ইপেপার । আজশুক্রবার, ১৪ জুন ২০২৪, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

বজ্রপাত ভয়ংকর: গতকালও ১১ জনের মৃত্যু

সমীকরণ প্রতিবেদন
  • আপলোড টাইম : ১১:৩৮:৫৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৯ মে ২০২৪
  • / ১৮ বার পড়া হয়েছে

প্রতি বছরই দেশে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে বজ্রপাত। ঋতু ভিত্তিক ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের রূপ পরিগ্রহ করেছে এই প্রানঘাতি বজ্র-পতন। মার্চ মাস থেকে টানা চার মাস আতংকজনক পরিস্থিতির আবর্ত তৈরী হয় হাওড়-বাওড়,ক্ষেত-খামার-উন্মুক্ত মাঠ-ঘাটে। গত এক দশকের হিসাবে দেখা গেছে প্রতি বছরই বাড়ছে বজ্রপাতের ভয়াবহতা ও বিস্তৃতি। এক দশকে মৃত্যু হয়েছে ৩ হাজার ৪ জনের। চলতি বছর আরো বেড়েছে আতংক। প্রতিদিনই বজ্রাঘাতে প্রানহানী ঘটছে। গত আড়াই মাসে মৃত্যু হয়েছে ৯৮ জনের। এদের অধিকাংশই কৃষক। গতকালও দেশে অন্তত: ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন,বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাবে বজ্রপাতের মতো ঘটনা বাড়ছে। যা অস্থির বায়ুম্ললের ইঙ্গিত। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারনে বজ্রপাতের পরিমানও বাড়ছে। অস্ট্রেলিয়ার কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশে এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিয়ে গবেষণায় বলেছে,বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে ৮৪ লাখ বজ্রপাত হচ্ছে। যার ৭০ শতাংশই হয় এপ্রিল থেকে জুন মাসে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশে বজ্রপাতের ঘটনা বছর বছর বৃদ্ধি পাচ্ছে; বৃদ্ধি পাচ্ছে বজ্রপাতপ্রবণ এলাকার পরিধিও। দেশের যেসব অঞ্চলে আগে খুব একটা বজ্রপাত হতো না, এখন সেসব অঞ্চলে বজ্রপাত বেড়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা জলবায়ু পরিবর্তন,তাপমাত্রা বৃদ্ধির পাশাপাশি অপর্যাপ্ত আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা এবং বড় বৃক্ষের অনুপস্থিতিকে বজ্রপাতজনিত প্রানহানির কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন। এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, ভৌগলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাপী বজ্রপাতে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে অবস্থান করছে। গরম বেশি হওয়ায় চলতি বছর বেশি বর্জ্রপাত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন আবহাওয়াবিদরা। বর্জ্র প্রতিরোধ ব্যবস্থার অপ্রতুলতা এবং অসচেতনতার কারণে মৃত্যুও বেশি হওয়ার আশঙ্কা আছে। দেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চল সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশে আবহাওয়ার ধরণ ও বৈশিষ্ট্য ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে। যার ফলে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ,শৈত্যপ্রবাহ এবং ঋতু পরিবর্তনের মতো ঘটনা ঘটছে। এ কারণেই বজ্রপাত বাড়ছে। জাতিসংঘ বলছে,বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে ৩০০ জন বজ্রপাতে মারা যায়। বাংলাদেশে গাছপালা কেটে ফেলা বিশেষ করে খোলা মাঠে উঁচু গাছ ধ্বংস করে ফেলা,প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নেয়া এবং অসচেতনতার কারণে বজ্রপাতে মৃত্যু বাড়ছে। বজ্রপাতে প্রাণহানি কমানোর জন্য তালগাছ লাগানোর প্রকল্প,লাইটনিং ডিটেকশন সেন্সর (সংকেতব্যবস্থা),লাইটনিং অ্যারেস্টার প্রকল্প গ্রহন করা হলেও তা সফল হয়নি।এখন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর ১ হাজার ৩২১ কোটি টাকা ব্যায়ে দেশের ১৫টি জেলায় ৬ হাজার ৭৯৩টি বজ্রনিরোধক দ্ল বসানো ও ৩ হাজার ৩৯৮টি আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের প্রকল্পের প্রস্তাব হাতে নিয়েছে।
