স্বর্ণালি মুকুল বলছে, আম আসছে

249

চুয়াডাঙ্গা জেলায় প্রায় ১৮শ’ হাজার হেক্টর জমিতে আমের আবাদ
মেহেরাব্বিন সানভী/ইকরামুল হক:
সোনালি হলুদ রঙের আমের মুকুলের মনকাড়া ঘ্রাণ। মৌমাছির দল ঘুরে বেড়াচ্ছে গুনগুন শব্দে। ছোট পাখিরাও স্বর্ণালি মুকুলে বসছে মনের আনন্দে। আগেভাগেই এমন দৃশ্যের দেখা মিলছে চুয়াডাঙ্গার আমবাগানগুলোতে। শীতের প্রকোপ এবার কিছুটা কম থাকায় চুয়াডাঙ্গার বাগানগুলোতে বেশ আগেভাগেই এসেছে আমের মুকুল। আগাম মুকুলে আগাম ফলনের সাথে ভাল দাম পাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন এ জেলার আমবাগান মালিকেরা। আর গাছে মুকুল দেখে বাগানের দরদাম হাঁকতে শুরু করেছেন বেপারিরা। কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবার গত বছরের চেয়ে আমের উৎপাদন বেশি হবে বলে আসা করা যায়।
বিভিন্ন এলাকার কয়েকটি বাগান ঘুরে দেখা গেছে, গাছে গাছে নানা ফুলের সঙ্গে আমের মুকুলের মিষ্টি ঘ্রাণ আকাশে বাতাসে মৌ মৌ গন্ধে মাতোয়ারা করে তুলছে। থোকায় থোকায় হলুদ রঙের মুকুল আসতে শুরু করেছে গাছগুলোতে। বাগান মালিক ও ব্যবসায়ীরা ভাল ফলনের স্বপ্ন দেখছেন এবার। গাছে মুকুল ও গুটি আম দেখে ইতোমধ্যে বেপারিরা বাগানের দরদাম হাঁকছেন। আর বাগানের মালিকেরা আমের ভালো ফলন পেতে ছত্রাক নাশক প্রয়োগসহ বাগান পরিচর্যায় ব্যস্ততার সময় পার করছেন।
চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, গত বছর চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলায় ৭২৫ হেক্টর জমিতে ৮ হাজার ৭শ’ ৬০ মেট্রিক টন, আলমডাঙ্গায় ২৮০ হেক্টর জমিতে ৪ হাজার ৩শ’ ২০ মে. টন, জীবননগরে ৩৯০ হেক্টর জমিতে ৫ হাজার মে. টন ও দামুড়হুদায় ২৯৭ হেক্টর জমিতে ৪ হাজার ৮শ’ ৭৫ মে. টনসহ চুয়াডাঙ্গা জেলাতে মোট ১৬শ’ ৯২ হেক্টর জমিতে ২২ হাজার ৯শ’ ৫৫ মে. টন আম উৎপাদন হয়েছিলো। এ বছর চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলায় ৭৩০ হেক্টর, আলমডাঙ্গায় ৩২০ হেক্টর, জীবননগরে ৪০০ হেক্টর ও দামুড়হুদায় ৩২৫ হেক্টরসহ মোট ১ হাজার ৭শ’ ৭৫ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। গত বছরের তুলনায় এবারে ৮৩ হেক্টর জমিতে আবাদ বেশি হয়েছে। এবারের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ২৩ হাজার মে. টন। চুয়াডাঙ্গার আবওয়া পরিস্থিতি অনুকূলে থাকা ও আম লাভজনক হওয়ায় প্রতিবছরই আমের আবাদ বাড়ছে। এ জেলাতে প্রধান প্রধান আমের আবাদ হচ্ছে, আ¤্রপালি, লেংড়া, ফজলি, হাড়িভাঙা, মল্লিকা, থাই, গোপালভোগ, বারি ১০, দেশি, বেনারসি সিতাভোগ। এর মধ্যে সিংহভাগই আ¤্রপালি।
চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার নতিপোতা ইউনিয়নের হোগলডাঙ্গা গ্রামের আম চাষি আনিছুজ্জামান বলেন, এবছর আমার আম গাছে প্রচুর পরিমাণে মুকুল আসতে শুরু করেছে। এখন পর্যন্ত আমের মুকুলে কোনো রোগ-বালাই আক্রমণ করেনি। আবহাওয়াও ভালো। যদি কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না আসে আশা করছি প্রতিটি আমগাছেই পর্যাপ্ত পরিমাণে আম ধরবে।
সদরের গাড়াবাড়িয়া গ্রামের আম বাগানের মালিক আলমগীর হান্নান বলেন, বাগানের অধিকাংশ গাছই এরইমধ্যে মুকুলে ছেয়ে গেছে। এবার কুয়াশা কম থাকায় মুকুল ভালোভাবে প্রস্ফুটিত হয়েছে। গত বছর সাড়ে ১৫ বিঘা জমিতে আমের বাগান ছিলো। যা বিক্রি করেছিলাম ৭ লাখ টাকায়। এবছর ২০ বিঘা আমের বাগান আছে। এলাকাতে ফসলি চাষের জমি রেখে অনেকেই আম বাগান করেছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক নাঈম আস সাকীব বলেন, চুয়াডাঙ্গাতে আমের উৎপাদন ভালো হয়। এবছর একটু আগেভাগেই আম গাছে মুকুল আসছে। তাছাড়া এখন পর্যন্ত কোনো প্রাকৃতিক কোনো দুর্যোগ দেখা দেয়নি। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবার আমগাছে খুব একটা কীটনাশক প্রয়োগের প্রয়োজন হবে না। তবে ছত্রাকজনিত রোগে আমের মুকুল ও গুটি আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই বাগানে দুই দফা ছত্রাকনাশক স্প্রে করতে হবে। তিনি আরও বলেন, আম চাষে সহজেই লাভবান হওয়া যায়। যার কারণে অনেকই এ পেশায় এগিয়ে আসছেন। বর্তমানে জেলাতে আবাদি জমিতে আমের চাষ (বাগান) করা হচ্ছে। আমের ভাল ফলন পেতে আমরা কৃষকদের বিভিন্ন সময়ে পরামর্শ দিচ্ছি। এ জন্য মাঠ পর্যায়ে আমাদের অফিসাররা কাজ করছেন। আশাকরা যায় গত বছরের থেকে এ বছর আমের উৎপাদন বেশি হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবার আম গাছে খুব একটা কীটনাশক প্রয়োগের প্রয়োজন হবে না। তবে ছত্রাকজনিত রোগে আমের মুকুল ও গুটি আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই বাগানে দু’দফা ছত্রাকনাশক স্প্রে করতে হবে। এতে ছত্রাক জাতীয় রোগ থেকে আমের মুকুলগুলো রক্ষা পাবে। সেই সাথে আমের বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলবে। বাগান মালিক মনি ও বকুল জানান, সপ্তাহ খানেক আগে তাদের বাগানে লাগানো আম গাছে মুকুল আসা শুরু হয়েছে। বেশিরভাগ গাছ মুকুলে ছেয়ে গেছে। কিছু গাছে গাছে মুকুল বের হচ্ছে। তারা জানান, মুকুল আসার পর থেকেই তারা গাছের প্রাথমিক পরিচর্যা শুরু করেছেন। মুকুল রোগ বালাইয়ের আক্রমন থেকে রক্ষা করতে স্থানীয় কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ওষুধ স্প্রে করছেন তারা।
কৃতজ্ঞতা: প্রতিবেদন প্রস্তুতে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন- নিজস্ব প্রতিবেদক ফেরদৌস ওয়াহিদ, জীবননগরের সহকারি অফিস প্রধান মিঠুন মাহমুদ ও তিতুদহ প্রতিনিধি আকিমুল ইসলাম।