চুয়াডাঙ্গা বৃহস্পতিবার , ২৯ জুলাই ২০২১
আজকের সর্বশেষ সবখবর

হাসপাতালে অনিয়ম চলবে না, সবকিছুর হিসাব দিতে হবে

সমীকরণ প্রতিবেদন
জুলাই ২৯, ২০২১ ১০:১৯ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির মতবিনিময় সভায় এমপি ছেলুন জোয়ার্দ্দার
অতিরিক্ত ফি নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত
নিজস্ব প্রতিবেদক:
দীর্ঘ এক বছর চার মাস পর চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল বুধবার বেলা ১১টায় সদর হাসপাতালের সম্মেলনকক্ষে এই মতবিনিময় সভার আয়োজন করেন চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন কাম সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক এবং সদর হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যসচিব ডা. এ এস এম মারুফ হাসান। মতবিনিময় সভায় সভাপতিত্ব করেন চুয়াডাঙ্গা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার ছেলুন।
আলোচনা সভায় হাসপাতালের সার্বিক ব্যবস্থাপনা, করোনা মহামারি মোকাবিলা, জনবল সংকট ও হাসপাতালের নমুনা সংগ্রহ ও ল্যাবে নমুনা পরীক্ষা করে অতিরিক্ত ফি নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে আলোচনা করা হয়। এসময় চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. এ এস এম ফাতেহ্ আকরাম নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা ল্যাবে নমুনা পরীক্ষা করে অতিরিক্ত ফি নেওয়ার তদন্তে একটি কমিটি গঠনের জন্য বলেন।
মতবিনিময় সভায় সভাপতির বক্তব্যে এমপি ছেলুন জোয়ার্দ্দার বলেন, ‘করোনা মহামারি সময়ে স্বাস্থ্য বিভাগের জরুরি সভায় বসেছি। সদর হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা প্রতি মাসে একবার হওয়ার কথা থাকলেও তা হচ্ছে না। হাসপাতাল ভালোভাবে চললে তা এ জেলার যেমন সুনাম, ঠিক তেমনি এ জেলার চিকিৎসকদেরও সুনাম। হাসপাতালে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হলে সেখানে হাসপাতালের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা করে একটি সমাধান বের করা যায়। এখন থেকে নিয়ম অনুযায়ী প্রতি মাসেই মতবিনিময় সভা করতে হবে। প্রতি মাসে সম্ভব না হলে প্রতি দুই মাসে অন্তত একটি সভা অবশ্যই করতেই হবে।’
এমপি ছেলুন জোয়ার্দ্দার আরও বলেন, ‘হাসপাতালে বিভিন্ন অনিয়ম দেখা যাচ্ছে। চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে কোনো অনিয়ম চলবে না। করোনা পরীক্ষার জন্য সরকারের নির্ধারিত ফি’র থেকে অতিরিক্ত যে ফি নেওয়া হয়েছে, তার হিসাব দিতে হবে।’ এসময় তিনি বর্তমান আরএমও’কে ধন্যবাদও জানান দিন-রাত এক করে হাসপাতালের রোগীদের সেবা দেওয়ার জন্য।
সভায় উপস্থিত জেলা প্রশাসক নজরুল ইসলাম সরকার বীর মুক্তিযোদ্ধা ছেলুন জোয়ার্দ্দার এমপিকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘এমপি মহোদয় এই মতবিনিময় সভাটির উদ্যোগ নিয়েছেন। সদর হাসপাতাল বাস্তবায়ন কমিটির মতবিমিয় সভা নিয়মিত অনুষ্ঠিত হলে হাসপাতালের সার্বিক সমস্যা নিয়ে আলোচনা করে একটি ব্যবস্থা নেওয়া যায়। চুয়াডাঙ্গা পৌর মেয়রকে এই কমিটির আহ্বায়ক করা হলো। আশা করছি, এখন থেকে নিয়মিত মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হবে।’
তিনি আরও বলেন, হাসপাতালে করোনা ইউনিটের করোনা পরীক্ষা ও নমুনা সংগ্রহ ল্যাবে করোনা পরীক্ষা ও নমুনা সংগ্রহের জন্য নির্ধারিত ফি’র থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার যে অভিযোগ রয়েছে, তা তদন্ত করা হবে।
জেলা প্রশাসক বলেন, করোনা পরীক্ষা ও নমুনা সংগ্রহের জন্য নির্ধারিত ফি এবং অতিরিক্ত যে ফি নেওয়া হয়েছে, তার মোট কত টাকা জমা হয়েছে, কত টাকা খরচ হয়েছে, কোথায় খরচ হয়েছে, সব হিসাব মেলানো হবে। এই করোনা মহামারি সময়ে বিভিন্ন সংগঠন বা ব্যক্তি উদ্যোগ থেকে হাসপাতালে যেসব সহযোগিতা এসেছে, সিভিল সার্জনকে তার সবকিছুর রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। সিভিল সার্জনকে কমিটির সকলের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা বাড়াতে হবে। এই মহামারি মোকাবিলায় অনেকেই হাসপাতালে সহযোগিতা করতে চায়, সকলের সঙ্গে হৃদ্যতা সৃষ্টি হলে যেকোনো সমস্যা সহজে মোকাবিলা করা সম্ভব হবে। হাসপাতালে রোগীর থেকে স্বজনের সংখ্যা বেশি, তাঁরা করোনা আক্রান্ত রোগীর সঙ্গে থেকে সাধারণ মানুষের মধ্যে চলাচল করছে। এটি হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা ত্রুটির দিকে নির্দেশ করে। নিয়মিত হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হলে আলোচনার মাধ্যমে তারও একটি সমাধান এতদিনে হয়তো বেরিয়ে আসতো।
