চুয়াডাঙ্গা রবিবার , ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা, ইরানেও কি হামলা চালাবে যুক্তরাষ্ট্র?

নিউজ রুমঃ
ফেব্রুয়ারি ৪, ২০২৪ ৯:১৮ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

সমীকরণ প্রতিবেদন:
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাতের আশঙ্কা আরও প্রবল হলো। ইরাক ও সিরিয়ায় ইরানের বিপ্লবী গার্ড সমর্থিত ৮৫টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলা চালিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। এতে অন্তত ১৬ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় ওয়াশিংটন-তেহরান উত্তেজনা বাড়তে পারে। সিরিয়া সীমান্তের কাছে জর্ডানে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক ঘাঁটিতে ড্রোন হামলায় তিন মার্কিন সেনার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে গত শুক্রবার রাতে এ অভিযান চালায় মার্কিন বাহিনী। বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে ইরান সমর্থিত মিলিশিয়ারা মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা অব্যাহত রাখলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের মাটিতেও হামলা চালাতে পারে। এ ক্ষেত্রে দু’পক্ষই জড়িয়ে পড়তে পারে সরাসরি যুদ্ধে। হামলার প্রতিশোধ নিতে ইরান সমর্থিত মিলিশিয়ারা মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি সামরিক ঘাঁটিতে তাৎক্ষণিকভাবে ড্রোন আক্রমণ চালিয়েছে।

গত বছরের অক্টোবরে ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর জর্ডানে গত রোববারের হামলাই ছিল মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীর ওপর প্রথম প্রাণঘাতী আঘাত। এতে তিন সেনার মৃত্যু ও আরও অন্তত ৪১ জন আহত হন। ইরান সমর্থিত মিলিশিয়া গোষ্ঠী ‘ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাকের’ যোদ্ধারা এ হামলা চালানোর দায় স্বীকার করে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ওই হামলার ঘটনার পরপরই ইরানকে এর জন্য দোষারোপ করেন। এরপরই ইরানে সরাসরি সামরিক হামলা চালানোর জন্য তাঁর ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়ে। ইরান অবশ্য হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। দেশটি বলেছে, এসব প্রতিরোধ যোদ্ধার ওপর তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। তা সত্ত্বেও ওই হামলার জন্য ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী সমর্থিত ওই মিলিশিয়া গ্রুপকে দায়ী করে প্রতিশোধ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। ইরান বলে আসছে, মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা পরিকল্পনায় তাদের কোনো ভূমিকা ছিল না।
মার্কিন বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, শুক্রবার সিরিয়া ও ইরাকে থাকা ইরানের বিপ্লবী গার্ড কোরের এলিট বাহিনী কুদস ফোর্স ও তাদের সমর্থিত বিভিন্ন মিলিশিয়া গ্রুপের সাতটি জায়গায় বিমান হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। এর মধ্যে চারটি জায়গা সিরিয়ায়, তিনটি ইরাকে। এসব স্থাপনায় সব মিলিয়ে ৮৫টি হামলা চালানো হয়েছে। এর মধ্যে মিলিশিয়া গ্রুপগুলোর কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টার, গোয়েন্দা দপ্তর, রকেট, মিসাইল ও ড্রোন স্টোরেজ ইউনিট এবং গোলাবারুদ ও রসদ সরবরাহ কেন্দ্র রয়েছে। দূরপাল্লার বি১ বোমারু বিমান এ হামলায় অংশ নেয়। সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র থেকে উড়িয়ে নেওয়া হয় সেগুলো। ৩০ মিনিট সময়ের মধ্যে সব স্থাপনায় একযোগে এ হামলা ‘সফল’ হয়েছে বলে দাবি করেছেন মার্কিন জেনারেল ডগলাস সিমস।
