চুয়াডাঙ্গা বুধবার , ১০ জানুয়ারি ২০১৮
আজকের সর্বশেষ সবখবর

১৪ দলে টানাপড়েন : মন্ত্রিসভার রদবদলে শরিকদের অসন্তোষ

সমীকরণ প্রতিবেদন
জানুয়ারি ১০, ২০১৮ ১১:২৯ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

সমীকরণ ডেস্ক: আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটে টানাপড়েন চলছে। মন্ত্রিসভার সাম্প্রতিক রদবদল ও আগামী নির্বাচনের আসন বণ্টন এখনই বিবেচনায় না আসায় অসন্তোষ দেখা দিয়েছে ক্ষমতাসীন জোটের শরিক দলগুলোর মধ্যে। নির্বাচনের বছরে এই টানাপড়েন জোটের ঐক্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলেও মনে করছেন সংশ্নিষ্ট নেতারা। অবশ্য টানা দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতাসীন থেকেও রাজনৈতিক জোট হিসেবে ১৪ দল কখনও দর্শনীয়ভাবে সুসংগঠিত হয়নি। মাঝে মধ্যে বৈঠকই এর মূল কার্যক্রম। আওয়ামী লীগ অনেক বেশি শক্তিশালী হওয়ায় শরিকরা অবমূল্যায়িত হওয়ার অনুযোগ করে সব সময়। তবে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ শরিকদের সঙ্গে রাখতে আগ্রহী। সরকারের মেয়াদের চার বছর চলে যাওয়ার পর গত বুধবার হঠাৎ মন্ত্রিসভার রদবদলে গুরুত্বপূর্ণ দুই শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এবং জাতীয় পার্টির (জেপি) চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর দপ্তর বদলে দেওয়ায় অসন্তোষ আরও বেড়েছে। মুখে না বললেও জাসদের (ইনু) সভাপতি হাসানুল হক ইনুর তথ্য মন্ত্রণালয়ে একজন প্রতিমন্ত্রী নিয়োগের বিষয়টিকেও স্বাভাবিকভাবে নেয়নি জোটের আরেক গুরুত্বপূর্ণ শরিক এ দলটিও।
শরিক দলগুলোর দাবি, এভাবে জোটের গুরুত্বপূর্ণ শরিক দুই দলের শীর্ষ নেতার মন্ত্রণালয় বদল এবং আরেক শরিক দলের শীর্ষনেতার দপ্তরে একজন প্রতিমন্ত্রী নেওয়ায় সরকার ও জোটে তাদের গুরুত্ব অনেকখানি কমে গেছে। শরিকরা মনে করে, সংসদ নির্বাচনের মাত্র একবছর বাকি থাকতে এমন রদবদল তাদের জন্য কিছুটা অসম্মানেরও। ওয়ার্কার্স পার্টি ও জাতীয় পার্টির (জেপি) বেশিরভাগ নেতাকর্মী বিষয়টি স্বাভাবিক হিসেবে নিতে না পেরে হতাশা ব্যক্ত করেন। শরিক দলের কয়েকজন নেতা বলেছেন, যেভাবে রাশেদ খান মেননকে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে সমাজকল্যাণ এবং আনোয়ার হোসেন মঞ্জুকে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে দেওয়া হয়েছে, তা অস্বাভাবিক কিছুর ইঙ্গিত করে। মন্ত্রিসভায় রদবদলের দিন বুধবারই আনোয়ার হোসেন মঞ্জু কিছুটা ক্ষোভের সঙ্গেই বলেছিলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীই বলতে পারবেন কেন ও কিসের জন্য তিনি এই রদবদল এনেছেন। প্রধানমন্ত্রী হর্তাকর্তা বিধাতা, তিনিই সব নির্ধারণ করেন।’ আর বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনসহ পৃথক অনুষ্ঠানে রাশেদ খান মেনন মন্ত্রিসভার রদবদলকে স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া বললেও আওয়ামী লীগকে ইঙ্গিত করে বলেছেন, ‘এ বছর নির্বাচনের বছর। আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগে যদি কোনো দল একলা চলার নীতিতে চলে তা ১৪ দলের জন্য আত্মঘাতী হবে।’ জানতে চাইলে ওয়ার্কার্স পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও পলিট ব্যুরোর সদস্য আনিসুর রহমান মল্লিক বলেন, এই পরিবর্তন বর্তমান মন্ত্রিসভা গঠনের দেড়-দুই বছরের মাথায় হলেও মেনে নেওয়া যেত। কিন্তু নির্বাচন সামনে রেখে নির্বাচনের বছরই যেভাবে রাশেদ খান মেননের দপ্তর বদলে দেওয়া হলো সেটিকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নেওয়া যায় না।
অন্যদিকে গত দুটি নির্বাচনের অভিজ্ঞতা থেকে আসন বণ্টন প্রশ্নে এখনই ফয়সালা চায় শরিক দলগুলো। জোটের পরবর্তী বৈঠকে বিষয়টি তোলার প্রস্তুতি আছে কোনো কোনো দলের। এর আগেও ১৪ দলের একাধিক বৈঠকে শরিক নেতারা এ নিয়ে কথা বলতে চাইলে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ‘নির্বাচন এগিয়ে এলে সবার সঙ্গে বসে আসন বণ্টনের বিষয়টি ঠিক করা হবে’ জানিয়ে তাদের নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।
সূত্রমতে, আসন বণ্টন প্রশ্নের ফয়সালায় ওয়ার্কার্স পার্টি আগামী নির্বাচনে কমপক্ষে ১৫টি আসনে জোটের মনোনয়নের নিশ্চয়তা চাইছে। জাসদ (ইনু), জাতীয় পার্টি (জেপি) ও তরীকত ফেডারেশনও প্রায় সমসংখ্যক আসন চায়। দলীয় সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ূয়ার চট্টগ্রাম-১ আসনসহ কমপক্ষে ৬টি আসন চায় আরেক শরিক সাম্যবাদী দল। শরিক অন্য দলগুলোও মনোনয়ন দেওয়ার বেলায় ‘যথাযথ মূল্যায়ন’ আশা করছে আওয়ামী লীগের কাছে।
শরিক নেতারা বলছেন, দল হিসেবে ছোট-বড় হলেও জোট গঠনের শুরুর থেকেই সব আন্দোলন-সংগ্রামে সমর্থন ও সক্রিয় ভূমিকা রেখে আসছেন তারা। অথচ ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে শরিক দলগুলোকে তাদের কাক্ষিত আসনে ছাড় না দিয়ে অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। ২০১৪ সালের নির্বাচনে ওয়ার্কার্স পার্টি ও জাসদ ছয়টি করে এবং তরীকত ফেডারেশন ও জাতীয় পার্টিকে (জেপি) দুটি করে করে আসন দেওয়া হয়েছিল। পরে ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ (ইনু) ও ন্যাপ একজন করে সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য পায়।
আবার সরকার গঠনের পর প্রথম মেয়াদ তথা ২০০৯-এর সরকারে টেকনোক্র্যাট কোটায় একমাত্র সাম্যবাদী দলের প্রধান দিলীপ বড়ূয়া ছাড়া আর কাউকেই মন্ত্রী করা হয়নি। অবশ্য ওই মেয়াদে জাতীয় পার্টির (জেপি) আনোয়ার হোসেন মঞ্জুকেও মন্ত্রিত্ব দেওয়া হয়েছিল, যার দল তখন পর্যন্ত ১৪ দলে যুক্ত হয়নি। তারা যুক্ত হয় ২০১৪ সালের পর। আর দ্বিতীয় মেয়াদের সরকারে মন্ত্রিসভায় ওয়ার্কার্স পার্টি ও জাসদকে যুক্ত করা হলেও দিলীপ বড়ূয়াকে বাদ দেওয়া হয়েছে। একইভাবে নবম সংসদে একমাত্র