ইপেপার । আজশুক্রবার, ৩১ মে ২০২৪, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

অর্থের জোরে জনপ্রতিনিধি

সমীকরণ প্রতিবেদন
  • আপলোড টাইম : ০৩:৪৫:৩৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৮ মে ২০২৪
  • / ২৭ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশে নির্বাচনী ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে গেছে। ভোটের মাধ্যমে জনগণের পছন্দের প্রার্থী নির্বাচিত হবে এই আস্থা হারিয়ে গেছে। তাই কোনো ধরনের নির্বাচনেই নাগরিকদের আগ্রহ আর দেখা যায় না। যার চূড়ান্ত এক নজির ছিল সদ্য বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তাতে মানুষ ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আগ্রহ বোধ করেনি। সরকার যা চেয়েছে বা যাদের সংসদ সদস্য হিসেবে পছন্দ করেছে তারাই জাতীয় সংসদে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছে। নির্বাচনের নামে জনগণের প্রতিনিধি হওয়ার এক চরম অসুস্থ প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে দেশে। তার কদর্য প্রভাব আমরা দেখতে পাচ্ছি উপজেলা নির্বাচনে। এখানে মন্ত্রী এমপির প্রভাব ও অর্থের খেলাই প্রাধান্য পাচ্ছে। যার মামুর জোর বেশি সেই নির্বাচিত হবে। এই ক্ষেত্রে অর্থসম্পদ যার বেশি সেই প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রয়েছে। প্রথম ধাপের উপজেলা নির্বাচনে দেখা গেল ব্যবসায়ী প্রার্থীরা বড় দাগে বেশি। প্রথম ধাপে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ১৪১ উপজেলায় নির্বাচন। কথিত উপজেলা নির্বাচনে প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণ করে তুলে ধরেছে টিআইবি। তাতে দেখা যাচ্ছে গত উপজেলা নির্বাচনের তুলনায় এবার কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে প্রায় তিন গুণ। চেয়ারম্যান প্রার্থীদের মধ্যে কোটিপতি রয়েছেন ৯৪ জন। চেয়ারম্যান প্রার্থীর মধ্যে ৭০ শতাংশ ব্যবসায়ী। এই পরিসংখ্যান বলে দিচ্ছে এক অসুস্থ প্রতিযোগিতার কথা। এক শ্রেণীর মানুষ যারা অর্থের জোরে জনপ্রতিনিধি হয়ে উঠতে চাইছেন। মানুষের সেবা দেয়ার পেশা ছিল রাজনীতি। এখন দৃশ্যপট থেকে রাজনীতিবিদরা হারিয়ে গেছেন। প্রার্থীদের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ, ১১ দশমিক ১৯ শতাংশ নিজেদের পরিচয় দিয়েছেন কৃষিজীবী। তৃতীয় অবস্থানে ৬ দশমিক ৩২ শতাংশ আইনজীবী। জনপ্রতিনিধি