২২ গজের বিশ্বযুদ্ধ শুরু

304

খেলা প্রতিবেদন:
ফুটবল যদি হয় গোলের খেলা তবে ক্রিকেটকে কী বলা যায়? কৌতূহলটা অনেকের মনেই রয়েছে। উত্তরটা সহজ। ক্রিকেটকে বলা যায় বাইশ গজের লড়াই। কেননা, বাইশ গজের পিচে ব্যাটে-বলের লড়াই শেষেই তো হয় ক্রিকেটের জয়-পরাজয়ের ফয়সালা। সে ক্ষেত্রে বিশ্বকাপ ক্রিকেটকে বাইশ গজের বিশ্বযুদ্ধ নামে অ্যাখ্যা দেয়া যায়। এখন পর্যন্ত দুটি বিশ্বযুদ্ধ দেখেছেন মানুষ। একটি ১৯১৪ থেকে ১৯১৯ সালে হওয়া প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কাল ছিল ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত। ‘বিশ্বযুদ্ধ’ শব্দটা শুনলেই সবার মনে ভয় ঢুকে যায়। এর কারণ প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসাত্মক লীলা। কিন্তু ক্রিকেটের বিশ্বযুদ্ধে কোনো হিংসা, বিদ্বেষ, হত্যা কিংবা পারমাণবিক বোমার আগ্রাসন নেই। হ্যাঁ, এই যুদ্ধেও জয়-পরাজয়ের হিসেব আছে, লড়াই হয় শেয়ানে শেয়ানে। তবে দিন শেষে তা ভ্রাতৃত্বই বয়ে নিয়ে আসে, সংঘাত নয়। ক্রিকেটপ্রেমীদের ক্রিকেট উন্মাদনায় মাতাতে দীর্ঘ চার বছরের অপেক্ষার ইতি টেনে আজ থেকে শুরু হচ্ছে বিশ্বকাপ। এটি ওয়ানডে বিশ্বকাপের দ্বাদশ আসর। এবারের আসরে অংশ নিচ্ছে ১০টি দল। এই দলগুলো হলো- বাংলাদেশ, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা, শ্রীলঙ্কা, নিউজিল্যান্ড, আফগানিস্তান, উইন্ডিজ ও ইংল্যান্ড।
এবারের বিশ্বকাপ হচ্ছে ইংল্যান্ড এবং ওয়েলশে। তাই বিশেষ নজর থাকবে পেসারদের দিকে। কেননা, ইংল্যান্ডে খেলা মানেই পেসবান্ধব উইকেটে গতির ঝড়। শক্তিমত্তার বিচারে এবার এককভাবে কোনো একটি নির্দিষ্ট দলকে ফেভারিট বলা যাচ্ছে না। তবে অধিকাংশ ক্রিকেটবোদ্ধার মতে, পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়াই শিরোপার সবচেয়ে বড় দাবিদার। অনেকে আবার স্বাগতিক ইংল্যান্ডকেই ফেভারিট মানছেন। কারণ, ওয়ানডেতে ইংলিশদের সাম্প্রতিক পারফরমেন্স দুর্দান্ত। র‌্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে আছে তারা। বিরাট কোহলির নেতৃত্বাধীন ভারতও শিরোপার অন্যতম দাবিদার। ১৯৯২ সালের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন পাকিস্তান বরাবরই আনপ্রেডিক্টেবল। তাই ফেভারিটের তালিকা থেকে সরফরাজ আহমেদের দলকে বাদ দেয়ার সুযোগ নেই। নিউজিল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকা অতীতের মতো এবারো ফেভারিট হিসেবেই অংশ নিচ্ছে বিশ্বকাপে। কিউইদের অবস্থান এখন র‌্যাঙ্কিংয়ের চার নম্বরে, আর তিনে আছে প্রোটিয়ারা। দুদলেরই লক্ষ্য প্রথমবারের মতো বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়া। ১৯৯৬ সালের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটে এখন বেশ দুঃসময় চলছে। তবে বিশ্বকাপের মতো বড় টুর্নামেন্টে ঠিকই জ্বলে ওঠে দলটি। এবারো যে এমন কিছু হবে না তা বলা মুশকিল। বাজিমাত করতে পারে বাংলাদেশ। এ নিয়ে ষষ্ঠবারের মতো বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছে টাইগাররা। মাশরাফি বিন মুর্তজার নেতৃত্বধীন দলটির সবচেয়ে বড় শক্তি অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের মিশেল। র‌্যাঙ্কিংয়ে এখন সপ্তম স্থানে আছেন স্টিভ রোডসের শিষ্যরা। জয়ের হিসেবে গত দেড় বছরে ইংল্যান্ড ও ভারতের পরেই রয়েছেন তারা। এ সময়ে খেলা ২৭ ম্যাচের ১৭টিতেই জিতেছে মাশরাফির দল। দলে আছেন বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান, যা টাইগারদের বড় শক্তি। রশিদ খানের আফগানিস্তান এবং ক্রিস গেইলের উইন্ডিজকেও হেয় করার কোনো সুযোগ নেই।
