ইপেপার । আজ মঙ্গলবার, ০৫ মার্চ ২০২৪, ২২ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

ভোটের মাঠে টাকার খেলা

সমীকরণ প্রতিবেদন
  • আপলোড টাইম : ১০:১৪:২২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৩
  • / ৬ বার পড়া হয়েছে

সমীকরণ প্রতিবেদন:
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় ভোটারপ্রতি ১০ টাকা ব্যয় করতে পারবেন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা। নির্বাচনী ব্যয় নির্ধারণ করে দিয়ে জারি করা প্রজ্ঞাপনে এই ব্যয়সীমা ঠিক করে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। জাতীয় সংসদ নির্বাচন সংক্রান্ত আইন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী, একজন প্রার্থীর নির্বাচনী ব্যয় সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা। নির্বাচন শেষে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রার্থীদের ব্যয়ের এ হিসাব নির্বাচন কমিশনে জমা দিতে হবে।

তবে সাধারণত এই হিসাব ইসি যাচাই না করায় এবারও বিভিন্ন মহলে শুরু হয়েছে টাকার খেলা। ভোটের দিনক্ষণ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে যা পালস্না দিয়ে আরও বাড়ছে। শহর-বন্দর-গ্রাম সবখানেই নগদ টাকার প্রবাহে নতুন গতি দেখা যাচ্ছে। এতে নির্বাচনের আগে-পরে নতুন করে মূল্যস্ফীতি আরও এক ধাপ বৃদ্ধি পেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদরা।

নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা জানান, দেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একজন প্রার্থীর ক্ষেত্রে যে ব্যয়সীমা দেওয়া আছে, ইউনিয়ন পরিষদের একজন সদস্যও তার চেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করেন। নিয়ম অনুসারে একজন প্রার্থী ভোটার প্রতি সর্বোচ্চ ১০ টাকা ব্যয় করতে পারেন। অথচ কোনো কোনো প্রার্থীর ভোটার প্রতি খরচের হার এক থেকে দুই হাজার টাকা ছাড়িয়ে যায়। যদিও সব প্রার্থীই কাগজে-কলমে নির্বাচনী ব্যয় নির্ধারিত সীমার মধ্যেই দেখান। তাই নির্বাচন সামনে রেখে সম্ভাব্য প্রার্থীরা আগে থেকেই টাকা সংগ্রহ শুরু করেন। যার বেশিরভাগই আইনানুগভাবে অপ্রদর্শিত টাকা। এভাবে নির্বাচনকে ঘিরে অঘোষিত টাকার খেলা চলছে।

সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের একজন প্রার্থীর বাসভবনে ভুড়িভোজ করিয়ে প্রত্যেককে এক হাজার টাকা করে বিতরণ করার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় ভোটের লড়াইয়ে টাকার খেলার বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। এ ভিডিওটি প্রকাশ করে অপর এক প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বলেন, ‘এদেশের অনেক মানুষ যারা স্বচ্ছল না, তাদের যদি এভাবে খাইয়ে-দায়িয়ে হাজার টাকা করে দেওয়া হয়, তাহলে এটাতো আচরণ বিধি লঙ্ঘন হয়। বিষয়টা জেলা নির্বাচন কর্মকর্তাকে জানানো হয়েছে। দেখা যাক কী হয়?’

নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এ ধরণের স্বল্প সংখ্যক ঘটনা প্রকাশ পেলেও আড়ালে-আবডালে শত শত ঘটনা ঘটছে। ভোটের দিন ঘনিয়ে আসায় এ ধরনের টাকা ব্যবহারের বিস্তার বেড়েছে। যা ৭ জানুয়ারি ভোটের দিন পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, প্রধান বিরোধী দল বিএনপি আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ না নিলেও এবার আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী ও দলীয় স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে তুমুল ভোটের লড়াই হবে। তাই নেতাকর্মীদের নিজের পক্ষে ভেড়াতে উভয় পক্ষকেই বিপুল অর্থ খরচ করতে হচ্ছে। এছাড়া নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য করে

