ইপেপার । আজ মঙ্গলবার, ০৫ মার্চ ২০২৪, ২২ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

জাল আছে জলা নেই, ৩০ হাজার জেলে পরিবারে কান্না!

সমীকরণ প্রতিবেদন
  • আপলোড টাইম : ০৩:৩০:৩৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৬ ডিসেম্বর ২০২৩
  • / ৪ বার পড়া হয়েছে

আসিফ কাজল, ঝিনাইদহ:
এক সময় স্লোগান ছিল ‘জাল যার জলা তার’। এখন জেলে সম্প্রদায়ের জাল থাকলেও জলা নেই। জেলার বাওড়গুলো মৎস্যজীবীরা দখল হারিয়েছেন। গত এপ্রিল মাসে ভূমি মন্ত্রাণালয় বাওড়গুলো কেড়ে নিয়ে ইজারা দিয়েছে। ফলে ঝিনাইদহ ও যশোরের ৬টি বাওড় অমৎস্যজীবীদের দখলে চলে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছে জেলে সম্প্রদায়। প্রায় ৩০ হাজার জেলে পরিবার কর্ম হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েছে। অথচ তাদের ভালো থাকার একমাত্র সম্বল ছিল এই বাওড়। এদিকে বাওড়গুলো ইজারা প্রদান করায় কৃত্তিম উপায়ে মাছ উৎপাদনের ফলে জীববৈচিত্র্য ও দেশীয় প্রজাতির মাছ ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে পৌঁছেছে।

মৎস্য বিভাগের একটি সূত্র জানায়, ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলার বলুহর ও জয়দিয়া, মহেশপুর উপজেলার কাঠগড়া ও ফতেপুর, কালীগঞ্জের মর্জাদ এবং চৌগাছা উপজেলার বেড়গোবিন্দপুর বাঁওড় বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ভূমি মন্ত্রাণালয়ে সাথে মৎস্য অধিদপ্তরের চুক্তির মাধ্যমে ১৯৭৯ সাল থেকে মাছ চাষ শুরু হয়। এখানে সুবিধাভোগীরা ছিলেন বাওড় পাড়ের জেলেরা। ১৯৮৬ সাল থেকে বাওড়গুলো রাজস্ব খাতে পরিচালিত হয়ে আসছিল। বাওড় থেকে উৎপাদিত মাছের ৩৫ শতাংশ পেত মৎস্য অধিদপ্তর, ভূমি মন্ত্রাণালয় ২৫ শতাংশ এবং জেলে সম্প্রদায় পেত ৪০ শতাংশ। প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত রানি মাছের একশ ভাগই পেত বাওড় পাড়ের জেলেরা।

২০২৩ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত ভূমি মন্ত্রাণালয় সাথে মৎস্য মন্ত্রাণালয়ে চুক্তির মেয়াদ ছিল। কিন্তু চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ২০২২ সালের নভেম্বর মাসে ভূমি মন্ত্রাণালয় জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে এই ছয়টি বাওড় ইজারা প্রক্রিয়া শুরু করে। এ বছরের এপ্রিলে ইজারাদারদের বাওড় বুঝিয়ে দেয়া হয়। জলমহল ইজারা প্রদানের জন্য বিজ্ঞপ্তিতে নিবন্ধনকৃত ও প্রকৃত মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির আবেদনের কথা বলা হলেও কতিপয় মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির বিরুদ্ধে আর্থিক সুবিধা নিয়ে মৎস্যজীবী নন এমন ব্যক্তিদের বাওড় ইজারা পাইয়ে দেয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ফলে প্রকৃত মৎস্যজীবীরা অধিকার হারিয়ে এখন বিপর্যস্ত। তাদের সংসার চলে খেয়ে না খেয়ে।

জয়দিয়া মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি শীতল কুমার হালদার বলেন, আর সংসার চালাতে পারছি না। বাওড় নেই ফলে আমরা পথে বসছি। তিনি জানান, তার পিতা ৪০ বছরের অধিক সময় ধরে বাওড় থেকে মাছ ধরে সংসার চালিয়ে তাদের বড় করেছেন। তিন বছর আগে পিতা গত হয়েছেন। জেলেরা ছোট বেলা থেকে এই মাছ ধরেই বড় হয়েছেন। মাছ ধরা ছাড়া তাদের আর কোনো অভিজ্ঞতা নেই। পরিবারের ছয়জন নিয়ে তিনি খুব বিপদে আছেন বলে জানান।

