চুয়াডাঙ্গা রবিবার , ২০ নভেম্বর ২০২২
আজকের সর্বশেষ সবখবর

সাড়ে চার মাসে রিজার্ভ কমেছে ৭.৫২ বিলিয়ন ডলার

সমীকরণ প্রতিবেদনঃ
নভেম্বর ২০, ২০২২ ৪:৩৩ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

সমীকরণ প্রতিবেদন:
গত সাড়ে চার মাসে (১ জুলাই থেকে ১৬ নভেম্বর) দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ বা রিজার্ভ কমেছে ৭ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার। গত ৩০ জুন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ যেখানে ছিল ৪১.৮৩ বিলিয়ন ডলার, গত ১৭ নভেম্বর তা কমে নেমেছে ৩৪.৩০ বিলিয়ন ডলারে। যদিও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসেবে ৮ বিলিয়ন ডলার বাদ দিলে কমে আসবে ২৬ বিলিয়ন ডলারে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এ সময়ে পণ্য আমদানি ও সেবা ব্যয় ব্যাপকভাবে বাড়ে। সাথে থাকে বিদেশী ঋণ পরিশোধের চাপ। বিপরীতে রেমিট্যান্স ও রফতানি আয় ওই হারে বাড়েনি। বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা ও জোগানের মধ্যে ভারসাম্যহীনতার কারণেই রিজার্ভ থেকে সঙ্কটে পড়া ব্যাংকগুলোর কাছে ডলার বিক্রি করতে হয়। আর এ কারণে বৈদেশিক মুদ্রার মজুদের ওপর চাপ বেড়ে যায়। বাংলাদেশ ব্যাংক আলোচ্য সময়ে সঙ্কটে পড়া ব্যাংকগুলোর কাছে বিক্রি করেছে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে গত এক মাসে (১৭ অক্টোবর থেকে ১৭ নভেম্বর) বিক্রি করা হয়েছে ১.৮৮ বিলিয়ন ডলার। তবে শুধু বিশেষ প্রয়োজনীয় পণ্য যেমন- জ্বালানি তেল, ভোগ্যপণ্য, সার, বীজ আমদানিতে সরকারি ব্যাংকগুলোকে সঙ্কট মেটাতে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করা হচ্ছে। অন্য বেসরকারি ব্যাংকের চাহিদা মেটাতে গেলে রিজার্ভ আরো কমে যেত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে আমদানি ব্যয় কমাতে নানা পদক্ষেপ নিয়েছিল। পণ্য আমদানিকে নিরুৎসাহিত করতে এলসি মার্জিন শতভাগ করা হয়। বলা হয়, পণ্য আমদানি করতে হলে শতভাগ অগ্রিম অর্থ পরিশোধ করতে হবে আমদানিকারকদের। সাথে বিলাসী পণ্য আমদানির জন্য আমদানি ঋণপত্র স্থাপন বা এলসি খোলার ক্ষেত্রেও ব্যাংকগুলোকে নিরুৎসাহিত করা হয়। একই সাথে ব্যাংক যেন বেশি অঙ্কের পণ্য আমদানির জন্য এলসি খুলতে না পারে সে জন্য প্রথমে ৫০ লাখ ডলার, পরে তা আরো কমিয়ে ৩০ লাখ ডলার পর্যন্ত এলসির ক্ষেত্রে তদারকি করা হয়। এই পরিমাণ পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে অবহিত করতে হয়। সবমিলেই পণ্য আমদানির জন্য এলসি খোলার হার কমে আসে। কিন্তু আগে পণ্য আমদানি করা হয়েছে, কিন্তু আমদানি ব্যয় পরিশোধ করা হয়নি, এমন বকেয়া দায় পরিশোধ বেড়ে যায়। সবমিলেই ডলারের ওপর চাপ বেড়ে যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, গত জুলাইতে পণ্য আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছিল যেখানে সাড়ে ২২ শতাংশ, সেখানে একই মাসে আমদানি দায় নিষ্পত্তি বেড়েছিল ৬৪.১০ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি এলসি খোলার হার কমলেও বকেয়া দায় পরিশোধ করতে গিয়ে এলসি নিষ্পত্তি বেড়ে যায়। অর্থাৎ এলসি খোলা হয়েছিল ৬.৩৯ বিলিয়ন ডলারের, আর এলসি নিষ্পত্তি হয়েছিল ৭.৪২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের। পরের মাসে অর্থাৎ আগস্টে এলসি খোলা হয়েছিল ৬.৬২ বিলিয়ন ডলারের, সেখানে নিষ্পত্তি হয়েছিল ৭.৪০ বিলিয়ন ডলারের। আগের মাসের তুলনায় এলসি খোলার হার মূল্যের অঙ্কে বাড়লেও আগের অর্থবছরে আগস্টে ৭ বিলিয়ন ডলারের পণ্য এলসি খোলার কারণে শতকরা হিসেবে এলসি খোলার প্রবৃদ্ধি হয় ঋণাত্মক ১০.