প্রেসিডেন্ট বাইডেন এক বিবৃতিতে বলেন, ‘আমাদের জবাব আজ থেকে শুরু হলো। আমাদের পছন্দমতো সময়ে ও জায়গায় এটি চলতে থাকবে।’ তিনি বলেছেন, ‘মধ্যপ্রাচ্য বা বিশ্বের অন্য কোথাও সংঘাত চায় না যুক্তরাষ্ট্র। তবে যারা আমাদের ক্ষতি করতে চায়, তাদের এটা জেনে রাখতে হবে যে যদি একজন আমেরিকানেরও ক্ষতি করা হয়, আমরা তার জবাব দেব।’ এদিকে এ হামলার পর তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইরান, সিরিয়া ও ইরাক। সিরিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যম বলেছে, তাদের দেশের মরুভূমি অঞ্চলে এবং সিরিয়া-ইরাকি সীমান্তের বেশ কয়েকটি স্থাপনায় ‘আমেরিকান আগ্রাসনে’ বহু লোক হতাহত হয়েছে। ইরাকের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ইয়াহইয়া রসুল বলেছেন, তাদের সীমান্তবর্তী এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের এ হামলার মাধ্যমে তাদের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করা হয়েছে, যা পুরো অঞ্চলের অস্থিরতা বাড়িয়ে দিতে পারে।
ইরানেও কি হামলা হবে:
মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে আক্রমণ বন্ধ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করার চেষ্টা করছে। তবে এ হামলা ততটা জোরালো নয় যে এতে ইরান বা তাদের সমর্থক মিলিশিয়াদের সক্ষমতা কমে যাবে। গতকাল শনিবার স্কাই নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানকে সরাসরি আঘাত না করার মাধ্যমে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ইচ্ছাকৃতভাবেই উত্তেজনা বৃদ্ধি এড়াতে চেয়েছেন। তবে আমেরিকান সৈন্যদের ওপর হামলা বন্ধ না হলে তিনি চূড়ান্ত পদক্ষেপ নিতে পারেন। আপাতত তিনি ইরানের অভিজাত কুদস বাহিনীকে টার্গেট করেছেন। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কর্পসের (আইআরজিসি) এই শাখা এ অঞ্চলে ইরানের সামরিক শক্তির সবচেয়ে শক্তিশালী হাত এবং তেহরানের প্রক্সি মিলিশিয়াদের নেটওয়ার্ক পরিচালনায় নিয়োজিত। তবে এই স্তরের আক্রমণও মার্কিন লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে সরাসরি ক্রমবর্ধমান ইরানি প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। ওয়াশিংটন অবশ্য আশা করছে, তেমন কিছু ঘটবে না।
প্রায় চার বছর আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট থাকাকালে যুক্তরাষ্ট্র শীর্ষ ইরানি জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যা করেছিল। তিনি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন, ব্রিটিশ এবং অন্যান্য পশ্চিমা স্বার্থের বিরুদ্ধে প্রক্সি যুদ্ধের সবচেয়ে কার্যকর সময়কালে কুদস বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে ইরাকে ড্রোন হামলায় সোলাইমানি নিহত হন। এর জবাবে ইরাকে মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধের উপক্রম হয়। শেষ পর্যন্ত অবশ্য যুদ্ধ হয়নি। এবার বাইডেন প্রশাসন সম্ভবত একই ধরনের ইরানি প্রতিশোধের ঝুঁকি কমাতে পর্দার আড়ালে কাজ করার চেষ্টা করবে। তবে ওয়াশিংটন বলেছে, শুক্রবারের হামলা ছিল মাত্র শুরু, যার মানে তারা শত্রুদের নজরদারিতে রেখেছে।
স্কাই নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, আপাতত যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ হলো ইরাক ও সিরিয়ায় ইরান-সংযুক্ত ৮৫টি লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে পাল্টা আক্রমণ প্রতিরোধ করতে পারবে না। তাই আবারও মার্কিন সেনা নিহত হলে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের সামনে ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি হামলার নির্দেশ দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না। বিবিসির প্রধান আন্তর্জাতিক সংবাদদাতা লাইসে ডুসেট লিখেছেন, ইরানের মাটিতে সরাসরি আঘাত না করে ইরাক ও সিরিয়ায় হামলা চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্র তেহরান ও তার মিত্রদের কাছে বার্তা পাঠিয়েছে যে ‘লালরেখা অতিক্রম করা হয়েছে’। উভয় পক্ষই এটা স্পষ্ট করেছে যে, তারা আরও বিপজ্জনক উত্তেজনা এড়াতে চায়। তবে এমন সংকটময় সময়ে ভুল গণনার ঝুঁকি থেকেই যায়।