তুলতে ভোটারদের ভোটকেন্দ্রমুখী করার কাজেও প্রার্থীরা বড় বাজেট রাখছেন। যা ইসির বেঁধে দেওয়া নির্বাচনী ব্যয়ের সীমার মধ্যে সামাল দেওয়া কঠিন। তাই অধিকাংশ প্রার্থীই নিঃসন্দেহে ভোটের মাঠে বিপুল পরিমাণ টাকা ছড়াচ্ছেন। যেগুলোর হিসাব নির্বাচন কমিশনের অজানা থাকবে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশের নির্বাচনে বাস্তবে কী পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়, সে ব্যাপারে সরকারি কোনো গবেষণা নেই। তবে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার গবেষণা বলছে, নির্বাচনী অর্থনীতির আকার ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি। প্রতি নির্বাচনেই এ হার ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ছে।

নির্বাচন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের সঙ্গে জড়িত গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, মনোনয়ন পাওয়ার আগেই বিশাল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করেন প্রার্থীরা। মনোনয়ন পেতে প্রকাশ্য ও গোপনে নানা ধরনের তৎপরতা চলে। এ ক্ষেত্রে দলের শীর্ষ পর্যায়ে মোটা অঙ্কের চাঁদা দেওয়ার অভিযোগও আছে। উন্নয়নের জন্য ব্যক্তি বা দলীয় পরিসরে অর্থায়ন। এছাড়াও ক্লাব, সমিতি, ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানে দিতে হচ্ছে অর্থ।

এ ক্ষেত্রে প্রার্থীর পাশাপাশি পরবর্তী সময়ে দলীয় পদ পেতে আগ্রহীরাও ব্যয় করছেন বড় অঙ্কের অর্থ। সবকিছু মিলে নির্বাচনকে ঘিরে বাজারে বিশাল অঙ্কের টাকার প্রবাহ লক্ষ্য করা যায়। এ টাকার প্রায় পুরোটাই ঘোষণা দেওয়া হয় না বা প্রদর্শন করা হয় না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বাচনের ব্যয় সীমার মধ্যে রাখতে অডিট পদ্ধতি চালু করা যেতে পারে।

এ ব্যাপারে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘নির্বাচনী ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে না পারলে সৎ ও যোগ্যপ্রার্থী আসবে না। এতে সুশাসন ব্যাহত হবে। তিনি বলেন, নির্বাচনে অঘোষিত টাকার ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। তার মতে, ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য প্রতিনিয়ত এগুলোর পর্যবেক্ষণ ও নিরীক্ষণ আবশ্যক। এজন্য অডিটর নিয়োগ করা যেতে পারে।’

উলেস্নখ্য, সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রত্যেক প্রার্থীর জন্য মনোনয়ন পত্রের সঙ্গে সম্ভাব্য নির্বাচনী ব্যয়ের উৎসের একটি বিবরণী দাখিল করা বাধ্যতামূলক। নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব তফসিলি ব্যাংকে সংরক্ষণ করাও আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক। নির্বাচনের ফল ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে প্রত্যেক প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে নির্ধারিত ফরমে নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব রিটার্নিং অফিসারের কাছে দাখিল করতে হয়। আর এসব বিষয় শুধু আইনেই সীমাবদ্ধ। বাস্তবে এটি কেউ মেনে চলেন না।

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা ১১ কোটি ৯০ লাখ ৬১ হাজার ১৫৮ জন। এ ক্ষেত্রে ভোটার প্রতি সর্বোচ্চ ব্যয় ১০ টাকা। প্রতি আসনে ৫ জন করে প্রার্থী হলেও মোট নির্বাচনী ব্যয় হওয়া উচিত ৬০০ কোটি টাকার মধ্যে। কোনোভাবেই তা হাজার কোটি টাকার বাইরে যাওয়ার কথা নয়। কিন্তু বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার হিসাবে নির্বাচনী অর্থনীতির আকার ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি। এক্ষেত্রে সব প্রার্থী সমানভাবে ব্যয় করতে পারেন না। বড় দলের প্রার্থীরা বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে থাকেন। তারা কেউ কেউ ২৫ লাখের পরিবর্তে ২০-২৫ কোটি টাকাও ব্যয় করেন। খুব সীমিত সময়ে এ অর্থ ব্যয় হওয়ার কারণে মূল্যস্ফীতিতেও এর বড় প্রভাব পড়ে। নির্বাচন শেষে বেড়ে যায় মূল্যস্ফীতি।

