরুসহ সব চিনিকলে জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়া স্থগিত করার নির্দেশনা দেন বিএসএফআইসি সচিব চৌধুরী রুহুল আমিন কায়ছার। ১৫ মে এ নির্দেশ দেওয়ার পর সব চিনিকল জনবল নিয়োগ বন্ধ রাখলেও ১৫ মে তারিখে কেরুর এমডি স্বাক্ষরিত চিঠি কেরুর শ্রমিক ও কর্মচারীদের হাতে ধরিয়ে দেয়া হয়। এবং তড়িঘড়ি করে নিয়োগ সেরে চাকরির নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে ১৫ই মে তারিখেই নিয়োগপ্রাপ্তদের যোগদান করানো হয়। দেশের সব চিনিকল বিএসএফআইসি-এর আদেশ মানলেও চুয়াডাঙ্গার কেরু অ্যান্ড কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সে নির্দেশ মানেননি।

পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান শেখ শোয়েবুল আলম এনডিসি স্বাক্ষরিত এক পত্রে কেরু অ্যান্ড কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মোশারফ হোসেনকে বাখ্যা প্রদানের জন্য নির্দেশ দেয়া হয়। ওই পত্রে স্পষ্টভাবে কেরুর এমডিকে বলা হয়, ‘আপনার বিরুদ্ধে এই মর্মে অভিযোগ পাওয়া গেছে যে, আপনি ১৩-০৫-২০২৪ ও ১৪-০৫-২০২৪ তারিখে মিলের মৌসুমি জনবল থেকে স্থায়ী জনবল নিয়োজনের জন্য মৌখিক ও লিখিত পরীক্ষা গ্রহণ শেষে ১০৪ জন মৌসুমী শ্রমিক/কর্মচারীকে ১৫-০৫-২০২৪ খ্রি. তারিখে নিয়োজন পত্র দিয়ে একই দিনে চাকরির নিয়ম-নীতি তোয়াক্কা না করে অবৈধভাবে তাদের যোগদান করিয়েছেন। এছাড়া সদর দপ্তরের ১৫-০৫-২০২৪ খ্রি. তারিখের ৩৬.০৪,০০০০.০০১,১৮.০০১.২৩.১২৪ নং স্মারকে মৌসুমি জনবল থেকে স্থায়ীকরণ সংক্রান্ত সকল কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দিলে আপনি তা অমান্য করে নিয়োজন দিয়েছেন। এতে প্রমাণিত হয় যে, আপনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অমান্য করে পূর্ব পরিকল্পিতভাবে নিজ স্বার্থ চরিতার্থে লাভবানের নিমিত্ত লোকজন নিয়োজনে অনিয়ম করেছেন। যা বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন কর্মচারী প্রবিধানমালা ১৯৮৯ এর পরিপন্থি ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ জন্য অপনার বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না, তার জন্য লিখিত জবাব আগামী তিন দিনের মধ্যে নিম্নস্বাক্ষরকারীর নিকট প্রদানের জন্য নির্দেশ দেয়া হলো। জবাব প্রদানে ব্যর্থ হলে আপনার বিরুদ্ধে একতরফাভাবে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিয়োগপ্রাপ্ত এক শ্রমিক বলেন, ‘আমরা বুঝতে পারছি না আমাদের রুটি রুজির কী হবে? এখান থেকে বোঝানো হচ্ছে কোনো সমস্যা হবে না। আবার গুঞ্জনে শুনছি, নিয়োগ নাকি স্থগিত করা হয়েছে। শুনলাম এমডি স্যারের ওপরেই নাকি চাপ আসছে, তাকেও নাকি বদলি করা হবে। আসলে আমরা বুঝতেছি না কী হচ্ছে আমাদের সাথে?’ আরেক শ্রমিকও নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আসলে যাইহোক পয়সা তো কমবেশি নিয়েছে। অতো টেনশন করছি না। তবে নিয়োগ না হলে বড় ঝামেলা হবে।
কেরু অ্যান্ড কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন বলেন, ‘প্রত্যকটি পদক্ষেপে নিয়ম মেনে এবং স্বচ্ছতার মধ্যদিয়ে প্রতিষ্ঠানের ১০৯টি শূন্য পদের জন্য গত ১৩ ও ১৪ মে সকালে কেরুজ হাইস্কুলে শ্রমিক-কর্মচারীদের স্থায়ী নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এ নিয়োগ পরীক্ষায় প্রায় ২০০ শ্রমিক-কর্মচারী অংশ নেয়। পরে ওই দিনই যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্তভাবে ১০৪ জনকে স্থায়ী করে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এর মধ্যে ৫টি পদে আবেদনকারীরা তাদের যোগ্যতার মূল্যায়নে না টেকায় তাদের নিয়োগ দেয়া হয়নি। গত ১৫ মে সকালে স্থায়ীকরণ শ্রমিক-কর্মচারীরা প্রতিষ্ঠানে যোগদান করার পর এদিন সন্ধ্যায় বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান শেখ শোয়েবুল আলম নিয়োগ স্থগিতের আদেশ দিয়ে একটি পত্র পাঠান। অফিস চলাকালীন এ পত্রটি হাতে না পাওয়ায় এ আদেশ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। আমার কাছে ব্যাখা চাওয়া হয়েছিল। আমি বিষয়টির লিখিত জবাব দিয়েছি। পরবর্তীতে হেড অফিস যেটা করে সেটি হবে।’