বলুহর বাওড় ও মৎস্য সমবায় সমিতির সভাপতি গোপাল হালদার দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানান, বাওড় পাড়ের মৎস্যজীবীরা কর্মক্ষম হয়ে পড়েছি। বাব-দাদার এই পেশা ধ্বংস হতে চলেছে। ফতেপুর মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি শান্তি হালদার জানান, ধারদেনা করে বাওড়টি ইজারা নিয়েছি। মাছ ছেড়েছি, সামনে কপালে কী আছে বলতে পারছি না। জয়দিয়া বাঁওড়ের সাবেক মৎস্যজীবীদের দলপতি নিত্য হালদার বলেন, ৬ বাওড় ফিরে পেতে ভূমি মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। মামলাটি হাইকোর্টে চূড়ান্ত রায়ের অপেক্ষায় আছে। ইজারাদাররা বাওড় পাড়ের জেলেদের মারধর করে জোরপূর্বক মাছ ধরছেন।

বিষয়টি নিয়ে যশোর বিল বাওড় মৎস্য উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) মো. আলফাজ উদ্দীন শেখ বলেন, ‘বাওড়গুলো আমাদের আওতায় ৪২ বছর ছিল। সে সময় বাওড় পাড়ের জেলেদের আর্থসামাজিক মান উন্নয়নে কাজ করে গেছে। বাওড়ে পরিকল্পিতভাবে মাছ চাষ করা হচ্ছিল। বাওড়গুলো এখন ভূমি মন্ত্রণালয় ইজারা দিয়ে দিয়েছে। যার কারণে জেলেরা বেকার হয়েছে, পাশাপাশি বাওড় সংশ্লিষ্ট ১৩০ থেকে ১৪০ জন দৈনিক মজুরিভিত্তিক কর্মীও বেকার হয়ে গেছে।

বলুহর বাওড় ম্যানেজার সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘বাওড়ে মৎস্য অধিদপ্তর কর্তৃক আমরা মাছ চাষ করতাম কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী। একই সাথে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করার জন্য তথা বিলুপ্তপ্রায় মাছ সংরক্ষণ ও প্রজনন বৃদ্ধির জন্য অভয়াশ্রম তৈরি করা হতো। এখন ইজারাদাররা অধিক মুনাফার জন্য কৃত্তিম উপায়ে মাছ চাষ করছেন। যখন তখন মাছ ছাড়ছেন এবং ধরছেন। যে কারণে দেশীয় মাছ ও জীববৈচিত্র্য একেবারে ধ্বংস হতে বসেছে।’

ট্যাগ :

নিউজটি শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন

জাল আছে জলা নেই, ৩০ হাজার জেলে পরিবারে কান্না!

আপলোড টাইম : ০৩:৩০:৩৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৬ ডিসেম্বর ২০২৩

আসিফ কাজল, ঝিনাইদহ:
এক সময় স্লোগান ছিল ‘জাল যার জলা তার’। এখন জেলে সম্প্রদায়ের জাল থাকলেও জলা নেই। জেলার বাওড়গুলো মৎস্যজীবীরা দখল হারিয়েছেন। গত এপ্রিল মাসে ভূমি মন্ত্রাণালয় বাওড়গুলো কেড়ে নিয়ে ইজারা দিয়েছে। ফলে ঝিনাইদহ ও যশোরের ৬টি বাওড় অমৎস্যজীবীদের দখলে চলে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছে জেলে সম্প্রদায়। প্রায় ৩০ হাজার জেলে পরিবার কর্ম হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েছে। অথচ তাদের ভালো থাকার একমাত্র সম্বল ছিল এই বাওড়। এদিকে বাওড়গুলো ইজারা প্রদান করায় কৃত্তিম উপায়ে মাছ উৎপাদনের ফলে জীববৈচিত্র্য ও দেশীয় প্রজাতির মাছ ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে পৌঁছেছে।

মৎস্য বিভাগের একটি সূত্র জানায়, ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলার বলুহর ও জয়দিয়া, মহেশপুর উপজেলার কাঠগড়া ও ফতেপুর, কালীগঞ্জের মর্জাদ এবং চৌগাছা উপজেলার বেড়গোবিন্দপুর বাঁওড় বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ভূমি মন্ত্রাণালয়ে সাথে মৎস্য অধিদপ্তরের চুক্তির মাধ্যমে ১৯৭৯ সাল থেকে মাছ চাষ শুরু হয়। এখানে সুবিধাভোগীরা ছিলেন বাওড় পাড়ের জেলেরা। ১৯৮৬ সাল থেকে বাওড়গুলো রাজস্ব খাতে পরিচালিত হয়ে আসছিল। বাওড় থেকে উৎপাদিত মাছের ৩৫ শতাংশ পেত মৎস্য অধিদপ্তর, ভূমি মন্ত্রাণালয় ২৫ শতাংশ এবং জেলে সম্প্রদায় পেত ৪০ শতাংশ। প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত রানি মাছের একশ ভাগই পেত বাওড় পাড়ের জেলেরা।