সরেজমিন তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবার দলীয় মনোনয়ন পাওয়া প্রার্থীর বাইরে দলের অন্য নেতাদেরও নির্বিঘ্নে ভোটের লড়াইয়ে নামার সুযোগ করে দেয়। এতে নৌকার প্রতীক পাওয়া মানে নিশ্চিত বিজয়- প্রার্থীদের এ স্বপ্ন গুঁড়িয়ে যায়। পাশাপাশি জাপাসহ জোটের অন্যান্য শরিকদের সহজ শর্তে ছাড় না দিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তাদেরকে জয় ছিনিয়ে নেওয়ার কথা বলায় নির্বাচনী চিত্র রাতারাতি বদলে গেছে। ভোটারদের নিয়ে সারা দেশে প্রার্থীদের মধ্যে গোপনে ব্যাপক তৎপরতা শুরু হয়েছে। এসব কাজে প্রার্থীরা এখন পানির মতো টাকা খরচ করছেন। এসব ব্যয়ের বড় অংশই থেকে যাচ্ছে অপ্রদর্শিত। আর যারা নির্বাচন করবেন, তারা আগে থেকে এ প্রস্তুতি নিয়েছিলেন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, এ ক্ষেত্রে ঘুষ, দুর্নীতি, টেন্ডারবাজি, মাদক ব্যবসা, চোরাকারবারি, নামে-বেনামে ব্যাংক ঋণ এবং শেয়ারবাজারকে টাকা আয়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুসারে, বর্তমানে দেশের ব্যাংকিং খাতে বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি ১৫ লাখ ৬৫ হাজার ১৯৫ কোটি টাকা। এ ঋণের উলেস্নখযোগ্য একটি অংশ বা ঋণ বিনিয়োগ করে অর্জিত আয়ের একটি বড় অংশ নির্বাচনে ব্যবহার হবে।

এদিকে নির্বাচনী ব্যয়ের ধরনে এবার বেশকিছু পরিবর্তন এসেছে। আগে প্রার্থীদের ব্যয়ের বড় অংশ খাদ্য খাতে যেত। বর্তমানে নগদ টাকার বিতরণ বাড়ছে। এছাড়া এখন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ভোটারদের অর্থ দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের শিক্ষক নাসিমা আক্তার হুসেইন বলেন, নির্বাচনে অপ্রদর্শিত অর্থ ব্যবহারের সুযোগ থাকলে তা যোগ্য প্রার্থীর উঠে আসার পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে। এ জন্য নিবার্চন কমিশন এবং সরকারের যৌথভাবে কাজ করা উচিত। যাতে নির্ধারিত খরচের বাইরে কোনো প্রার্থী যেতে না পারেন। নিয়মকানুনের মধ্যেও এ ধরনের কোনো ফাঁক ফোকর থাকা উচিত নয়।

তৃণমূলের রাজনীতিকরা জানান, আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নির্বিঘ্নে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার ঘোষণার পর থেকেই এ ধরনের অঘোষিত টাকার ছড়াছড়ি শুরু হয়েছে। ভোটারদের আনুকূল্য লাভ, নেতাকর্মী-ক্যাডার জোগাড়- সবখানেই প্রার্থীরা দু’হাতে টাকা খরচ করছেন। প্রার্থীদের অনেকে সেকেন্ড কিংবা থার্ড মিডিয়ার মাধ্যমে ভোটারদের হাতে নগদ টাকা পাঠাচ্ছেন। কর্মীদের মাধ্যমে ভোটারদের বিকাশ নাম্বার সংগ্রহ করে নগদ টাকা পাঠানোরও বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। যদিও এ নিয়ে এখনো কোনো পক্ষ থেকে সরাসরি কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি বলে নির্বাচন কমিশন দাবি করেছে।