৫৫ শতাংশ। কিন্তু পণ্য আমদানি নিষ্পত্তি বাড়ে ২৯.০৫ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, সেপ্টেম্বরেও মূল্যের দিক দিয়ে এলসি খোলার হার হয়েছিল ৬.৫১ বিলিয়ন ডলার, সেখানে ৬.৭২ বিলিয়ন ডলার। এলসি খোলার হার আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ঋণাত্মক ২১.৩২ শতাংশ হলেও এলসি নিষ্পত্তি বাড়ে ১০.১৪ শতাংশ। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে কঠোর তদারকি ও ব্যাংকগুলোর ডলার সঙ্কটের কারণে ব্যবসায়ীদের এলসি খোলার পরিমাণ ব্যাপক হারে কমে যায়। যেমন- অক্টোবরে এলসি খোলার হার কমে ৩৮.৩৩ শতাংশ, সেখানে আমদানি নিষ্পত্তি হয় সাড়ে ৫ শতাংশ। মূল্যের দিক দিয়ে অক্টোবরে পণ্য আমদানির জন্য এলসি খোলা হয় ৪.৭৪ বিলিয়ন ডলারের, সেখানে নিষ্পত্তি হয়েছে ৬.৪২ বিলিয়ন ডলারের।
এ দিকে অব্যাহতভাবে কমে যায় রেমিট্যান্স প্রবাহ। গত অক্টোবরে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমেছে ৭.৩৭ শতাংশ। গত বছরের অক্টোবরে যেখানে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ১৬৪ কোটি ৮৭ লাখ ডলার, সেখানে গত মাসে তা কমে নেমেছে ১৫২ কোটি ৫৪ লাখ ডলারে। এ রেমিট্যান্স গত ৮ মাসের মধ্যে সবচেয়ে কম। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, গত ফেব্রুয়ারিতে ১৪৯ কোটি ৪৪ লাখ (১.৪৯ বিলিয়ন) ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা। এর পর আট মাস পর সর্বনিম্ন রেমিট্যান্স এলো অক্টোবরে। গত জুলাইতে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এসেছিল ২০৯ কোটি মার্কিন ডলার। এর পরের মাস থেকে কমতে শুরু করে। গত আগস্টে এসেছিল ২০৩ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার। সেপ্টেম্বরে এক ধাক্কায় কমে ১৬৪ কোটি ডলারে নেমে যায়। আর অক্টোবরে তা আরো কমে নামল ১৫২ কোটি ডলারে।
এ দিকে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাওয়ার পাশাপাশি রফতানি আয়ও কমতে থাকে। গত অক্টোবরে রফতানি আয়ের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ঋণাত্মক ৭.৮৫ শতাংশ। এর ফলে ৪ মাসে (জুলাই-অক্টোবর) রফতানি আয়ের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭ শতাংশ, সেখানে আগের বছরের আলোচ্য সময়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল প্রায় সাড়ে ২২ শতাংশের ওপরে।
এক দিকে রেমিট্যান্স প্রবাহ ও রফতানি আয় কমে যায়, অপর দিকে রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়ে। এর ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সঙ্কটে পড়া সব ব্যাংকের কাছে রেমিট্যান্স প্রবাহ বন্ধ করে শুধু সরকারি বিশেষ পণ্য যেমন জ্বালানি তেল, সার, ভোগ্যপণ্য ও বীজ আমদানিতে সরকারি ব্যাংকগুলোকে রিজার্ভ থেকে ডলার সরবরাহ করা হয়। এর পরেও গত সাড়ে চার মাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ১৭ অক্টোবর থেকে ১৭ নভেম্বর পর্যন্ত ডলার বিক্রি করা হয় ১.৮৮ বিলিয়ন ডলার। আর এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমতে থাকে। গত ৩০ জুন শেষে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ যেখানে ছিল ৪১.৮৩ বিলিয়ন ডলার, সেখানে ১৭ নভেম্বর শেষে কমে এসেছে ৩৪.৩০ বিলিয়ন ডলার। ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, যেভাবে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করা হচ্ছে এটা অব্যাহত থাকলে রিজার্ভের ওপর চাপ আরো বেড়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।