সেভ দ্য সোসাইটি অ্যান্ড থান্ডারস্টর্ম অ্যাওয়ারনেস ফোরামের গবেষণায়, বজ্রপাত বাড়ার বড় কারণ বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ও উঁচু গাছ কেটে ফেলা। কোথাও এক ডিগ্রি উষ্ণতা বাড়লে বজ্রপাত বাড়ে ১২ শতাংশ। মার্চ থেকে মে এই তিন মাসেই হয় প্রায় ৫৯ শতাংশ বজ্রপাত। আর বর্ষায় জুন থেকে সেপ্টেম্বরে ৩৬ শতাংশ। তবে মোট বজ্রপাতের ৭০ ভাগই হয় এপ্রিল, মে ও জুনে। মৌসুমি বাযু দেশের আকাশে আসার আগের দুই মাস এপ্রিল ও মে-তে সিলেট, সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে এর প্রকোপ থাকে বেশি। বর্ষায় তীব্রতা বাড়ে সুনামগঞ্জসহ রাঙামাটি-চট্টগ্রামে। শীতে বেশি আক্রান্ত হয় খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাটে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, গাছপালা কেটে ফেলা, বাতাসে ধূলিকণা বেড়ে যাওয়া এবং মোবাইল টাওয়ারের মতো আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে বেড়েছে বজ্রপাত। তবে আমাদের দেশে বজ্রপাতের মূল কারণ?দেশটির ভৌগোলিক অবস্থান। যুক্তরাস্ট্রের কেন্ট সেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, হিমালয়ের পাদদেশ থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে জলবায়ূর পরিবর্তনে বাংলাদেশে অতিমাত্রায় বজ্রপাত হয়ে থাকে। গবেষণায় এটাও বলা হয় যে, বর্তমানে বিশ্বে বজ্রপাতে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর হার বাংলাদেশে। বাংলাদেশে গত ২৫ বছরে তাপমাত্রা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। তামপাত্রা বৃদ্ধি বজ্রপাত বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
কারা মারা যাচ্ছে: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স বিভাগের এক গবেষনায় বলঅ হয়েছে, বজ্রপাতে যারা মারা যাচ্ছেন তাদের ৯৩ শতাংশ গ্রামের বাসিন্দা। তারা মূলত কৃষিকাজে যুক্ত। এক দশকে ৩ হাজার ৪ জনের মৃত্যু,গত আড়াই মাসে মৃত্যু হয়েছে ৯৮ জন। এর মধ্যে ২০১৪ সালে ১৭০, ২০১৫ সালে ২২৬, ২০১৬ সালে ৩৯১, ২০১৭ সালে ৩০৭, ২০১৮ সালে ৩৫৯, ২০১৯ সালে ১৯৮, ২০২০ সালে ২৫৫ এবং ২০২১ সালে ৩১৪ জন,২০২২ সালে ৩৪৬, জন ২০২৩ সালে ৩৪০ এবং ২০২৪ সালে গত আড়াই মাসে ৯৮ জন।
বেশী বজ্রপাত হয় যে সব এলাকায়:
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এমএ ফারুখের নেতৃত্বে এক গবেষণায় দেখানো হয়েছে, বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয় সুনামগঞ্জ এবং মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে। বজ্রপাত বেশী হচ্ছে: সুনামগঞ্জ,নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সিলেট,টাঙ্গাইল, জামালপুর, ময়মনসিংহ, দিনাজপুর, পাবনা, নওগাঁ, বগুড়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, জামালপুর, গাইবান্ধায়। সুনামগঞ্জে বজ্রপাতে দেশের মোট প্রাণহানির ৪.৮২ শতাংশ ঘটে।
