ইপেপার । আজবৃহস্পতিবার, ৩০ মে ২০২৪, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

টাকার অবমূল্যায়ন; জীবনযাত্রায় ব্যয় বাড়ার শঙ্কা

সমীকরণ প্রতিবেদন
  • আপলোড টাইম : ০৮:৩৪:১৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১১ মে ২০২৪
  • / ১৯ বার পড়া হয়েছে

ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমানো হয়েছে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ। এতে খোলাবাজারে এক দিনের ব্যবধানে ডলারের দাম বেড়েছে ৭-৯ টাকা। এরপরও পাওয়া যায়নি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অঘোষিত সিদ্ধান্তে ডলারের দাম বেড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এতে বাড়বে আমদানি খরচ। আমদানিনির্ভর পণ্য কিনতে হবে বেশি দামে। মূল্যস্ফীতি আরো বাড়বে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির এ সময়ে ডলারের দর বৃদ্ধি পণ্যমূল্যে বিরূপ প্রভাব ফেলবে। আরেক দফা জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়বে। চাপে পড়বে সাধারণ মানুষ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত বুধবার প্রতি ডলারে ৭ টাকা বাড়িয়ে মধ্যবর্তী দর ১১৭ টাকা ঠিক করেছে। তবে গত বৃহস্পতিবার খোলাবাজারে ডলার কেনাবেচা হয়েছে ১২৫ টাকা পর্যন্ত। একই সাথে ‘স্মার্ট’ ব্যবস্থা তুলে দিয়ে সুদহার বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে। বাড়ানো হয় বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ধার দেয়া অর্থের সুদহার বা নীতি সুদহার। নতুন পদ্ধতি চালুর আগে সর্বশেষ ডলারের ঘোষিত দর ছিল ১১০ টাকা। বাস্তবে দর ছিল আরো বেশি।
ডলার বিনিময়ে চালু করা হয়েছে ‘ক্রলিং পেগ’। এটি এমন পদ্ধতি, যার মাধ্যমে মধ্যবর্তী দর নির্ধারণ করে তা একটি সীমার মধ্যে ওঠানামা করতে বলা হয়। ডলারের দর পুরোপুরি বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়ার আগের এ পদ্ধতিতে বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। আইএমএফের পরামর্শে কেন্দ্র্রীয় ব্যাংক এটি কার্যকর করল। দেখা গেছে, আইএমএফের পরামর্শে বিভিন্ন দেশ এ পদ্ধতি বাস্তবায়ন করেছে। কোথাও সাফল্য এসেছে, কোথাও ব্যর্থ হয়েছে।
হঠাৎ ডলারের দাম বৃদ্ধি নিয়ে খাতসংশ্লিষ্টদের মধ্যে দুই ধরনের মতামত তৈরি হয়েছে। রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান বলেছেন, ডলারের দাম বাড়ায় দেশের অর্থনীতির ওপর কোনো চাপ পড়বে না। কারণ কৃষি খাতে দেশ অনেক ভালো করছে। খাদ্যে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পেরেছি’।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সহসভাপতি ও বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আমাদের অর্থনীতি চাপে আছে। এখন হঠাৎ করে ডলারের দাম খুব বেশি হলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, বিশেষ করে আমদানিতে। ডলারের বেশি দাম বৃদ্ধির এমন সিদ্ধান্তে চাপে পড়বেন ভোক্তারা। মূল্যস্ফীতি আরো বেড়ে যাবে, মানুষ কষ্ট পাবে। পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুর বলেন, ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানি করা পণ্যমূল্যে তেমন একটা প্রভাব পড়বে না। কারণ আগে থেকে আমদানিকারকরা ১১৭-১১৮ টাকায় এলসি করে আসছিলেন। এখন বিষয়টা বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষণার মাধ্যমে বৈধ হলো।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অনেক কর্মকর্তা মনে করেন, ডলারের দর বৃদ্ধিতে আমদানি খরচ বাড়বে। এতে আমদানি আরো নিরুৎসাহিত হবে। বৈধপথে প্রবাসী আয় ও রফতানিতে উৎসাহিত হবেন ব্যবসায়ীরা। এভাবে ডলারের প্রবাহ বেড়ে সঙ্কট কেটে যাওয়ার আশা করা হচ্ছে। এ ছাড়া ডলারের দর নিয়ে এখন আর লুকোচুরি থাকবে না। এতদিন এক দরে রিপোর্ট করে আরেক দরে বেচাকেনা হচ্ছিল। এখন তা আর হবে না।
স্বাধীনভাবে কাজ করা অর্থনীতিবিদদের মতো আমরাও মনে করি, ডলারের মূল্য ও সুদহার বৃদ্ধির প্রভাবে মূল্যস্ফীতিতে নেতিবাচক অভিঘাত থাকবে। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনা জোরদার করা জরুরি। সাথে সাথে সামষ্টিক অর্থনীতির উন্নয়নে বেশি নজর দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত হবে সব দিক বিবেচনায় নেয়া। তা না হলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় ব্যয় বেড়ে তাদের জীবন আরো দুর্বিষহ হয়ে উঠবে।