হাইকোর্টের রিটের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা শুনেছি নীতিমালা নিয়ে হাইকোর্টের একটি রিট হয়েছে। তবে আমরা কোনো লিখিত কাগজ হাতে পাইনি।’ তবে এই কর্মকর্তা ঘুষ বাণিজ্য নিয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি।

কেরুজ শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি ফিরোজ আহম্মেদ সবুজ বলেন, ‘স্থায়ী নিয়োগ সকল নিয়ম মেনেই করা হয়েছে। এতে শ্রমিক-কর্মচারীরা যথেষ্ট সন্তুষ্ট। সমন্বয়ে মুক্তিযোদ্ধা কোটার কথা উল্লেখ নেই। তারপরও আমরা এখানে সমন্বয় করেছি। ১৯ জন মুক্তিযোদ্ধা কোটা আলোকে নেয়া হয়েছে। সাধারণ কোটাতেই আমরা সব পার করে দিয়েছি। মুক্তিযোদ্ধা কোটার মাত্র দুইজন নিয়োগ পায়নি। একটা কাজ করলে, আজ ১০ জনের হবে, পরের বার আরেকজনের হবে, পর্যায়ক্রমে হবে। আনলিগ্যাল (ইললিগ্যাল, অনিয়ম) আমরা কিছু করিনি।’

এ বিষয়ে শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মাসুদুর রহমান মাসুদ বলেন, ‘২০-২৫ বছর ধরে শ্রমিকরা চাকরি করে যাচ্ছে। তাদের কোনো পদোন্নতি হয় না। তাই সবার প্রচেষ্টায় গত ১৫ মে ১০৪ জন শ্রমিককে স্থায়ীকরণ করা হয়েছে এবং মুক্তিযোদ্ধা সন্তানদের অগ্রাধিকার দিয়ে এ স্থায়ীকরণের নিয়োগ শেষ করা হয়েছে। কোনো প্রকার তড়িঘড়ি করা হয়নি। ১৩ ও ১৪ তারিখ ইন্টারভিউ ছিল। ১৪ তারিখে সব কমপ্লিট করে দেয়া হয়েছে। পরের দিন সাথে সাথে চিঠি বের করা হয়েছে। ১৫ তারিখ সকালেই যোগদান করেছে।’ হাইকোর্টের স্টে আদেশের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, না না স্টে অবস্থায় থাকবে কেন? তারা অলরেডি কাজে যোগদান করেছে। কাজ করছে।

এদিকে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন চেয়ারম্যান শেখ সোয়েবুল আলম (গ্রেড-১) জানান, শুধু কেরু নয়, ১৫ মে সবকটি চিনিকলের জনবল স্থায়ীকরণের কার্যক্রম স্থগিত রাখার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়। তারপরও কেরুর এমডি জনবল নিয়োগ দিয়েছেন। অনিয়মের বিষয়ে পত্রের মাধ্যমে ব্যাখা দিতে নির্দেশ দেয়া হয়। তাছাড়া, হাইকোর্টের নির্দেশে ওই নীতিমালায় কেরুর নিয়োগ কার্যক্রমটি বন্ধ করা হয়েছে। আপাতত ওই প্রক্রিয়াটি বন্ধ।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব জাকিয়া সুলতানা বলেন, এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের একটি তদন্ত কমিটি হয়েছে। আবার হাইকোর্টের একটি স্টে অর্ডারও হয়েছে। অতএব ওই নিয়োগ কার্যক্রম বহাল থাকবে না। যে রুলস অনুযায়ী নিয়োগ কার্যক্রম হয়েছিল, সেই নীতিমালাটিকে চ্যালেঞ্জ করে স্টে করা হয়েছে। যেহেতু হাইকোর্টের রায় হয়েছে, এটি সন্দেহের অবকাশ নেই। নিয়োগ কার্যক্রমটি স্থগিত করা হয়েছে।