‘হামার কিসের নারী দিবস, কাজ করলি খাতি পায়’

120

এ আর ডাবলু:
৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি নানা কর্মসূচির মধ্যদিয়ে পালিত হয়েছে। কিন্তু নারী দিবস কী এবং কেন পালন করা হয়, এসবের কিছুই জানেন না গ্রামের শ্রমজীবী নারীরা। এমনই কয়েকজন নারীর সাথে দেখা হয়। কথা হয় কলোনি, শিবা, আরতি, সুন্দরী, গীতা, সরস্বতি ও ভারোতির সাথে। তাঁদের বাড়ি জীবননগর উপজেলার মনোহরপুর গ্রামের আদিবাসী পল্লীতে। মাছ ধরে, ইটভাটা, মৌসুমে কৃষি জমিতে ফসল কুড়িয়ে ও কৃষি ক্ষেত্রে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। কিন্তু বর্তমানে তেমন কোনো কাজ না থাকায় মাঠে কৃষি জমিতে কাজ করে সংসার চালাচ্ছেন।
তাঁরা বলেন, ‘হামার কিসের নারী দিবস। কর্ম করলি খাতি পায়, না করলি ভাত কপালে জোটে না। আজকেই প্রথম শুনলাম কিসের বলে নারী দিবস। ভগমানের ৩০ দিন কাম করি খাই। কাম নাই তো ছেলেপিলে খেতিও পারবেক নাই। এখন তো কোনো কাম নাই। কয়দিন থেকে বসি থাকি, আজ কামে আইছি। কাম করি যে কয়টা টেকা জোগার করছুনু, তাও শেষ। মাঠে ভুট্টা খেতে কাজ বচছে এবং ভুট্টাও কুড়াতি পাচ্ছি। এতে যে কয় টেকা হয়, তা দিয়ে চাল-ডাল আনি খাই। দুনিয়াত বলে কতো কি হয়, হামাগের ভাগ্যে কিছুই হয় না।’
শুধুমাত্র মনোহরপুরের আদিবাসী নয়, তাঁদের মতো অনেকে নারী দিবস পালনের বিষয়টি না জানলেও প্রতিদিনই কর্ম করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। কর্ম তাঁদের নিত্যদিনের সঙ্গী। উপজেলার মনোহরপুর আদিবাসী পল্লী, মনোহরপুর আবাসন, পেয়ারাতলায়, সুবলপুর, শিয়ালমারী ও দেহাটি গ্রামের সব নারীর একই কথা, পুরুষের পাশাপাশি নারীদেরও সমানতালে কাজ করতে হবে। তবেই স্বামী-সন্তান নিয়ে একটু শান্তিতে হলেও দিন যাবে। তাই পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও মাঠে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেন। তবে এতো পরিশ্রম করেও তাঁরা মজুরি বৈষম্যের শিকার। এখনও দিনমজুরিতে পুরুষের অর্ধেক পারিশ্রমিক পান তাঁরা।
গতকাল সোমবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার মনোহরপুর ইউনিয়নের কাবলেরচর মাঠে নারী দিবসের দিনেও মাঠে কাজ করার পাশাপাশি ফসল কুড়িয়ে বাড়ি ফিরছেন নারী শ্রমিকরা। এছাড়াও উপজেলার উথলী, শিয়ালমারী ও সুবলপুরে নারী দিবসেও শুধু হাত দিয়েই একেকজন এক থেকে দেড় কেজি মাছ শিকার করেছেন। সব দেশীয় প্রজাতির কৈ, পুঁটি, শিং চেং, টেংরাসহ নানা প্রজাতির দেশীয় মাছ নারীরা দল বেঁধে মাছ শিকার করছেন। তাঁদের প্রত্যেকের শিকার করা মাছের বাজার মূল্য প্রায় চার থেকে ছয় শ টাকা। বাজারে দেশী প্রজাতির মাছের প্রচুর চাহিদা থাকায় কম সময়ের মধ্যে মাছ বিক্রি হয়ে যায়। অনেক ক্রেতা দেশী মাছ ক্রয়ে বিল, গাঙ, ডোবা ও নদীর পাড়ে অপেক্ষায় থাকেন নারীদের শিকার করা মাছ কম দামে পাওয়ায় আশায়। নারীরা কষ্ট করে মাছ শিকার করলেও তাঁরা হাট-বাজারে বিক্রি করেন না। মাছ শিকারের সময় বা বাড়িতে গ্রাহক পেলেই তাঁদের কাছে বিক্রি করে দেন। তাও আবার কী পরিমাণ টাকা দিবে, সেটাও ক্রেতার ওপর দায়িত্ব দেওয়া হয়।
অধিকাংশ সময় ক্রেতারা পছন্দমতো টাকা দিয়ে নারীদের নিকট থেকে মাছ ক্রয় করতে পারেন। এখন মাঠে কাজ না থাকায় অনেক নারী মাছ, কুচে ধরে জীবিকা নির্বাহ করে। অনেকে আবার স্বামী-সন্তান নিয়ে একবেলা ভালো খাবারের আশায় মাছ ধরছেন। শিকারী আয়শা বেগম বলেন, ‘জমিতে কাজ করে যে কয় টাকা পাই, তা দিয়া তেমন কিছুই হয় না। খালি চাল, লবণ, তেল, ঝাল, পেঁয়াজ ও তরকারি কিনতি টাকা শেষ হয়ে যায়। এর বেশি কপালে জোটে না। কয়দিন থাকি কাম নাই। এজন্য মাছ ধরবার আসছি। পুরুষেরা জাল দিয়ে মাছ ধরে আর আমরা হাত দিয়া ধরি। এক কেজির মতো মাছ পাইছি। বিক্রি করবার নই। স্বামী-সন্তান নিয়া দুই দিন ভালোই খাওয়া যাবে। কিন্তু এখন আর মাছ ধরবার জায়গা নাই। সব দখল হয়ে গেছে। এখন আর কেউ মাছ ধরতি দেয় না। ছোট ছোট কিছু জায়গা আছে, ওখান থেকেই হামারা মাছ ধরতি পারি।’