২০২৩ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত ভূমি মন্ত্রাণালয় সাথে মৎস্য মন্ত্রাণালয়ে চুক্তির মেয়াদ ছিল। কিন্তু চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ২০২২ সালের নভেম্বর মাসে ভূমি মন্ত্রাণালয় জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে এই ছয়টি বাওড় ইজারা প্রক্রিয়া শুরু করে। এ বছরের এপ্রিলে ইজারাদারদের বাওড় বুঝিয়ে দেয়া হয়। জলমহল ইজারা প্রদানের জন্য বিজ্ঞপ্তিতে নিবন্ধনকৃত ও প্রকৃত মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির আবেদনের কথা বলা হলেও কতিপয় মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির বিরুদ্ধে আর্থিক সুবিধা নিয়ে মৎস্যজীবী নন এমন ব্যক্তিদের বাওড় ইজারা পাইয়ে দেয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ফলে প্রকৃত মৎস্যজীবীরা অধিকার হারিয়ে এখন বিপর্যস্ত। তাদের সংসার চলে খেয়ে না খেয়ে।

জয়দিয়া মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি শীতল কুমার হালদার বলেন, আর সংসার চালাতে পারছি না। বাওড় নেই ফলে আমরা পথে বসছি। তিনি জানান, তার পিতা ৪০ বছরের অধিক সময় ধরে বাওড় থেকে মাছ ধরে সংসার চালিয়ে তাদের বড় করেছেন। তিন বছর আগে পিতা গত হয়েছেন। জেলেরা ছোট বেলা থেকে এই মাছ ধরেই বড় হয়েছেন। মাছ ধরা ছাড়া তাদের আর কোনো অভিজ্ঞতা নেই। পরিবারের ছয়জন নিয়ে তিনি খুব বিপদে আছেন বলে জানান।

বলুহর বাওড় ও মৎস্য সমবায় সমিতির সভাপতি গোপাল হালদার দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানান, বাওড় পাড়ের মৎস্যজীবীরা কর্মক্ষম হয়ে পড়েছি। বাব-দাদার এই পেশা ধ্বংস হতে চলেছে। ফতেপুর মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি শান্তি হালদার জানান, ধারদেনা করে বাওড়টি ইজারা নিয়েছি। মাছ ছেড়েছি, সামনে কপালে কী আছে বলতে পারছি না। জয়দিয়া বাঁওড়ের সাবেক মৎস্যজীবীদের দলপতি নিত্য হালদার বলেন, ৬ বাওড় ফিরে পেতে ভূমি মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। মামলাটি হাইকোর্টে চূড়ান্ত রায়ের অপেক্ষায় আছে। ইজারাদাররা বাওড় পাড়ের জেলেদের মারধর করে জোরপূর্বক মাছ ধরছেন।

বিষয়টি নিয়ে যশোর বিল বাওড় মৎস্য উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) মো. আলফাজ উদ্দীন শেখ বলেন, ‘বাওড়গুলো আমাদের আওতায় ৪২ বছর ছিল। সে সময় বাওড় পাড়ের জেলেদের আর্থসামাজিক মান উন্নয়নে কাজ করে গেছে। বাওড়ে পরিকল্পিতভাবে মাছ চাষ করা হচ্ছিল। বাওড়গুলো এখন ভূমি মন্ত্রণালয় ইজারা দিয়ে দিয়েছে। যার কারণে জেলেরা বেকার হয়েছে, পাশাপাশি বাওড় সংশ্লিষ্ট ১৩০ থেকে ১৪০ জন দৈনিক মজুরিভিত্তিক কর্মীও বেকার হয়ে গেছে।

বলুহর বাওড় ম্যানেজার সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘বাওড়ে মৎস্য অধিদপ্তর কর্তৃক আমরা মাছ চাষ করতাম কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী। একই সাথে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করার জন্য তথা বিলুপ্তপ্রায় মাছ সংরক্ষণ ও প্রজনন বৃদ্ধির জন্য অভয়াশ্রম তৈরি করা হতো। এখন ইজারাদাররা অধিক মুনাফার জন্য কৃত্তিম উপায়ে মাছ চাষ করছেন। যখন তখন মাছ ছাড়ছেন এবং ধরছেন। যে কারণে দেশীয় মাছ ও জীববৈচিত্র্য একেবারে ধ্বংস হতে বসেছে।’