বিশেষজ্ঞ মতামত: অস্ট্রেলিয়ার কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড.আশরাফ দেওয়ান জানান,দেশে বছরে বজ্রপাত হয় ৮০ থেকে ১২০ দিন। যা বাড়ছে। উন্নত দেশগুলো আধুনিক প্রযুক্তি ও সচেতনতা তৈরির মাধ্যমে প্রাণহানি কমাতে পারলেও, তা সম্ভব হয়নি বাংলাদেশে। বিশ্বে মিনিটে বজ্রপাত হয় ৮০ লাখ বার। সবচেয়ে বেশি প্রকোপ ভেনেজুয়েলার মারাকাইবো হ্রদে।বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে? ৮৪ লাখ বজ্রপাত হয়। যার ৭০ শতাংশই এপ্রিল থেকে জুন মাসে।এ থেকে বাঁচার সবচেয়ে জনপ্রিয় মার্কিন পদ্ধতির নাম থার্টি সেকেন্ড টু থার্টি মিনিটস।
বজ্রপাতে গত আড়াই মাসে ৯৮ জনের মৃত্যু:
স্বেচ্ছাসেবী সামাজিক সংগঠন সেভ দ্য সোসাইটি অ্যান্ড থান্ডারস্টোর্ম অ্যাওয়ারনেস (এসএসটিএএফ) ফোরাম এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে,দেশে চলতি বছরের ১ এপ্রিল থেকে ৮ মে পর্যন্ত ৩৮ দিনে বজ্রপাতে ৭৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। মারা যাওয়াদের মধ্যে বেশিরভাগই কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এসএসটিএএফ এর প্রতিবেদন প্রকাশের পর গত কয়েকদিনে আরো ২৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল মারা গেছে ১১ জন। এদিকে ফিনল্যান্ড ভিত্তিক বজ্রপাত বিষয়ক গবেষণাসংস্থা ভাইসালার গবেষনায় বাংলাদেশে বজ্রপাতে যারা মারা যান, তাদের ৭০ ভাগই কৃষক বা যারা খোলা মাঠে কাজ করেন। এছাড়া বাড়ি ফেরার পথে ১৪ শতাংশ এবং গোসল ও মাছ ধরার সময় ১৩ শতাংশের বজ্রপাতের ফলে মৃত্যু হয়। বজ্রপাতের ধর্ম হচ্ছে তা মাটিতে আঘাত হানার আগে সবচেয়ে উঁচু যে জায়গাটিপায় সেখানে গিয়ে পড়ে। বৃক্ষহীন হাওর এলাকায় কৃষকের শরীরই মাটির চেয়ে উঁচু থাকে। তাই বজ্রপাতের সময় মাঠে বা খোলা জায়গায় যেখানে উঁচু কোনো গাছ নেই বা বজ্রনিরোধক ব্যবস্থা নেই সেখানে যারা থাকেন তারা শিকার হন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের দেয়া তথ্যানুযায়ী প্রতি বছর বাংলাদেশে গড়ে বজ্রপাতে কমবেশি ২৬৫ জনের মৃত্যু হয়।

ট্যাগ :

নিউজটি শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন

বজ্রপাত ভয়ংকর: গতকালও ১১ জনের মৃত্যু

আপলোড টাইম : ১১:৩৮:৫৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৯ মে ২০২৪

প্রতি বছরই দেশে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে বজ্রপাত। ঋতু ভিত্তিক ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের রূপ পরিগ্রহ করেছে এই প্রানঘাতি বজ্র-পতন। মার্চ মাস থেকে টানা চার মাস আতংকজনক পরিস্থিতির আবর্ত তৈরী হয় হাওড়-বাওড়,ক্ষেত-খামার-উন্মুক্ত মাঠ-ঘাটে। গত এক দশকের হিসাবে দেখা গেছে প্রতি বছরই বাড়ছে বজ্রপাতের ভয়াবহতা ও বিস্তৃতি। এক দশকে মৃত্যু হয়েছে ৩ হাজার ৪ জনের। চলতি বছর আরো বেড়েছে আতংক। প্রতিদিনই বজ্রাঘাতে প্রানহানী ঘটছে। গত আড়াই মাসে মৃত্যু হয়েছে ৯৮ জনের। এদের অধিকাংশই কৃষক। গতকালও দেশে অন্তত: ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন,বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাবে বজ্রপাতের মতো ঘটনা বাড়ছে। যা অস্থির বায়ুম্ললের ইঙ্গিত। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারনে বজ্রপাতের পরিমানও বাড়ছে। অস্ট্রেলিয়ার কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশে এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিয়ে গবেষণায় বলেছে,বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে ৮৪ লাখ বজ্রপাত হচ্ছে। যার ৭০ শতাংশই হয় এপ্রিল থেকে জুন মাসে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশে বজ্রপাতের ঘটনা বছর বছর বৃদ্ধি পাচ্ছে; বৃদ্ধি পাচ্ছে বজ্রপাতপ্রবণ এলাকার পরিধিও। দেশের যেসব অঞ্চলে আগে খুব একটা