যুক্তরাজ্যের সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল স্যার রিচার্ড ব্যারনস বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ‘নিম্ন স্তরের অশান্তি’ অব্যাহত থাকবে। তিনি বলেছেন, ‘কৌশলগত প্যাটার্ন পরিবর্তন’ না হওয়া পর্যন্ত এ ধারা বদলের সম্ভাবনা নেই। চলতি বছর মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন বা গাজা পরিস্থিতির উন্নতির মাধ্যমে অবস্থার পরিবর্তন হতে পারে। তবে ইরান সংযত আচরণ প্রদর্শন করলেও সুর নরম করেনি। হামলার আগে ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি শুক্রবার বলেছেন, ইরান যুদ্ধ শুরু করবে না। তবে কেউ ইরানকে উত্ত্যক্ত করলে দেশটি এর কঠোর জবাব দেবে।
তাৎক্ষণিক পাল্টা জবাব:
মার্কিন হামলার পর ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাকের যোদ্ধারা উত্তর ইরাকে আমেরিকান বাহিনীর আল-হারির বিমানঘাঁটিতে ড্রোন হামলা চালায় বলে গ্রুপটি বলেছে। এ ছাড়া সিরিয়ার তানফ সামরিক ঘাঁটিতে এবং মার্কিন ও জোটের সৈন্যদের আশ্রয়স্থল পশ্চিম ইরাকের আইন আল-আসাদ ঘাঁটিতে ইরান সমর্থিত যোদ্ধারা হামলা চালিয়েছে। ইরাকে প্রায় ২ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনা রয়েছে। সিরিয়ায় আছে ৯০০ মার্কিন সেনা। জর্ডানেও আছে প্রায় তিন হাজার মার্কিন সৈন্য। উপসাগরে তিনটি বড় বিমানঘাঁটি, বাহরাইনের একটি বন্দরসহ আরও অনেক ঘাঁটি রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। এসব ঘাঁটিতে হামলা নতুন কিছু নয়। যুক্তরাষ্ট্র নিয়মিত প্রতিশোধমূলক হামলা চালিয়ে জবাব দেয়।
ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া:
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মার্কিন হামলা ঠেকাতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র নাসের কানানি বলেছেন, মার্কিন হামলার পরিকল্পনা করা হয়েছে গাজায় ইহুদিবাদী শাসকের অপরাধকে আড়াল করার জন্য। ইরান ইরাক ও সিরিয়ায় হামলাকে দুই দেশের ‘সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার লঙ্ঘন’ বলে নিন্দা জানায়। নাসের কানানি বিবৃতিতে বলেছেন, এ হামলা যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি দুঃসাহসিক এবং কৌশলগত ভুলের প্রতীক; যা শুধু এই অঞ্চলে অস্থিতিশীলতার মধ্যে আরও উত্তেজনা বৃদ্ধি করবে। হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইরাকের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে আনুষ্ঠানিক স্মারকলিপি প্রদানের জন্য তলব করার ঘোষণা দিয়েছে। সিরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইরাক ও সিরিয়ার লক্ষ্যবস্তুতে মার্কিন হামলার নিন্দা করেছে।
এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মার্কিন হামলা আবারও প্রমাণ করেছে, এর সামরিক বাহিনী আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলেছে এবং এ অঞ্চলে সংঘাতের জন্ম দিয়েছে। সিরিয়ার সরকার তাদের দেশে মার্কিন উপস্থিতির বিরোধিতা করে এবং একে দখলদারিত্ব বলে অভিহিত করে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতিপ্রধান জোসেপ বোরেল বলেন, পরিস্থিতি যাতে উত্তপ্ত হয়ে না ওঠে, তা এড়াতে সবার চেষ্টা করা উচিত। তিনি বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্য একটি বয়লার, যা বিস্ফোরিত হতে পারে। হামলার পর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক ডেকেছে রাশিয়া।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।