সভায় জেলা পুলিশ সুপার জাহিদুল ইসলাম জাহিদ বলেন, ‘দেশপ্রেম থেকে এমপি ছেলুন জোয়ার্দ্দার হাসপাতালের সংকট মোকাবিলায় এই মতবিনিময় সভার আয়োজন করেছেন। কিন্তু সিভিল সার্জন, আরএমও তা ভাবেননি। এই করোনা মহামারি সময়ে চিকিৎসকেরা প্রধান সম্মুখসারীর যোদ্ধা। তাঁদের দেশপ্রেমে আমরা করোনা মোকাবিলা করতে পারছি। হাসপাতালের টাকা-পয়সা নিয়ে আমি কথা বলব না। তবে হাসপাতালের লোকবলের সমস্যা সমাধানে যারা স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করছেন, বা করতে চায়, তাঁদেররে এমপি, ডিসি এবং সিভিল সার্জন স্বাক্ষরিত সার্টিফিকেট প্রদান করা যেতে পারে। এতে যারা কাজ করছেন, তাঁরা আগ্রহ পাবে এবং আরও অনেকেই স্বেচ্ছায় কাজ করতেও আগ্রহ পাবে।’
সভায় চুয়াডাঙ্গা জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রিয়াজুল ইসলাম জোয়ার্দ্দার টোটন বলেন, ‘করোনা মহামারি সময়ে হাসপাতালে যখন যা প্রয়োজন হচ্ছে, আমরা সাধ্যমতো তা মেটানোর চেষ্টা করছি। এমন সময়ে সাধারণ মানুষের টাকা পকেটে ভরার মতো অভিযোগ গ্রহণযোগ্য নয়। সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া যাবে না। কোন টাকা কোথায় গেল, সবকিছুর হিসাব দিতে হবে। সরকারের ফি’র কথা বলে সাধারণ মানুষের টাকা নিলে তার রশিদ দিতে হবে। কিন্তু যেহেতু দেওয়া হয়নি, এই সকল নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার টাকা সরকারের রাজস্বে, না কোথায় গেছে, তার হিসেব দিতে হবে।’
সভায় আরও উপস্থিত থেকে হাসপাতালের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মতবিনিময় করেন চুয়াডাঙ্গা পৌর মেয়র জাহাঙ্গীর আলম মালিক খোকন, চুয়াডাঙ্গা সদর মডেল হাসপাতাল বাস্তবায়ন কমিটির সেক্রেটারি দেলোয়ার হোসেন দুলু, চুয়াডাঙ্গা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক রাজীব হাসান কচি, চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের সিনিয়র কনসালটেন্ট (সার্জারি) ওয়ালিউর রহমান নয়ন, সিনিয়র কনসালটেন্ট (গাইনি) আকলিমা খাতুন, ইম্প্যাক্ট হাসপাতালের পরিচালক ডা. জিপু, জাতীয় মহিলা সংস্থা চুয়াডাঙ্গার চেয়ারম্যান নাবিলা রুকসানা ছন্দাসহ ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যবৃন্দ।
চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির মতবিনিময় সভায় সবশেষে করোনা পরীক্ষা ও নমুনা সংগ্রহের জন্য নির্ধারিত ফি বাবদ অতিরিক্ত যে টাকা নেওয়া হয়েছে, তার তদন্তে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। এতে চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হাবিবুর রহমান, চুয়াডাঙ্গা জেলা আওয়ামী লীগ থেকে যুগ্ম সম্পাদক রিয়াজুল ইসলাম জোয়ার্দ্দার টোটন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের একজন, সাংবাদিকদের মধ্য থেকে চুয়াডাঙ্গা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক রাজীব হাসান কচি ও পুলিশের মধ্য থেকে একজনসহ মোট পাঁচ সদস্যের এই কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়।
এদিকে, ‘করোনার নমুনা পরীক্ষার ফি নিয়ে ধন্দ! দীর্ঘদিন পর চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা আজ’ শীর্ষক একটি সংবাদ প্রকাশিত হয় দৈনিক সময়ের সমীকরণ পত্রিকায়। ওই প্রতিবেদনে অনেকেই অভিযোগ করেন, সরকারি ফি’র নামে সাধারণ মানুষের নিকট থেকে করোনা পরীক্ষার জন্য চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের কোভিড নমুনা সংগ্রহ ও অ্যান্টিজেন টেস্ট ল্যাবে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হচ্ছে। এবং সেই টাকা সরকারি রাজস্ব খাতে জমা না করে বেতনের উছিলা দেখিয়ে নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। গতকালের সদর হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় এই বিষয়টি নিয়ে তুলকালাম কাণ্ড সৃষ্টি হয়। অভিযোগের বিষয়ে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা করেন সভায় উপস্থিত সকলে।

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।