হুমকি পাল্টা-হুমকির খেলা

267

কিছুদিন পূর্বে উত্তর কোরিয়া চমকিয়ে দিয়েছিল পুরো বিশ্বকে, আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক মিসাইলের সফল পরীক্ষার কথা জানিয়ে। ওই মিসাইল কিনা সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হয়ে স্পর্শ করতে সক্ষম উত্তর আমেরিকা মহাদেশকে! উত্তর কোরিয়ার মিত্র-পরাশক্তি রাশিয়া এইবার জানালে এমন একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের কথা যা কিনা সকলের চোখ ফাঁকি দিয়ে আঘাত হানতে পারবে বিশ্বের যেকোনো স্থানে! আসন্ন নির্বাচন উপলক্ষে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন দেশটির পার্লামেন্টের এক যৌথ অধিবেশনে দেওয়া বক্তৃতার সময় ভিডিওর মাধ্যমে ওই ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রটিসহ আরো কয়েকটি নূতন যুদ্ধাস্ত্র উপস্থাপন করেন। এর মধ্যে রয়েছে একটি মনুষ্যবিহীন ডুবোজাহাজ এবং পরমাণু বোমা বহনে সক্ষম একটি দূরপাল্লার মিসাইল।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও সম্প্রতি তার দেশের নূতন পরমাণু কৌশল প্রকাশ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু অস্ত্রভা-ারকে অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় অধিকতর শক্তিশালী করা এবং অন্যান্য যুদ্ধাস্ত্র বৃদ্ধির উপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। ওয়াশিংটনের নূতন পরমাণু কৌশল প্রকাশের প্রেক্ষিতে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন তার দেশের পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্রের সর্বশেষ কর্মসূচি নিয়ে এই সকল তথ্য প্রকাশ করেছেন বলে মনে করছেন কোনো কোনো বিশ্লেষক। অনেকে মনে করেন যুদ্ধ নয়, ইহা শক্তির ভারসাম্যের প্রদর্শন, যা অনেকটা কাঁটা দিয়ে কাঁটার আঘাত আটকাবার মতো। কেবল একটি কাঁটা অত্যন্ত বিপজ্জনক। ওই কাঁটা প্রতিনিয়ত অন্যের অস্তিত্বের উপর খোঁচাখুঁচি করতে দ্বিধা করে না। কিন্তু দুইটি কাঁটা থাকলে অনেকটাই ভারসাম্য হয়। আমরা দেখেছি, বিশ্বে স্নায়ুযুদ্ধের ছায়া নূতন করিয়া গাঢ় হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে রাষ্ট্রীয় সীমানাগুলি ভেঙ্গে পড়েছে। সেখানে আরব বসন্তের নামে যে ধরনের গণতন্ত্র রপ্তানির উদ্যোগ দেখা গিয়েছে, তা বুমেরাং হয়ে সমগ্র অঞ্চলকে নরক বানিয়েয়ে ফেলেছে। গণতন্ত্র রপ্তানির পূর্বে আমরা দেখেছি সমাজতন্ত্র রপ্তানির কুরুক্ষেত্র। বিংশ শতকে যেই সকল সংকট দক্ষিণ-দক্ষিণপূর্ব-পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য কিংবা ইউরোপ অথবা দক্ষিণ আমেরিকাতে সমাচ্ছন্ন ছিল, তার বিবর্তিত ও বিবর্ধিত রূপ আমরা দেখতে পাচ্ছি একবিংশ শতাব্দীতে এসে। এই সংকট রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং ধর্মীয়। এই সংকটের হাত ধরে আরো বিচিত্র সংকট ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বময়। কথিত সন্ত্রাসনির্মূলে বিশ্বব্যাপী যে ‘সন্ত্রাসবিরোধী’ যুদ্ধ চলছে, তা নাইন-ইলেভেনের পর গত দেড় যুগে নূতন নূতন ক্ষেত্রে, নূতন নূতন অজুহাতে যুদ্ধ, মৃত্যু আর আগ্রাসন বিস্তৃত করেছে। দেখা দিয়াছে শীতল আতঙ্ক, আধিপত্য, অস্ত্র প্রতিযোগিতা আর সীমাহীন মৃত্যুগন্ধময় স্নায়ুযুদ্ধের সমারোহ। যুদ্ধের বিস্তৃতি যত বাড়ছে, সন্ত্রাসবাদ বাড়ছে ততটাই। অন্যদিকে ছড়িয়ে পড়া সন্ত্রাসের সাথে বিশ্বে নিভৃতে ছড়িয়ে পড়েছে এক হিমশীতল ‘ভয়ের সংস্কৃতি’। সেই ভয়ের সংস্কৃতি প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে গ্রাস করছে সমগ্র বিশ্ব।
হুমকির প্রেক্ষিতে পাল্টা-হুমকি কিংবা অস্তিত্ব রক্ষার প্রেক্ষিতে পাল্টা-মাস্তানির গর্জন না থামলে বিশ্বের অশান্তি কী করে প্রশমিত হবে? কাঁটা-প্রতিকাঁটার কাটাকাটিতে অকালে ঝরে যাচ্ছে নিরীহ মানুষের প্রাণ। ‘সবার উপরে মানুষ সত্য এই কথাটিকে মিথ্যা প্রমাণেরই যত আয়োজন দেখা যাচ্ছে বিশ্বজুড়ে।