চুয়াডাঙ্গা সোমবার , ১৫ জানুয়ারি ২০২৪

ফের শুরু থেকে শুরু করতে চায় বিএনপি, আন্দোলনে গতি ফেরাতে চলছে প্রস্তুতি

নতুন সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করার পরিকল্পনা

নিউজ রুমঃ
জানুয়ারি ১৫, ২০২৪ ১০:০৬ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!


সমীকরণ প্রতিবেদন:
নবগঠিত সরকারের কর্মকাণ্ডকে ‘প্রশ্নবিদ্ধ’ করা ও আগামী পাঁচ বছরের মেয়াদ পূরণের পথে বাধা সৃষ্টির লক্ষ্যকে প্রাধান্য দিয়েই ভবিষৎ কর্মকৌশল ঠিক করছে রাজপথের অন্যতম প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। এ জন্য ‘নিস্তেজ’ আন্দোলনে গতি ফেরাতে নতুন প্রস্তুতি চলছে দলটিতে। এ পথে বেশ কিছু শক্ত চ্যালেঞ্জ রয়েছে জানিয়ে বিএনপির হাইকমান্ডের ভাষ্য- আগামী দিনে, কারাবন্দি নেতা-কর্মীদের মুক্ত করা, দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে রদবদল, সর্বদলীয় ঐক্য গঠন, কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ধরে রাখা, আন্দোলনে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোসহ বেশ কিছু কর্মকৌশল নিয়ে তারা ভাবছেন। শলাপারমর্শ করছেন রাজনৈতিক মিত্রদের সঙ্গেও। তবে নতুন করে কীভাবে সবকিছু শুরু হবে, সেটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ভোট ঠেকাতে না পারলেও এক ধরনের সন্তুষ্টি রয়েছে বিএনপিতে। দলটির হাইকমান্ডের দাবি- ভোটকেন্দ্রে ভোটারের কম উপস্থিতি বিএনপির পক্ষে তাদের অবস্থানের ‘বিশেষ বার্তা’। যে কোনো মূল্যে এই জনসমর্থন ধরে রাখতে নির্দলীয় সরকারের অধীনে সব দলের অংশগ্রহণে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি ‘জিইয়ে’ রাখতে হবে। অনেক নেতাই বিষয়টিকে শক্ত চ্যালেঞ্জ মনে করেছেন। তবে লক্ষ্য অর্জনে রাজপথের আন্দোলনের বিকল্প কিছু ভাবছেন না তারা। নেতাদের ভাষ্য- বড় আন্দোলনের জন্য নতুন করে প্রস্তুতি প্রয়োজন। তবে দেশের অর্থনৈতিক যে পরিস্থিতি, তাতে যে কোনো সময় গণআন্দোলন হয়ে যেতেও পারে। বিশ্বের অনেক দেশেই আকস্মিক আন্দোলনে ‘কর্তৃত্ববাদী’ সরকারকে বিদায় নিতে হয়। এ কারণেই সাধারণ ভোটারদের ‘বার্তা’ বুঝেই আগামীর কর্মসূচি প্রণয়ন করতে হচ্ছে।

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, বিএনপি জনগণের ওপর আস্থা রেখেছিল; জনগণ সেই আস্থা ফিরিয়ে দিয়েছে। তাদের স্যলুট জানাই। আমি মনে করি, জনগণের এই আস্থার জায়গাটা ধরে রাখাই বিএনপির জন্য এখন মূল চ্যালেঞ্জ। নতুন সরকার নিয়ে আমরা মোটেও চিন্তিত নই। এই সরকার যে আগামী পাঁচ বছরই টিকতে পারবে তারই বা নিশ্চয়তা কি? কি হবে সেটা সময়ই বলে দেবে; তবে দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রশ্নে বিএনপি আপস করবে না।
নেতা-কর্মীদের মুক্তির বিষয়ে নজর :বিএনপির অসংখ্য নেতা-কর্মী মামলার আসামি হয়ে ফেরারি জীবনযাপন করছেন। প্রায় ২৭ হাজার নেতা-কর্মী কারাবন্দি রয়েছেন। এখন তাদের জামিনে মুক্ত করার বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে দলীয় আইনজীবীদের সঙ্গে বৈঠক করছে দলটি। একই সঙ্গে কর্মী-সমর্থকদের ধীরে ধীরে কর্মসূচিতে সম্পৃক্ত করতে সাংগঠনিক তৎপরতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপি। সূত্র জানায়, বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব এখন বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে শলাপরামর্শে ব্যস্ত। সরকারকে বিদায় জানানোর জন্য সব বিরোধী দলের মধ্যে ঐক্য সৃষ্টির চেষ্টা চলছে। এই মুহূর্তে দলীয় শক্তিকে সুসংহত করে রাজপথে নিজেদের অবস্থানকে দৃশ্যমান এবং আন্দোলন অব্যাহত রাখার কৌশল প্রণয়ন করছে বিএনপির হাইকমান্ড।

সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে এরই মধ্যে বাংলাদেশ সম্পর্কে দুটি তথ্য প্রকাশিত হয়েছে- যা আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষে যায়নি এবং তা বিএনপি আন্দোলনের সহায়ক উপাদান হিসেবে ব্যবহার করবে। প্রথমত, ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সতর্কবাণী যাতে জ্বালানি সংকটসহ পাঁচটি ঝুঁঁকির কথা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন। দলটির বিশ্বাস- বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতিবাচক বিবৃতিগুলো বিএনপির মূল দাবির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হওয়ায় তা আগামী দিনের আন্দোলনে সহায়ক হবে।

বিএনপির আগামীর পরিকল্পনার বিষয়ে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান বলেন, দেশের মানুষ গত ৭ জানুয়ারি নির্বাচনের মাধ্যমে কর্তৃত্ববাদী সরকারকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে। এ কারণে সব গণতন্ত্রকামী দলের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিএনপি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে রাজপথের আন্দোলন ফের জোরদার করবে। এ লক্ষ্যে দলমতনির্বিশেষে সবার সঙ্গে আলোচনা করেই ভবিষ্যৎ কর্মসূচি প্রণয়নে লক্ষ্য কাজ চলছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেছেন, অধিক জনপ্রিয়তা থাকার পরও নেতৃত্ব, সাংগঠনিক নড়বড়ে অবস্থা, কূটনৈতিক তৎপরতায় ঘাটতির কারণে বারবার তীরে এসে তরি ডোবে বিএনপির। এই মূহর্তে দলটির উচিত যোগ্যদের মূল্যায়ন করা, সাহসী নেতৃত্বের মাধ্যমে দলকে ঢেলে সাজানো। স্থায়ী কমিটিতে যোগ্য তরুণদের নেতৃত্বে আনা। আন্তর্জাতিক কমিটিতে রদবদল করে অভিজ্ঞদের দায়িত্ব দেয়া। সর্বোপরি সরকারবিরোধী সব সমমনা দলকে একই প্ল্যার্টফমে এনে রাজপথের শক্তি আরো পোক্ত করা ও তৃণমূলের ধৈর্য ও শক্তিকে কাজে লাগানো। দলকে শক্ত অবস্থানে ধরে রাখা বিএনপির জন্য কতটা চ্যালেঞ্জ হবে তা দেখা যাবে সরকারের মেয়াদকালে। বিএনপি যেমন আগামী সরকারের জন্য আন্দোলনের আগাম চ্যালেঞ্জ ঘোষণার কৌশল নিতে যাচ্ছে, তেমনি সরকারি দলও তা মোকাবিলার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, মামলা-হামলা, নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক দুর্বলতা নিরসন করে ঘুরে দাঁড়ানো বিএনপির সামনে চ্যালেঞ্জ। দলটির ব্যাপক জনসমর্থন রয়েছে। তবে নেতৃত্বের প্রতি আস্থার ঘাটতি রয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতি চলে যাচ্ছে বিদেশিদের হাতে। এখানে রাজনৈতিক দল, জনগণ এবং সুশীল সমাজের ভূমিকা গৌণ হয়ে যাচ্ছে। বিএনপিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্ক আরো জোরদার করার পাশাপাশি আগামীতে দলটির অত্যাধিক বিদেশ নির্ভরতা থেকে সরে আসতে হবে।

কর্মীরা দেখছেন নতুন স্বপ্ন :
আড়াই মাস পর বিএনপির নেতা-কর্মীরা গত বৃহস্পতিবার তালা ভেঙে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ঢোকেন। ঐদিন ঢাকাসহ আশপাশের জেলা থেকে অংসখ্য নেতা-কর্মী এসে জড়ো হোন পার্টি অফিসের সামনে। এরপর থেকে প্রতিদিনই ব্যাপক উচ্ছ্বাস উদ্দীপনা নিয়ে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কর্মীরা সেখানে অবস্থান করছেন। আগের মতোই নিয়ম করে সংবাদ সম্মেলন করেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী আহমেদ। আত্মগোপনে থাকা নেতারাও প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছেন। কর্মীদের প্রত্যাশা- মহাসচিবসহ কারাবন্দি নেতারা শিগগিরই মুক্তি পাবেন। আবার আন্দোলনের নতুন যাত্রা শুরু হবে।