ট্যাগ :

নিউজটি শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন

ভোটের মাঠে টাকার খেলা

আপলোড টাইম : ১০:১৪:২২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৩

সমীকরণ প্রতিবেদন:
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় ভোটারপ্রতি ১০ টাকা ব্যয় করতে পারবেন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা। নির্বাচনী ব্যয় নির্ধারণ করে দিয়ে জারি করা প্রজ্ঞাপনে এই ব্যয়সীমা ঠিক করে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। জাতীয় সংসদ নির্বাচন সংক্রান্ত আইন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী, একজন প্রার্থীর নির্বাচনী ব্যয় সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা। নির্বাচন শেষে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রার্থীদের ব্যয়ের এ হিসাব নির্বাচন কমিশনে জমা দিতে হবে।

তবে সাধারণত এই হিসাব ইসি যাচাই না করায় এবারও বিভিন্ন মহলে শুরু হয়েছে টাকার খেলা। ভোটের দিনক্ষণ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে যা পালস্না দিয়ে আরও বাড়ছে। শহর-বন্দর-গ্রাম সবখানেই নগদ টাকার প্রবাহে নতুন গতি দেখা যাচ্ছে। এতে নির্বাচনের আগে-পরে নতুন করে মূল্যস্ফীতি আরও এক ধাপ বৃদ্ধি পেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদরা।

নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা জানান, দেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একজন প্রার্থীর ক্ষেত্রে যে ব্যয়সীমা দেওয়া আছে, ইউনিয়ন পরিষদের একজন সদস্যও তার চেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করেন। নিয়ম অনুসারে একজন প্রার্থী ভোটার প্রতি সর্বোচ্চ ১০ টাকা ব্যয় করতে পারেন। অথচ কোনো কোনো প্রার্থীর ভোটার প্রতি খরচের হার এক থেকে দুই হাজার টাকা ছাড়িয়ে যায়। যদিও সব প্রার্থীই কাগজে-কলমে নির্বাচনী ব্যয় নির্ধারিত সীমার মধ্যেই দেখান। তাই নির্বাচন সামনে রেখে সম্ভাব্য প্রার্থীরা আগে থেকেই টাকা সংগ্রহ শুরু করেন। যার বেশিরভাগই আইনানুগভাবে অপ্রদর্শিত টাকা। এভাবে নির্বাচনকে ঘিরে অঘোষিত টাকার খেলা চলছে।

সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের একজন প্রার্থীর বাসভবনে ভুড়িভোজ করিয়ে প্রত্যেককে এক হাজার টাকা করে বিতরণ করার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় ভোটের লড়াইয়ে টাকার খেলার বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। এ ভিডিওটি প্রকাশ করে অপর এক প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বলেন, ‘এদেশের অনেক মানুষ যারা স্বচ্ছল না, তাদের যদি এভাবে খাইয়ে-দায়িয়ে হাজার টাকা করে দেওয়া হয়, তাহলে এটাতো আচরণ বিধি লঙ্ঘন হয়। বিষয়টা জেলা নির্বাচন কর্মকর্তাকে জানানো হয়েছে। দেখা যাক কী হয়?’

নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এ ধরণের স্বল্প সংখ্যক ঘটনা প্রকাশ পেলেও আড়ালে-আবডালে শত শত ঘটনা ঘটছে। ভোটের দিন ঘনিয়ে আসায় এ ধরনের টাকা ব্যবহারের বিস্তার বেড়েছে। যা ৭ জানুয়ারি ভোটের দিন পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, প্রধান বিরোধী দল বিএনপি আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ না নিলেও এবার আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী ও দলীয় স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে তুমুল ভোটের লড়াই হবে। তাই নেতাকর্মীদের নিজের পক্ষে ভেড়াতে উভয় পক্ষকেই বিপুল অর্থ খরচ করতে হচ্ছে। এছাড়া নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য করে

