ইপেপার । আজবৃহস্পতিবার, ৩০ মে ২০২৪, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

সামাজিক অস্থিরতা বেড়েই চলেছে ; মুক্তির উপায় ভাবতে হবে

সমীকরণ প্রতিবেদন
  • আপলোড টাইম : ০৮:০১:৩৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ মে ২০২৪
  • / ২৪ বার পড়া হয়েছে

দেশে সামাজিক অস্থিরতা প্রতিদিন বাড়ছে। সঙ্ঘাত, সংঘর্ষ, হত্যা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। মানুষ নৃশংস হয়ে উঠছে। তুচ্ছ কারণে একজন অন্যকে হত্যা করছে। এসব ঘটনার পেছনে অর্থনৈতিক কারণ যেমন আছে, তেমনি বিদ্যমান রয়েছে রাজনৈতিক ও সামাজিক কারণ। এ সম্পর্কিত গণমাধ্যম ও বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্যগুলো রীতিমতো উদ্বেগজনক। সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ছয় মাসে দেশে আড়াই সহস্রাধিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় শতাধিক ব্যক্তি নিহত এবং সহস্রাধিক আহত হয়েছেন। গত বছর নভেম্বর থেকে চলতি বছর এপ্রিল পর্যন্ত এসব ঘটনা ঘটে। আর এসবের মূল কারণ সামাজিক-রাজনৈতিক, যেমন- এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, নির্বাচনে জয়-পরাজয়, দলীয় কোন্দল, অর্থের অপব্যবহার এবং ভোট দেয়া নিয়ে নানা ধরনের উসকানি ইত্যাদি।
পুলিশ ও হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১৫ নভেম্বর দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে চলতি বছর ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশের প্রায় প্রতিটি জেলায় সংঘর্ষ, সঙ্ঘাত, হত্যা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। নির্বাচনী সহিংসতায় এ সময়ে ৭৫২টি ঘটনায় নিহত হন ১৭ জন। আহত হন আড়াই সহস্রাধিক। গুলিবিদ্ধ হয়েছেন শতাধিক। ঘরবাড়ি ও ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে ৪৫০টি। গাড়ি, যানবাহন ভাঙচুর ও জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে ১০০টি। সব পরিসংখ্যান বীভৎস ও মর্মান্তিক। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীবাহিনী এসব বিষয়ে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারে না মূলত রাজনৈতিক কারণে। ক্ষমতাসীন দলের সাথে সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের বিষয়ে পুলিশের অবস্থান যে সতর্ক ও গা-ছাড়া, এমন বহু দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে আছে। তবে সামাজিক অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণ করা একা পুলিশের পক্ষে সম্ভব নয়। সাথে অন্য যেসব উপাদান জড়িত সেগুলোও বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
আমরা বরং সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধ-বিশেষজ্ঞদের কাছে জানতে পারি এর পেছনের কারণ। একজন সমাজবিজ্ঞানী বলেন, যাদের বেড়ে ওঠা ঠিকভাবে হয়নি, তারা অস্থিরতা ঘটায়। অর্থনৈতিক অসচ্ছলতাও একটি কারণ। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশী সংস্কৃতির প্রভাব এবং পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থাও দায়ী। যেসব নারী আয় করেন, তারা পুরুষের একগুঁয়েমি সহ্য করেন না। এক সময় তা পারিবারিক কলহে রূপ নেয়। পারিবারিক কলহ থেকে ঘটে সহিংসতা, এমনকি হত্যার ঘটনাও।
মনোবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, অর্থলিপ্সাও মানুষকে হিংস্র করে তুলছে। আমাদের সমাজে আইন, বিচারসহ সব বিত্তবানের পক্ষে। এ বৈষম্য নিম্নবিত্তকে ক্রুদ্ধ ও ক্ষিপ্ত করে। তিনি মরিয়া হয়ে ওঠেন। আবার একজন অপরাধী একটি অপরাধ করার পর তা ঢাকতে আরো অপরাধ করে। এটি মানুষের সহজাত প্রবণতা। সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, সামাজিক বন্ধনের শিথিলতা অস্থিরতার অন্যতম কারণ। আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থা দায়িত্বসচেতন নাগরিক গড়ে তুলতে অনেক আগে অসফল প্রমাণিত হয়েছে। আবার মূল্যবোধের অবক্ষয়ে পারিবারিক ঐতিহ্য বা শিক্ষার ধারাবাহিকতাও বিনষ্ট হয়েছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে পরিবার থেকে প্রয়োজনীয় শিক্ষা পাচ্ছে না নতুন প্রজন্ম। অপরাধ বিশ্লেষকরা বলেন, সামাজিক অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে মানুষের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি হবে। মানুষ রাষ্ট্র ও সমাজের ওপর আস্থাহীন হবে। সে লক্ষণ এর মধ্যে স্পষ্ট। এ অবস্থা থেকে মুক্তির উপায় ভাবতে হবে।