তবে নির্বাচন ঠেকাতে না পারা এবং বিগত আন্দোলনে কর্মসূচিতে সিনিয়র নেতাদের অনুপস্থিতি নিয়ে সমালোচনা করতেও তারা ছাড়ছেন না। কর্মীদের আক্ষেপ- মানুষ ভোট দিতে না গেলেও আওয়ামী লীগ তো ক্ষমতায় এসেছে, এটাই বাস্তবতা। নয়াপল্টনের কার্যালয়ে এসেছিলেন চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার ৯ নম্বর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আনোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমরা চেষ্টার ত্রুটি করিনি। আন্দোলনে ব্যর্থ হওয়ার দায় সিনিয়র নেতাদের। কারণ, তারা কর্মসূচি ঘোষণার পর আর কোনো ভূমিকা রাখেননি। নির্বাচনের পরেও একটা হরতাল অবরোধ দিল না। জানি না, তারা কি চান। তবে আমার মতো অনেকেরই মন ভেঙে গেছে। কিন্তু আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া ছাড়া আর উপায় নেই। এবার কেন্দ্র থেকে শক্ত আন্দোলনের সঠিক দিক নির্দেশা চাই।’

ফের সভা-সমাবেশ দিয়ে শুরু :
আওয়ামী লীগ নতুন সরকার গঠন করলেও যুগপৎভাবে আন্দোলন অব্যাহত রাখবে বিএনপি। নির্বাচনে ‘ভোট ডাকাতি’ এবং নানা অনিয়ম-কারচুপির অভিযোগ তুললেও বাস্তবতার নিরিখে এখনই সরকারের বিরুদ্ধে বড় কোনো কর্মসূচিতে যাচ্ছে না দলটি। এর পক্ষে দলটির ব্যাখ্যা- হরতাল-অবরোধে নেতা-কর্মীরা বেশ ক্লান্ত। অনেকেই বহুদিন বাড়িঘরে যেতে পারেননি; তাদেরও খানিকটা বিশ্রাম প্রয়োজন। তাছাড়া এই মূহর্তে হরতাল-অবরোধের কর্মসূচি দিলে সেটিকে ঘিরে অন্য কোনো পক্ষ নাশকতা ঘটিয়ে বিএনপির ওপর এর দায় চাপাতে পারে। এ জন্য নানাদিক ভেবে আপাতত দেশব্যাপী জেলা ও মহানগরে সভা-সমাবেশ, গণসংযোগ ও গণমিছিল, কালো পতাকা মিছিলের মতো শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির প্রতি গুরুত্ব দিচ্ছে বিএনপি। এ বিষয়ে বিভিন্ন দল ও জোটের শীর্ষ নেতাদের মতামত নেয়া হচ্ছে।

সূত্র জানায়, দ্রুততম সময়ের মধ্যেই নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। পাশাপাশি পশ্চিমা প্রভাবশালী দেশগুলো কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়, সেই পর্যন্ত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে দলটি। এ নিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা কাজ করছেন। এরই মধ্যে নির্বাচনের অনিয়ম-ত্রুটি নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছে বিএনপি। সেইসঙ্গে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন দূতাবাস, দাতা ও মানবাধিকার সংস্থাকেও বিষয়টি অবহিত করবে দলটি। অবশ্য বিএনপির নেতা-কর্মীরা বলছেন, আওয়ামী লীগ যেভাবে ‘ডামি’ ও ‘প্রহসনের নির্বাচন’ করেছে, তাতে নিজেরাই খুব স্বস্তিতে নেই।

নতুন কর্মসূচির বিষয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, আমাদের অসংখ্য নেতা-কর্মী এখনো ঘরবাড়ি ছাড়া। এলাকায় গেলে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপদ্রব এবং আওয়ামী লীগের সশস্ত্র ক্যাডাররা পরিবারে আক্রমণ করছে। ভয়াবহ নিপীড়নের মধ্যে মানবেতর দিন যাপন করছেন তারা। নেতা-কর্মীরা অনেক দিন কারাগারে আছেন। এখন তাদের জামিনের বিষয়ে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। তবে আন্দোলব কর্মসূচি বন্ধ হয়নি। আমরা কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় আছি। শিগগির নতুন কর্মসূচি আসবে।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।