সংরক্ষিত নারী আসনে একজন প্রার্থী মনোনয়নের সুযোগ পেলেও দশম সংসদে সেটাও পায়নি জোটের আরেক শরিক গণতন্ত্রী পার্টি। ন্যাপকে গত দুই সংসদেই একটিমাত্র সংরক্ষিত মহিলা এমপি দিয়ে সন্তুষ্ট রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। এর বাইরে দুই নির্বাচনে তরীকত ফেডারেশন ও জাতীয় পার্টিকে (জেপি) কিছুটা সুযোগ দেওয়া হলেও সম্পূর্ণ বঞ্চিত রাখা হয়েছে কমিউনিস্ট কেন্দ্র, গণআজাদী লীগ, গণতান্ত্রিক মজদুর পার্টি, বাসদসহ (রেজাউর) শরিক দলগুলোকে। এসব দল ভগুর অবস্থায় থাকলেও সংসদ ও সরকারে বিন্দুমাত্র অংশ না নিতে পেরে ক্ষুব্ধ হয়ে আছে।
শরিকদের এমন অসন্তোষ অনেকটা প্রকাশ্যে আসে গত ১ জানুয়ারি জাতীয় পার্টির (জেপি) প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে এখনই আসন বণ্টনের বিষয়টি ফয়সালা করে রাখার প্রশ্নে শরিক নেতাদের সোচ্চার হওয়ায়। সেখানে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেছেন, ‘এখন ঠিক না করে শেষ মুহূর্তে আসন ভাগাভাগি করলে এবং যদি বলা হয় যা দেবো তোমরা তা নিয়েই খুশি হও- এটা কিন্তু এবার হবে না। কারণ সামনে কঠিন পরীক্ষা।’
সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ূয়া বলেছিলেন, ‘১৪ দলের শরিকদের মর্যাদার ভিত্তিতে বিবেচনা করতে হবে।’
ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা গত রোববার রাজশাহীতে দলীয় এক জনসভায় স্পষ্টতই বলেছেন, ‘আগামী নির্বাচনে ওয়ার্কার্স পার্টিকে ১৫টি আসন দিতে হবে। ওয়ার্কার্স পার্টি ছাড়া ১৪ দলের ঐক্য মজবুত হতে পারে না।’
২০০৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ১৪ দলের আত্মপ্রকাশের পর একযুগ গেলেও জোটের সাংগঠনিক ও মনস্তাত্ত্বিক সংহতি তেমন গড়ে ওঠেনি। শরিক দলগুলোর মধ্যে সমন্বয়সহ জেলা-উপজেলা-ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত ১৪ দলের কার্যক্রম বিস্তৃত করা ও শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তোলা, জেলা-উপজেলা পর্যায়ের রাজনৈতিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদ-পদবি ও কমিটিতে শরিক নেতাদের অন্তর্ভুক্তিসহ শরিকদের তরফ থেকে প্রস্তাবিত পদক্ষেপগুলো নেওয়া হয়নি। জোট অনেকটা নির্বাচনকেন্দ্রিক সুবিধার মনস্তত্ত্বে শিথিলভাবে চলছে। এ কারণে শরিক দলগুলোর কর্মীদের আগ্রহ কম। নেতাদেরও জোটের বৈঠকে উপস্থিত থাকার উৎসাহ কম। কেবল সংসদ সদস্যরাই সক্রিয়।
১৪ দলের মুখপাত্র ও আওয়ামী লীগ সভাপতিম-লীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম অবশ্য জোটে কোনো টানাপড়েনের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ১৪ দলের ঐক্য অটুট ছিল, আছে এবং থাকবে। মন্ত্রিসভায় রদবদলের বিষয়টি জোটের এই ঐক্যে কোনো প্রভাবই ফেলবে না। আগামী নির্বাচনে আসন বণ্টনের বিষয়টি সময়মতো শরিকদের সঙ্গে বসেই ফয়সালা করা হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।