ট্যাগ :

নিউজটি শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন

সামাজিক অস্থিরতা বেড়েই চলেছে ; মুক্তির উপায় ভাবতে হবে

আপলোড টাইম : ০৮:০১:৩৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ মে ২০২৪

দেশে সামাজিক অস্থিরতা প্রতিদিন বাড়ছে। সঙ্ঘাত, সংঘর্ষ, হত্যা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। মানুষ নৃশংস হয়ে উঠছে। তুচ্ছ কারণে একজন অন্যকে হত্যা করছে। এসব ঘটনার পেছনে অর্থনৈতিক কারণ যেমন আছে, তেমনি বিদ্যমান রয়েছে রাজনৈতিক ও সামাজিক কারণ। এ সম্পর্কিত গণমাধ্যম ও বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্যগুলো রীতিমতো উদ্বেগজনক। সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ছয় মাসে দেশে আড়াই সহস্রাধিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় শতাধিক ব্যক্তি নিহত এবং সহস্রাধিক আহত হয়েছেন। গত বছর নভেম্বর থেকে চলতি বছর এপ্রিল পর্যন্ত এসব ঘটনা ঘটে। আর এসবের মূল কারণ সামাজিক-রাজনৈতিক, যেমন- এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, নির্বাচনে জয়-পরাজয়, দলীয় কোন্দল, অর্থের অপব্যবহার এবং ভোট দেয়া নিয়ে নানা ধরনের উসকানি ইত্যাদি।
পুলিশ ও হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১৫ নভেম্বর দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে চলতি বছর ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশের প্রায় প্রতিটি জেলায় সংঘর্ষ, সঙ্ঘাত, হত্যা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। নির্বাচনী সহিংসতায় এ সময়ে ৭৫২টি ঘটনায় নিহত হন ১৭ জন। আহত হন আড়াই সহস্রাধিক। গুলিবিদ্ধ হয়েছেন শতাধিক। ঘরবাড়ি ও ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে ৪৫০টি। গাড়ি, যানবাহন ভাঙচুর ও জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে ১০০টি। সব পরিসংখ্যান বীভৎস ও মর্মান্তিক। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীবাহিনী এসব বিষয়ে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারে না মূলত রাজনৈতিক কারণে। ক্ষমতাসীন দলের সাথে সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের বিষয়ে পুলিশের অবস্থান যে সতর্ক ও গা-ছাড়া, এমন বহু দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে আছে। তবে সামাজিক অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণ করা একা পুলিশের পক্ষে সম্ভব নয়। সাথে অন্য যেসব উপাদান জড়িত সেগুলোও বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
আমরা বরং সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধ-বিশেষজ্ঞদের কাছে জানতে পারি এর পেছনের কারণ। একজন সমাজবিজ্ঞানী বলেন, যাদের বেড়ে ওঠা ঠিকভাবে হয়নি, তারা অস্থিরতা ঘটায়। অর্থনৈতিক অসচ্ছলতাও একটি কারণ। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশী সংস্কৃতির প্রভাব এবং পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থাও দায়ী। যেসব নারী আয় করেন, তারা পুরুষের একগুঁয়েমি সহ্য করেন না। এক সময় তা পারিবারিক কলহে রূপ নেয়। পারিবারিক কলহ থেকে ঘটে সহিংসতা, এমনকি হত্যার ঘটনাও।
মনোবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, অর্থলিপ্সাও মানুষকে হিংস্র করে তুলছে। আমাদের সমাজে আইন, বিচারসহ সব বিত্তবানের পক্ষে। এ বৈষম্য নিম্নবিত্তকে ক্রুদ্ধ ও ক্ষিপ্ত করে। তিনি মরিয়া হয়ে ওঠেন। আবার একজন অপরাধী একটি অপরাধ করার পর তা ঢাকতে আরো অপরাধ করে। এটি মানুষের সহজাত প্রবণতা। সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, সামাজিক বন্ধনের শিথিলতা অস্থিরতার অন্যতম কারণ। আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থা দায়িত্বসচেতন নাগরিক গড়ে তুলতে অনেক আগে অসফল প্রমাণিত হয়েছে। আবার মূল্যবোধের অবক্ষয়ে পারিবারিক ঐতিহ্য বা শিক্ষার ধারাবাহিকতাও বিনষ্ট হয়েছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে পরিবার থেকে প্রয়োজনীয় শিক্ষা পাচ্ছে না নতুন প্রজন্ম। অপরাধ বিশ্লেষকরা বলেন, সামাজিক অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে মানুষের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি হবে। মানুষ রাষ্ট্র ও সমাজের ওপর আস্থাহীন হবে। সে লক্ষণ এর মধ্যে স্পষ্ট। এ অবস্থা থেকে মুক্তির উপায় ভাবতে হবে।