তুলতে ভোটারদের ভোটকেন্দ্রমুখী করার কাজেও প্রার্থীরা বড় বাজেট রাখছেন। যা ইসির বেঁধে দেওয়া নির্বাচনী ব্যয়ের সীমার মধ্যে সামাল দেওয়া কঠিন। তাই অধিকাংশ প্রার্থীই নিঃসন্দেহে ভোটের মাঠে বিপুল পরিমাণ টাকা ছড়াচ্ছেন। যেগুলোর হিসাব নির্বাচন কমিশনের অজানা থাকবে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশের নির্বাচনে বাস্তবে কী পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়, সে ব্যাপারে সরকারি কোনো গবেষণা নেই। তবে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার গবেষণা বলছে, নির্বাচনী অর্থনীতির আকার ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি। প্রতি নির্বাচনেই এ হার ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ছে।

নির্বাচন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের সঙ্গে জড়িত গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, মনোনয়ন পাওয়ার আগেই বিশাল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করেন প্রার্থীরা। মনোনয়ন পেতে প্রকাশ্য ও গোপনে নানা ধরনের তৎপরতা চলে। এ ক্ষেত্রে দলের শীর্ষ পর্যায়ে মোটা অঙ্কের চাঁদা দেওয়ার অভিযোগও আছে। উন্নয়নের জন্য ব্যক্তি বা দলীয় পরিসরে অর্থায়ন। এছাড়াও ক্লাব, সমিতি, ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানে দিতে হচ্ছে অর্থ।

এ ক্ষেত্রে প্রার্থীর পাশাপাশি পরবর্তী সময়ে দলীয় পদ পেতে আগ্রহীরাও ব্যয় করছেন বড় অঙ্কের অর্থ। সবকিছু মিলে নির্বাচনকে ঘিরে বাজারে বিশাল অঙ্কের টাকার প্রবাহ লক্ষ্য করা যায়। এ টাকার প্রায় পুরোটাই ঘোষণা দেওয়া হয় না বা প্রদর্শন করা হয় না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বাচনের ব্যয় সীমার মধ্যে রাখতে অডিট পদ্ধতি চালু করা যেতে পারে।

এ ব্যাপারে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘নির্বাচনী ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে না পারলে সৎ ও যোগ্যপ্রার্থী আসবে না। এতে সুশাসন ব্যাহত হবে। তিনি বলেন, নির্বাচনে অঘোষিত টাকার ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। তার মতে, ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য প্রতিনিয়ত এগুলোর পর্যবেক্ষণ ও নিরীক্ষণ আবশ্যক। এজন্য অডিটর নিয়োগ করা যেতে পারে।’

উলেস্নখ্য, সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রত্যেক প্রার্থীর জন্য মনোনয়ন পত্রের সঙ্গে সম্ভাব্য নির্বাচনী ব্যয়ের উৎসের একটি বিবরণী দাখিল করা বাধ্যতামূলক। নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব তফসিলি ব্যাংকে সংরক্ষণ করাও আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক। নির্বাচনের ফল ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে প্রত্যেক প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে নির্ধারিত ফরমে নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব রিটার্নিং অফিসারের কাছে দাখিল করতে হয়। আর এসব বিষয় শুধু আইনেই সীমাবদ্ধ। বাস্তবে এটি কেউ মেনে চলেন না।

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা ১১ কোটি ৯০ লাখ ৬১ হাজার ১৫৮ জন। এ ক্ষেত্রে ভোটার প্রতি সর্বোচ্চ ব্যয় ১০ টাকা। প্রতি আসনে ৫ জন করে প্রার্থী হলেও মোট নির্বাচনী ব্যয় হওয়া উচিত ৬০০ কোটি টাকার মধ্যে। কোনোভাবেই তা হাজার কোটি টাকার বাইরে যাওয়ার কথা নয়। কিন্তু বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার হিসাবে নির্বাচনী অর্থনীতির আকার ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি। এক্ষেত্রে সব প্রার্থী সমানভাবে ব্যয় করতে পারেন না। বড় দলের প্রার্থীরা বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে থাকেন। তারা কেউ কেউ ২৫ লাখের পরিবর্তে ২০-২৫ কোটি টাকাও ব্যয় করেন। খুব সীমিত সময়ে এ অর্থ ব্যয় হওয়ার কারণে মূল্যস্ফীতিতেও এর বড় প্রভাব পড়ে। নির্বাচন শেষে বেড়ে যায় মূল্যস্ফীতি।

