সুদের হার বাড়ায় বিশ্ব বাণিজ্যে চ্যালেঞ্জের মুখে বাংলাদেশ

294

সমীকরণ ডেস্ক: নগদ অর্থের সংকটে আমানত সংগ্রহে মরিয়া হয়ে উঠেছে ব্যাংকগুলো। ধারাবাহিক বাড়ছে আমানতের সুদের হার, পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ঋণের সুদও। গত দুই মাসে ২ থেকে ৩ শতাংশ সুদ বাড়িয়েছে অনেক ব্যাংক। ফলে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একদিকে ব্যাংকের তারল্য সংকট চলছে, ঋণের চাহিদাও বেড়েছে। অন্যদিকে ব্যাংকগুলোর ঋণ-আমানতের অনুপাত (এডিআর) হার বাড়িয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নগদ অর্থ সংকট মেটাতে বাড়তি সুদ দিয়ে আমানত সংগ্রহ করছে ব্যাংকগুলো। ফলে হু হু করে বাড়ছে ঋণের সুদহার। বর্তমানে ব্যবসা পরিচালনার খরচ অনেক বেশি। এমন অবস্থায় দুই অংকের সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করা কঠিন, বলছেন উদ্যোক্তারা। সুদহারের এমন ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বিশ্ব বাণিজ্যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ, বলছেন দুশ্চিন্তায় থাকা ব্যবসায়ীরা।
এদিকে ব্যাংকের ঋণ বিতরণের ক্ষমতা কমিয়ে সম্প্রতি প্রচলিত ধারার ব্যাংকের একশ’ টাকা আমানতের বিপরীতে সাড়ে ৮৩ টাকা এবং ইসলামী ব্যাংকগুলোতে ৮৯ টাকা করা হয়েছে। গত নভেম্বর পর্যন্ত বেসরকারি ব্যাংকে ঋণ আমানত অনুপাত (এডিআর) দাঁড়িয়েছে ৮৪ দশমিক ৩৭ শতাংশ। আর ইসলামী ব্যাংকগুলোতে ৮৯ দশমিক ২৩ শতাংশ। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে বাড়তি ঋণ নির্ধারিত মাত্রায় নামিয়ে আনার নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংকগুলো এখন আমানত বাড়িয়ে এডিআর সমন্বয়ের চেষ্টা করছে। আমানত বাড়াতে মরিয়া হয়ে উঠেছে কিছু ব্যাংকও। এডিআর নিয়ন্ত্রণে রাখতে অধিকাংশ ব্যাংক নতুন ঋণ অনুমোদন অনেক কমিয়ে দিয়েছে। অনেক ব্যাংক ভোক্তাসহ কিছু খাতে ঋণ বিতরণ আপাতত বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইএবি) সভাপতি আব্দুস সালাম মুর্শেদী বলেন, এখন ব্যবসা করা কঠিন। গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্য বেড়েছে। ঋণের সুদহারও ঊর্ধ্বমুখী। কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস বা ব্যবসার ব্যয় বেড়েছে। এছাড়া গত কয়েক মাসে ২ থেকে ৩ শতাংশ সুদ বেড়েছে। এখন ১০ শতাংশের ওপরে সুদে ঋণ নিয়ে এখন ব্যবসা করতে হচ্ছে। ফলে বিশ্ব বাজারে টিকে থাকাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে দুই অংকের সুদে ঋণ কখনোই ব্যবসাবান্ধব নয় বলেও জানান তিনি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ৫৭টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মধ্যে ১৭টি ব্যাংক ১০ শতাংশের ওপরে সুদে ঋণ নিচ্ছে। এ তালিকায় নতুন প্রজন্মের সবকটি ব্যাংক রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র দেবাশিস চক্রবর্তী এ প্রসঙ্গে বলেন, আমানতের পাশাপাশি ঋণের সুদহার বাড়ছে- এটা খুব একটা ভালো খবর নয়। সুদহার কত হবে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঠিক করে দেয় না। ব্যাংকগুলো তাদের ইচ্ছা মতো সুদহার নির্ধারণ করতে পারে। তবে আমানত ও ঋণের সুদহারের ব্যবধানের (স্প্রেড) বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা রয়েছে। এটি পরিপালনে ব্যাংকগুলোকে বলা হচ্ছে। কয়েকটি ব্যাংকের স্প্রেড বেশি রয়েছে, তাদের কমানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি মাস শেষে ব্যাংকিং খাতে গড় আমানতের সুদহার দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ। যা আগের মাস ডিসেম্বরের চেয়ে দশমকি ১০ শতাংশ বেশি। ডিসেম্বরে আমানতের সুদহার ছিল ৪ দশমিক ৯১ শতাংশ। অন্যদিকে জানুয়ারিতে ঋণের সুদহার দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ যা আগের মাস ডিসেম্বরে ছিল ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে ঋণের সুদহার বেড়েছে দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ।
ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ব্যাংকগুলোতে আমানত কমেছে। বেসরকারি ব্যাংক থেকে সরকারও আমানত তুলে নিচ্ছে। ফলে বেশি সুদ দিয়ে ব্যাংকগুলো আমানত সংগ্রহ করছে। এ অবস্থায় ব্যবসায় টিকে থাকতে ব্যাংকগুলোর ঋণের সুদহার বাড়ানো ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই বলেও জানান তিনি।