চুয়াডাঙ্গা মঙ্গলবার , ১০ মে ২০২২
আজকের সর্বশেষ সবখবর

স্ত্রী ও দুই মেয়ে হত্যা ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির; সামাজিক অস্থিরতার প্রতিচ্ছবি

সমীকরণ প্রতিবেদনঃ
মে ১০, ২০২২ ৮:৪৩ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

আমাদের সমাজ যে অস্থির সময়ের ঘূর্ণাবর্তে খাবি খাচ্ছে তাতে কারো দ্বিমত করার কারণ আছে বলে মনে হয় না। রাষ্ট্র বা সমাজ যে সামগ্রিকভাবে ভালো নেই তার লক্ষণ নানাভাবে পরিস্ফুট। প্রায়ই নিষ্ঠুর সব ঘটনার অবতারণাই এর প্রমাণ। এসব ঘটনা দেখে মানুষ বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে পড়ছে। সংবাদমাধ্যমে খবর ছাপা হওয়ায় দেশব্যাপী সাময়িক আলোড়ন উঠছে। ঘটনার অভিঘাতে আমরা স্তম্ভিত হয়ে পড়ছি। এমনই ঘটনার সর্বশেষ সংযোজন ঘুমন্ত স্ত্রী ও দুই মেয়েকে গলা কেটে হত্যার খবর। নয়া দিগন্তসহ গণমাধ্যমের খবর থেকে জানা যায়, গত রোববার ভোরে এই নৃশংস ঘটনা ঘটেছে মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার বালিয়াখোড়া ইউনিয়নের আঙ্গারপাড়া গ্রামে। হত্যাকারী একজন দন্ত চিকিৎসক। পুলিশের কাছে তিনি স্ত্রী ও দুই মেয়েকে হত্যার কথা স্বীকার করেছেন।
পুলিশের কাছে দেয়া জবানবন্দীতে তিনি জানান, ২০০০ সালে ভালোবেসে বিয়ে করেন তিনি। বিয়ের পর সংসার ভালোই চলছিল; কিন্তু ১৫ বছর ধরে বাবার বাড়ি থেকে বিতাড়িত হয়ে একই গ্রামে শ্বশুরবাড়িতে স্ত্রী ও দুই মেয়ে নিয়ে বসবাস করছিলেন। এর মধ্যে নানা সময় বিভিন্ন ধরনের ব্যবসায় করতে গিয়ে লোকসান গুনতে হয় তাকে। শেষে দন্ত চিকিৎসার ওপর কোর্স করে একটি দোকান দেন; কিন্তু ধারদেনায় জর্জরিত থাকায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ছিলেন। বিভিন্ন জনের কাছে তার ঋণ ছিল সব মিলিয়ে ১০ লাখ টাকার উপরে। ঋণের টাকা পরিশোধের চাপ সামলাতে না পেরে স্ত্রী ও দুই মেয়েকে হত্যার চরম সিদ্ধান্ত নেন তিনি। পরিকল্পনা অনুযায়ী, স্ত্রী ও দুই মেয়েকে হত্যার পর নিজে আত্মহত্যার চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হন। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে শোয়া অবস্থায় এলাকার লোকজন ধরে তাকে পুলিশে সোপর্দ করে। পুলিশ প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানতে পেরেছে, খুনি মূলত ধারদেনায় জর্জরিত থাকায় হতাশায় ভুগছিলেন। হতাশা থেকেই এমন নির্মম ও নির্দয় হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত।
উদ্বেগের বিষয় হলো, ধারদেনায় জর্জরিত একজন মানুষের মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলার তথ্য। সংবাদমাধ্যমের খবর থেকে আমরা অনেকেই জানি, করোনা মহামারীর সময় থেকে অর্থনৈতিক দুর্দশায় দেশে বেশ কিছু আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। আর দেশী-বিদেশী সংস্থার পরিসংখ্যান বলছে, মহামারীর প্রভাবে দেশে বেশির ভাগ মানুষের আয় কমেছে। একই সাথে দরিদ্র মানুষের সংখ্যাও করোনার অভিঘাতে অনেক বেড়ে গেছে। প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ এখন দরিদ্র হয়ে পড়েছে। এদের সংসার চালানোই দায়। এর ওপর গত তিন মাস ধরে প্রায় সব নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। ফলে আমজনতা যে দুর্বিষহ জীবন যাপন করছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। অথচ সরকারের তরফ থেকে দাবি করা হয়, দেশে উন্নয়নের জোয়ার বইছে। হ্যাঁ, এ কথা সত্যি, দেশে কিছু বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে। কিছু বাস্তবায়নের শেষপর্যায়ে। এ ছাড়া অবকাঠামো নির্মাণ হয়েছে প্রচুর। আরো হচ্ছে। কিন্তু তা সাধারণ মানুষের জীবনমানে কতটুকু ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে সে প্রশ্ন থেকেই যায়।
মূলত দেশে তীব্র আয়বৈষম্য বিদ্যমান, যা দিন দিন আরো প্রকট হচ্ছে। দেশের মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ সরকারি আনুকূল্যে আঙুল ফুলে কলাগাছ বনে যাচ্ছে। বাদবাকি জনগোষ্ঠী যে তিমিরে ছিল; সেখানেই রয়ে গেছে। বলা চলে, দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর অবস্থার শোচনীয় অবনতি হয়েছে। মানিকগঞ্জের ঘিওরের এই মর্মান্তিক ঘটনা এই করুণ পরিস্থিতিরই পরিণতি বলা যেতে পারে।
আমরা মনে করি, দেশে আয়বৈষম্য কমিয়ে সবার পরিবার-পরিজন নিয়ে বেঁচে থাকার পরিবেশ নিশ্চিত করাই টেকসই উন্নয়নের মূলমন্ত্র। সেটি করা না গেলে সামাজিক অস্থিরতা আরো বাড়বে বৈ কমবে না। তখন অসহায়ভাবে সবাইকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মানিকগঞ্জের ঘিওরের মতো হৃদয়বিদারক ঘটনা দেখার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। এই দায় রাষ্ট্র ও সরকারের। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে শাসকশ্রেণীর জবাবদিহির যে নমুনা তাতে সামাজিক স্থিতিশীলতা আশা করা সুদূরপরাহত।

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।