হিসেবে এই শ্রেণীর উত্থান ঘটেছে বর্তমান সরকারের সময়ে। যেখানে মানুষের সেবা ও জনপ্রিয়তার ধারণা উধাও হয়েছে। রাজনীতির সাথে একটি উচ্চ মূল্যবোধের যে সম্পর্ক ছিল সেটা পুরোপুরি অনুপস্থিত। শিক্ষক, সমাজকর্মী ইত্যাদি পরিচয়ে যারা সামনে আসছেন তাদের একটা অংশ এই পরিচিতিকে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছেন। এখন একজন আদর্শ শিক্ষক ও সমাজকর্মীর তার ব্যক্তিগত ভাবমর্যাদা দিয়ে প্রতিনিধি নির্বাচিত এর ন্যূনতম সুযোগ নেই। নির্বাচনী হলফনামায় প্রার্থীরা অর্থ সম্পত্তির প্রকৃত বিবরণ দিযেছেন তা আশা করা যায় না। সাধারণত আমাদের দেশের নব্য এই শ্রেণী অবৈধভাবে সম্পদ অর্জন করেছেন। তাতেও দেখা যাচ্ছে এক একজন প্রার্থী ২৫ কোটি টাকা পর্যন্ত অস্থাবর সম্পত্তির মালিক। আটজন প্রার্থীর ১০০ বিঘার ওপর জমি রয়েছে। আইন অনুযায়ী একজন নাগরিক সর্বোচ্চ ১০০ বিঘা বা ৩৩ একর স্থাবর সম্পত্তির মালিক হতে পারেন। এদের মধ্যে একজন প্রার্থীর ৭৪ একরের বেশি জমি রয়েছে। দুর্নীতির মাধ্যমে সম্পদ অর্জনের নানা ফাঁক ফোকর থাকে। যিনি এই সম্পদ কামাই করেন তিনি নিজের চেয়েও অন্যদের নামে এই সম্পদের মালিকানা দেন। যাতে নিজের দুর্নীতির বিষয়টি আড়াল করা যায়। হলফনামা থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যাচ্ছে প্রার্থীদের ওপর নির্ভরশীলদের অর্থসম্পদ বেড়েছে হাজার হাজার গুণ। ক্ষমতার বৃত্তের যত কাছে থাকা যায় তাদের সম্পত্তি তত বেশি বেড়ে যায়। ভুতুড়ে সম্পদ বৃদ্ধির জন্য তাদের কাউকে জবাবদিহি করতে হয় না। দেশে দুর্নীতি দমন কমিশন রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি এ ধরনের দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের পদক্ষেপ নেয় না। এমনকি নির্বাচন কমিশনও এদের নিয়ে একেবারে চোখ বন্ধ করেই থাকে। এই অবস্থায় একে নির্বাচন বলা যায় না। আমাদের দেশে যা হচ্ছে একে অর্থসম্পদ অর্জনকারীদের মধ্যে এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা বলা যায়। অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদ যারা চাতুর্যের সাথে ব্যবহার করতে পারবেন তারাই বনে যাবেন কথিত জনপ্রতিনিধি। এখানে ভোটের কোনো প্রয়োজন নেই। কিছু কিছু এলাকায় ডামি নির্বাচন আয়োজনেরও প্রয়োজন পড়ে না। প্রভাবশালী নেতারা ঠিক করে দেন কে চেয়ারম্যান কে ভাইস চেয়ারম্যান হবেন। নির্বাচন বলতে যা বোঝায় তার কোনো কিছুই অবশিষ্ট নেই।