বজ্রপাত হতো না, এখন সেসব অঞ্চলে বজ্রপাত বেড়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা জলবায়ু পরিবর্তন,তাপমাত্রা বৃদ্ধির পাশাপাশি অপর্যাপ্ত আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা এবং বড় বৃক্ষের অনুপস্থিতিকে বজ্রপাতজনিত প্রানহানির কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন। এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, ভৌগলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাপী বজ্রপাতে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে অবস্থান করছে। গরম বেশি হওয়ায় চলতি বছর বেশি বর্জ্রপাত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন আবহাওয়াবিদরা। বর্জ্র প্রতিরোধ ব্যবস্থার অপ্রতুলতা এবং অসচেতনতার কারণে মৃত্যুও বেশি হওয়ার আশঙ্কা আছে। দেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চল সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশে আবহাওয়ার ধরণ ও বৈশিষ্ট্য ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে। যার ফলে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ,শৈত্যপ্রবাহ এবং ঋতু পরিবর্তনের মতো ঘটনা ঘটছে। এ কারণেই বজ্রপাত বাড়ছে। জাতিসংঘ বলছে,বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে ৩০০ জন বজ্রপাতে মারা যায়। বাংলাদেশে গাছপালা কেটে ফেলা বিশেষ করে খোলা মাঠে উঁচু গাছ ধ্বংস করে ফেলা,প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নেয়া এবং অসচেতনতার কারণে বজ্রপাতে মৃত্যু বাড়ছে। বজ্রপাতে প্রাণহানি কমানোর জন্য তালগাছ লাগানোর প্রকল্প,লাইটনিং ডিটেকশন সেন্সর (সংকেতব্যবস্থা),লাইটনিং অ্যারেস্টার প্রকল্প গ্রহন করা হলেও তা সফল হয়নি।এখন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর ১ হাজার ৩২১ কোটি টাকা ব্যায়ে দেশের ১৫টি জেলায় ৬ হাজার ৭৯৩টি বজ্রনিরোধক দ্ল বসানো ও ৩ হাজার ৩৯৮টি আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের প্রকল্পের প্রস্তাব হাতে নিয়েছে।
সেভ দ্য সোসাইটি অ্যান্ড থান্ডারস্টর্ম অ্যাওয়ারনেস ফোরামের গবেষণায়, বজ্রপাত বাড়ার বড় কারণ বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ও উঁচু গাছ কেটে ফেলা। কোথাও এক ডিগ্রি উষ্ণতা বাড়লে বজ্রপাত বাড়ে ১২ শতাংশ। মার্চ থেকে মে এই তিন মাসেই হয় প্রায় ৫৯ শতাংশ বজ্রপাত। আর বর্ষায় জুন থেকে সেপ্টেম্বরে ৩৬ শতাংশ। তবে মোট বজ্রপাতের ৭০ ভাগই হয় এপ্রিল, মে ও জুনে। মৌসুমি বাযু দেশের আকাশে আসার আগের দুই মাস এপ্রিল ও মে-তে সিলেট, সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে এর প্রকোপ থাকে বেশি। বর্ষায় তীব্রতা বাড়ে সুনামগঞ্জসহ রাঙামাটি-চট্টগ্রামে। শীতে বেশি আক্রান্ত হয় খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাটে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, গাছপালা কেটে ফেলা, বাতাসে ধূলিকণা বেড়ে যাওয়া এবং মোবাইল টাওয়ারের মতো আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে বেড়েছে বজ্রপাত। তবে আমাদের দেশে বজ্রপাতের মূল কারণ?দেশটির ভৌগোলিক অবস্থান। যুক্তরাস্ট্রের কেন্ট সেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, হিমালয়ের পাদদেশ থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে জলবায়ূর পরিবর্তনে বাংলাদেশে অতিমাত্রায় বজ্রপাত হয়ে থাকে। গবেষণায় এটাও বলা হয় যে, বর্তমানে বিশ্বে বজ্রপাতে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর হার বাংলাদেশে। বাংলাদেশে গত ২৫ বছরে তাপমাত্রা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। তামপাত্রা বৃদ্ধি বজ্রপাত বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