এবারের বিশ্বকাপ হবে ১০টি শহরের ১১টি ভেন্যুতে। এগুলো হলো- লন্ডনের কেনিংটন ওভাল, নটিংহ্যামের ট্রেন্ট ব্রিজ, ব্রিস্টলের কাউন্টি গ্রাউন্ড, সাউদাম্পটনের দ্য রোজ বোল, ট্যান্টনের দ্য কপার অ্যাসোসিয়েটস কাউন্টি গ্রাউন্ড, ম্যানচেস্টারের ওল্ড ট্রাফোর্ড, বার্মিংহামের এজবাস্টন, লিডসের হেডিংলে, লন্ডনের লর্ডস, চেস্টার লি স্ট্রিটের রিভারসাইড গ্রাউন্ড এবং কার্ডিফের সোফিয়া গার্ডেন্স। ১৯৭৫ সালে যাত্রা শুরু হয় বিশ্বকাপ ক্রিকেটের। এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ পাঁচবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার রেকর্ডটি অস্ট্রেলিয়ার। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দুবার করে শিরোপা জিতেছে ভারত ও উইন্ডিজ। এ ছাড়া একবার করে শিরোপা জিতেছে শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তান। এ নিয়ে পঞ্চমবারের মতো বিশ্বকাপ আয়োজন করতে যাচ্ছে ইংল্যান্ড। ক্রিকেটপ্রেমীদের জমজমাট একটি বিশ্বকাপ আসর উপহার দেয়ার জন্য প্রস্তুত তারা। সেই সঙ্গে প্রস্তুত ক্রিকেটের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসিও। নিরাপত্তার বিষয়টিকে এবার বিশেষ জোর দেয়া হচ্ছে। দ্বাদশ বিশ্বকাপে যেসব ক্রিকেটার আলো ছড়াতে পারেন তাদের মধ্যে বাংলাদেশের সাকিব আল হাসান ও মোস্তাফিজুর রহমান, ইংল্যান্ডের জস বাটলার ও জেসন রয়, ভারতের জাসপ্রিত বুমরাহ, দক্ষিণ আফ্রিকার কুইন্টন ডি কক, শ্রীলঙ্কার কুশাল মেন্ডিস, উইন্ডিজের শাই হোপ, আফগানিস্তানের রশিদ খান, নিউজিল্যান্ডের মার্টিন গাপটিল, পাকিস্তানের ইমাম উল হক এবং অস্ট্রেলিয়ার গ্লেন ম্যাক্সওয়েলের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
বিশ্বকাপে বাংলাদেশকে মাশরাফি বিন মুর্তজা, ইংল্যান্ডকে ইয়ন মরগান, ভারতকে বিরাট কোহলি, দক্ষিণ আফ্রিকাকে ফাফ ডু প্লেসিস, নিউজিল্যান্ডকে কেন উইলিয়ামসন, অস্ট্রেলিয়াকে অ্যারন ফিঞ্চ, পাকিস্তানকে সরফরাজ আহমেদ, উইন্ডিজকে জেসন রয়, শ্রীলঙ্কাকে দিমুথ করুণারতেœ ও আফগানিস্তানকে গুলবাদিন নাইব নেতৃত্ব দেবেন। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে এক সংবাদ সম্মেলনে ১০ দলের অধিনায়কই বলেছেন যে শিরোপা জেতাটাই লক্ষ্য তাদের। প্রতিটি দল তো শিরোপা জেতার লক্ষ্য নিয়েই টুর্নামেন্টে অংশ নেয়। তবে শেষ পর্যন্ত শিরোপাটা একটি দলের হাতেই ওঠে। সেই দলের নাম জানা যাবে আগামী ১৪ জুলাই। এ দিন লর্ডসে হবে দ্বাদশ বিশ্বকাপের ফাইনাল। লিগপর্ব শেষে পয়েন্ট টেবিলের চারটি দল পাবে সেমির টিকেট। আর সেমির লড়াইয়ে জয়ী হয়ে ফাইনালে যাবে দুটি দল। সেখান থেকে একটি দলের হাতেই উঠবে স্বপ্নের বিশ্বকাপ ট্রফি।