ট্যাগ :

নিউজটি শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন

অর্থের জোরে জনপ্রতিনিধি

আপলোড টাইম : ০৩:৪৫:৩৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৮ মে ২০২৪

বাংলাদেশে নির্বাচনী ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে গেছে। ভোটের মাধ্যমে জনগণের পছন্দের প্রার্থী নির্বাচিত হবে এই আস্থা হারিয়ে গেছে। তাই কোনো ধরনের নির্বাচনেই নাগরিকদের আগ্রহ আর দেখা যায় না। যার চূড়ান্ত এক নজির ছিল সদ্য বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তাতে মানুষ ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আগ্রহ বোধ করেনি। সরকার যা চেয়েছে বা যাদের সংসদ সদস্য হিসেবে পছন্দ করেছে তারাই জাতীয় সংসদে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছে। নির্বাচনের নামে জনগণের প্রতিনিধি হওয়ার এক চরম অসুস্থ প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে দেশে। তার কদর্য প্রভাব আমরা দেখতে পাচ্ছি উপজেলা নির্বাচনে। এখানে মন্ত্রী এমপির প্রভাব ও অর্থের খেলাই প্রাধান্য পাচ্ছে। যার মামুর জোর বেশি সেই নির্বাচিত হবে। এই ক্ষেত্রে অর্থসম্পদ যার বেশি সেই প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রয়েছে। প্রথম ধাপের উপজেলা নির্বাচনে দেখা গেল ব্যবসায়ী প্রার্থীরা বড় দাগে বেশি। প্রথম ধাপে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ১৪১ উপজেলায় নির্বাচন। কথিত উপজেলা নির্বাচনে প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণ করে তুলে ধরেছে টিআইবি। তাতে দেখা যাচ্ছে গত উপজেলা নির্বাচনের তুলনায় এবার কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে প্রায় তিন গুণ। চেয়ারম্যান প্রার্থীদের মধ্যে কোটিপতি রয়েছেন ৯৪ জন। চেয়ারম্যান প্রার্থীর মধ্যে ৭০ শতাংশ ব্যবসায়ী। এই পরিসংখ্যান বলে দিচ্ছে এক অসুস্থ প্রতিযোগিতার কথা। এক শ্রেণীর মানুষ যারা অর্থের জোরে জনপ্রতিনিধি হয়ে উঠতে চাইছেন। মানুষের সেবা দেয়ার পেশা ছিল রাজনীতি। এখন দৃশ্যপট থেকে রাজনীতিবিদরা হারিয়ে গেছেন। প্রার্থীদের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ, ১১ দশমিক ১৯ শতাংশ নিজেদের পরিচয় দিয়েছেন কৃষিজীবী। তৃতীয় অবস্থানে ৬ দশমিক ৩২ শতাংশ আইনজীবী। জনপ্রতিনিধি হিসেবে এই শ্রেণীর উত্থান ঘটেছে বর্তমান সরকারের সময়ে। যেখানে মানুষের সেবা ও জনপ্রিয়তার ধারণা উধাও হয়েছে। রাজনীতির সাথে একটি উচ্চ মূল্যবোধের যে সম্পর্ক ছিল সেটা পুরোপুরি অনুপস্থিত। শিক্ষক, সমাজকর্মী ইত্যাদি পরিচয়ে যারা সামনে আসছেন তাদের একটা অংশ এই পরিচিতিকে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছেন। এখন একজন আদর্শ শিক্ষক ও সমাজকর্মীর তার ব্যক্তিগত ভাবমর্যাদা দিয়ে প্রতিনিধি নির্বাচিত এর ন্যূনতম সুযোগ নেই। নির্বাচনী হলফনামায় প্রার্থীরা অর্থ সম্পত্তির প্রকৃত বিবরণ দিযেছেন তা আশা করা যায় না। সাধারণত আমাদের দেশের নব্য এই শ্রেণী অবৈধভাবে সম্পদ অর্জন করেছেন। তাতেও দেখা যাচ্ছে এক একজন প্রার্থী ২৫ কোটি টাকা পর্যন্ত অস্থাবর সম্পত্তির মালিক। আটজন প্রার্থীর ১০০ বিঘার ওপর জমি রয়েছে। আইন অনুযায়ী একজন নাগরিক সর্বোচ্চ ১০০ বিঘা বা ৩৩ একর স্থাবর সম্পত্তির মালিক হতে পারেন। এদের মধ্যে একজন প্রার্থীর ৭৪ একরের বেশি জমি রয়েছে। দুর্নীতির মাধ্যমে সম্পদ অর্জনের নানা ফাঁক ফোকর থাকে। যিনি এই সম্পদ কামাই করেন তিনি নিজের চেয়েও অন্যদের নামে এই সম্পদের মালিকানা দেন। যাতে নিজের দুর্নীতির বিষয়টি আড়াল করা যায়। হলফনামা থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যাচ্ছে প্রার্থীদের ওপর নির্ভরশীলদের অর্থসম্পদ বেড়েছে হাজার হাজার গুণ। ক্ষমতার বৃত্তের যত কাছে থাকা যায় তাদের সম্পত্তি তত বেশি বেড়ে যায়। ভুতুড়ে সম্পদ বৃদ্ধির জন্য তাদের কাউকে জবাবদিহি করতে হয় না। দেশে দুর্নীতি দমন কমিশন রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি এ ধরনের দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের পদক্ষেপ নেয় না। এমনকি নির্বাচন কমিশনও এদের নিয়ে একেবারে চোখ বন্ধ করেই থাকে। এই অবস্থায় একে নির্বাচন বলা যায় না। আমাদের দেশে যা হচ্ছে একে অর্থসম্পদ অর্জনকারীদের মধ্যে এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা বলা যায়। অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদ যারা চাতুর্যের সাথে ব্যবহার করতে পারবেন তারাই বনে যাবেন কথিত জনপ্রতিনিধি। এখানে ভোটের কোনো প্রয়োজন নেই। কিছু কিছু এলাকায় ডামি নির্বাচন আয়োজনেরও প্রয়োজন পড়ে না। প্রভাবশালী নেতারা ঠিক করে দেন কে চেয়ারম্যান কে ভাইস চেয়ারম্যান হবেন। নির্বাচন বলতে যা বোঝায় তার কোনো কিছুই অবশিষ্ট নেই।