ট্যাগ :

নিউজটি শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন

টাকার অবমূল্যায়ন; জীবনযাত্রায় ব্যয় বাড়ার শঙ্কা

আপলোড টাইম : ০৮:৩৪:১৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১১ মে ২০২৪

ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমানো হয়েছে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ। এতে খোলাবাজারে এক দিনের ব্যবধানে ডলারের দাম বেড়েছে ৭-৯ টাকা। এরপরও পাওয়া যায়নি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অঘোষিত সিদ্ধান্তে ডলারের দাম বেড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এতে বাড়বে আমদানি খরচ। আমদানিনির্ভর পণ্য কিনতে হবে বেশি দামে। মূল্যস্ফীতি আরো বাড়বে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির এ সময়ে ডলারের দর বৃদ্ধি পণ্যমূল্যে বিরূপ প্রভাব ফেলবে। আরেক দফা জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়বে। চাপে পড়বে সাধারণ মানুষ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত বুধবার প্রতি ডলারে ৭ টাকা বাড়িয়ে মধ্যবর্তী দর ১১৭ টাকা ঠিক করেছে। তবে গত বৃহস্পতিবার খোলাবাজারে ডলার কেনাবেচা হয়েছে ১২৫ টাকা পর্যন্ত। একই সাথে ‘স্মার্ট’ ব্যবস্থা তুলে দিয়ে সুদহার বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে। বাড়ানো হয় বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ধার দেয়া অর্থের সুদহার বা নীতি সুদহার। নতুন পদ্ধতি চালুর আগে সর্বশেষ ডলারের ঘোষিত দর ছিল ১১০ টাকা। বাস্তবে দর ছিল আরো বেশি।
ডলার বিনিময়ে চালু করা হয়েছে ‘ক্রলিং পেগ’। এটি এমন পদ্ধতি, যার মাধ্যমে মধ্যবর্তী দর নির্ধারণ করে তা একটি সীমার মধ্যে ওঠানামা করতে বলা হয়। ডলারের দর পুরোপুরি বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়ার আগের এ পদ্ধতিতে বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। আইএমএফের পরামর্শে কেন্দ্র্রীয় ব্যাংক এটি কার্যকর করল। দেখা গেছে, আইএমএফের পরামর্শে বিভিন্ন দেশ এ পদ্ধতি বাস্তবায়ন করেছে। কোথাও সাফল্য এসেছে, কোথাও ব্যর্থ হয়েছে।
হঠাৎ ডলারের দাম বৃদ্ধি নিয়ে খাতসংশ্লিষ্টদের মধ্যে দুই ধরনের মতামত তৈরি হয়েছে। রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান বলেছেন, ডলারের দাম বাড়ায় দেশের অর্থনীতির ওপর কোনো চাপ পড়বে না। কারণ কৃষি খাতে দেশ অনেক ভালো করছে। খাদ্যে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পেরেছি’।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সহসভাপতি ও বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আমাদের অর্থনীতি চাপে আছে। এখন হঠাৎ করে ডলারের দাম খুব বেশি হলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, বিশেষ করে আমদানিতে। ডলারের বেশি দাম বৃদ্ধির এমন সিদ্ধান্তে চাপে পড়বেন ভোক্তারা। মূল্যস্ফীতি আরো বেড়ে যাবে, মানুষ কষ্ট পাবে। পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুর বলেন, ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানি করা পণ্যমূল্যে তেমন একটা প্রভাব পড়বে না। কারণ আগে থেকে আমদানিকারকরা ১১৭-১১৮ টাকায় এলসি করে আসছিলেন। এখন বিষয়টা বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষণার মাধ্যমে বৈধ হলো।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অনেক কর্মকর্তা মনে করেন, ডলারের দর বৃদ্ধিতে আমদানি খরচ বাড়বে। এতে আমদানি আরো নিরুৎসাহিত হবে। বৈধপথে প্রবাসী আয় ও রফতানিতে উৎসাহিত হবেন ব্যবসায়ীরা। এভাবে ডলারের প্রবাহ বেড়ে সঙ্কট কেটে যাওয়ার আশা করা হচ্ছে। এ ছাড়া ডলারের দর নিয়ে এখন আর লুকোচুরি থাকবে না। এতদিন এক দরে রিপোর্ট করে আরেক দরে বেচাকেনা হচ্ছিল। এখন তা আর হবে না।
স্বাধীনভাবে কাজ করা অর্থনীতিবিদদের মতো আমরাও মনে করি, ডলারের মূল্য ও সুদহার বৃদ্ধির প্রভাবে মূল্যস্ফীতিতে নেতিবাচক অভিঘাত থাকবে। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনা জোরদার করা জরুরি। সাথে সাথে সামষ্টিক অর্থনীতির উন্নয়নে বেশি নজর দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত হবে সব দিক বিবেচনায় নেয়া। তা না হলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় ব্যয় বেড়ে তাদের জীবন আরো দুর্বিষহ হয়ে উঠবে।