কারা মারা যাচ্ছে: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স বিভাগের এক গবেষনায় বলঅ হয়েছে, বজ্রপাতে যারা মারা যাচ্ছেন তাদের ৯৩ শতাংশ গ্রামের বাসিন্দা। তারা মূলত কৃষিকাজে যুক্ত। এক দশকে ৩ হাজার ৪ জনের মৃত্যু,গত আড়াই মাসে মৃত্যু হয়েছে ৯৮ জন। এর মধ্যে ২০১৪ সালে ১৭০, ২০১৫ সালে ২২৬, ২০১৬ সালে ৩৯১, ২০১৭ সালে ৩০৭, ২০১৮ সালে ৩৫৯, ২০১৯ সালে ১৯৮, ২০২০ সালে ২৫৫ এবং ২০২১ সালে ৩১৪ জন,২০২২ সালে ৩৪৬, জন ২০২৩ সালে ৩৪০ এবং ২০২৪ সালে গত আড়াই মাসে ৯৮ জন।
বেশী বজ্রপাত হয় যে সব এলাকায়:
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এমএ ফারুখের নেতৃত্বে এক গবেষণায় দেখানো হয়েছে, বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয় সুনামগঞ্জ এবং মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে। বজ্রপাত বেশী হচ্ছে: সুনামগঞ্জ,নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সিলেট,টাঙ্গাইল, জামালপুর, ময়মনসিংহ, দিনাজপুর, পাবনা, নওগাঁ, বগুড়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, জামালপুর, গাইবান্ধায়। সুনামগঞ্জে বজ্রপাতে দেশের মোট প্রাণহানির ৪.৮২ শতাংশ ঘটে।
বিশেষজ্ঞ মতামত: অস্ট্রেলিয়ার কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড.আশরাফ দেওয়ান জানান,দেশে বছরে বজ্রপাত হয় ৮০ থেকে ১২০ দিন। যা বাড়ছে। উন্নত দেশগুলো আধুনিক প্রযুক্তি ও সচেতনতা তৈরির মাধ্যমে প্রাণহানি কমাতে পারলেও, তা সম্ভব হয়নি বাংলাদেশে। বিশ্বে মিনিটে বজ্রপাত হয় ৮০ লাখ বার। সবচেয়ে বেশি প্রকোপ ভেনেজুয়েলার মারাকাইবো হ্রদে।বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে? ৮৪ লাখ বজ্রপাত হয়। যার ৭০ শতাংশই এপ্রিল থেকে জুন মাসে।এ থেকে বাঁচার সবচেয়ে জনপ্রিয় মার্কিন পদ্ধতির নাম থার্টি সেকেন্ড টু থার্টি মিনিটস।
বজ্রপাতে গত আড়াই মাসে ৯৮ জনের মৃত্যু:
স্বেচ্ছাসেবী সামাজিক সংগঠন সেভ দ্য সোসাইটি অ্যান্ড থান্ডারস্টোর্ম অ্যাওয়ারনেস (এসএসটিএএফ) ফোরাম এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে,দেশে চলতি বছরের ১ এপ্রিল থেকে ৮ মে পর্যন্ত ৩৮ দিনে বজ্রপাতে ৭৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। মারা যাওয়াদের মধ্যে বেশিরভাগই কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এসএসটিএএফ এর প্রতিবেদন প্রকাশের পর গত কয়েকদিনে আরো ২৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল মারা গেছে ১১ জন। এদিকে ফিনল্যান্ড ভিত্তিক বজ্রপাত বিষয়ক গবেষণাসংস্থা ভাইসালার গবেষনায় বাংলাদেশে বজ্রপাতে যারা মারা যান, তাদের ৭০ ভাগই কৃষক বা যারা খোলা মাঠে কাজ করেন। এছাড়া বাড়ি ফেরার পথে ১৪ শতাংশ এবং গোসল ও মাছ ধরার সময় ১৩ শতাংশের বজ্রপাতের ফলে মৃত্যু হয়। বজ্রপাতের ধর্ম হচ্ছে তা মাটিতে আঘাত হানার আগে সবচেয়ে উঁচু যে জায়গাটিপায় সেখানে গিয়ে পড়ে। বৃক্ষহীন হাওর এলাকায় কৃষকের শরীরই মাটির চেয়ে উঁচু থাকে। তাই বজ্রপাতের সময় মাঠে বা খোলা জায়গায় যেখানে উঁচু কোনো গাছ নেই বা বজ্রনিরোধক ব্যবস্থা নেই সেখানে যারা থাকেন তারা শিকার হন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের দেয়া তথ্যানুযায়ী প্রতি বছর বাংলাদেশে গড়ে বজ্রপাতে কমবেশি ২৬৫ জনের মৃত্যু হয়।