সরেজমিন তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবার দলীয় মনোনয়ন পাওয়া প্রার্থীর বাইরে দলের অন্য নেতাদেরও নির্বিঘ্নে ভোটের লড়াইয়ে নামার সুযোগ করে দেয়। এতে নৌকার প্রতীক পাওয়া মানে নিশ্চিত বিজয়- প্রার্থীদের এ স্বপ্ন গুঁড়িয়ে যায়। পাশাপাশি জাপাসহ জোটের অন্যান্য শরিকদের সহজ শর্তে ছাড় না দিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তাদেরকে জয় ছিনিয়ে নেওয়ার কথা বলায় নির্বাচনী চিত্র রাতারাতি বদলে গেছে। ভোটারদের নিয়ে সারা দেশে প্রার্থীদের মধ্যে গোপনে ব্যাপক তৎপরতা শুরু হয়েছে। এসব কাজে প্রার্থীরা এখন পানির মতো টাকা খরচ করছেন। এসব ব্যয়ের বড় অংশই থেকে যাচ্ছে অপ্রদর্শিত। আর যারা নির্বাচন করবেন, তারা আগে থেকে এ প্রস্তুতি নিয়েছিলেন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, এ ক্ষেত্রে ঘুষ, দুর্নীতি, টেন্ডারবাজি, মাদক ব্যবসা, চোরাকারবারি, নামে-বেনামে ব্যাংক ঋণ এবং শেয়ারবাজারকে টাকা আয়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুসারে, বর্তমানে দেশের ব্যাংকিং খাতে বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি ১৫ লাখ ৬৫ হাজার ১৯৫ কোটি টাকা। এ ঋণের উলেস্নখযোগ্য একটি অংশ বা ঋণ বিনিয়োগ করে অর্জিত আয়ের একটি বড় অংশ নির্বাচনে ব্যবহার হবে।

এদিকে নির্বাচনী ব্যয়ের ধরনে এবার বেশকিছু পরিবর্তন এসেছে। আগে প্রার্থীদের ব্যয়ের বড় অংশ খাদ্য খাতে যেত। বর্তমানে নগদ টাকার বিতরণ বাড়ছে। এছাড়া এখন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ভোটারদের অর্থ দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের শিক্ষক নাসিমা আক্তার হুসেইন বলেন, নির্বাচনে অপ্রদর্শিত অর্থ ব্যবহারের সুযোগ থাকলে তা যোগ্য প্রার্থীর উঠে আসার পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে। এ জন্য নিবার্চন কমিশন এবং সরকারের যৌথভাবে কাজ করা উচিত। যাতে নির্ধারিত খরচের বাইরে কোনো প্রার্থী যেতে না পারেন। নিয়মকানুনের মধ্যেও এ ধরনের কোনো ফাঁক ফোকর থাকা উচিত নয়।

তৃণমূলের রাজনীতিকরা জানান, আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নির্বিঘ্নে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার ঘোষণার পর থেকেই এ ধরনের অঘোষিত টাকার ছড়াছড়ি শুরু হয়েছে। ভোটারদের আনুকূল্য লাভ, নেতাকর্মী-ক্যাডার জোগাড়- সবখানেই প্রার্থীরা দু’হাতে টাকা খরচ করছেন। প্রার্থীদের অনেকে সেকেন্ড কিংবা থার্ড মিডিয়ার মাধ্যমে ভোটারদের হাতে নগদ টাকা পাঠাচ্ছেন। কর্মীদের মাধ্যমে ভোটারদের বিকাশ নাম্বার সংগ্রহ করে নগদ টাকা পাঠানোরও বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। যদিও এ নিয়ে এখনো কোনো পক্ষ থেকে সরাসরি কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি বলে নির্বাচন কমিশন দাবি করেছে।