সারাদেশে ভয়াবহ করোনার বিস্তার

52

সারা দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় এবছরে সর্বোচ্চ ৩৯ মৃত্যু : চুয়াডাঙ্গায় নতুন পাঁচজন আক্রান্ত
সমীকরণ প্রতিবেদক:
দেশে দ্রুতগতিতে বাড়ছে করোনার বিস্তার। চলতি মাসের শুরু থেকে দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বাড়তে থাকলেও গত কয়েকদিন ধরে বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে। নতুন সংক্রমিতদের বেশিরভাগই তরুণ। যাদের অনেকেই আইসিইউতে চিকিৎসাধীন। নতুন শনাক্ত রোগীরা শ্বাসকষ্টসহ নানাবিধ জটিল সমস্যায় পড়ছেন। অধিকাংশেরই প্রয়োজন পড়ছে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (আইসিইউ) বেড, কেবিন এবং হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। হঠাৎ করে রোগী এবং করোনার ভয়াবহতা বাড়ায় চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে হাসপাতালগুলো বিপাকে পড়েছে। ধারণ ক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত রোগী ভর্তি করতে হচ্ছে। এমনকি সরকারি হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডেও ভর্তি ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত রোগী। গত দুই সপ্তাহ ধরে দেশে জ্যামিতিক হারে বাড়ছে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা। সারা দেশে প্রতিদিনই বাড়ছে এই চাপ।
এদিকে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) এ মাসের মাঝামাঝিতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাজ্যে পাওয়া করোনাভাইরাসের নতুন স্ট্রেইন বাংলাদেশের অন্তত ১০ জন রোগীর মাঝে শনাক্ত হয়েছে। আর এই উচ্চ সংক্রামক যুক্তরাজ্যের নতুন স্ট্রেইনটি এখন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়লে বিপদ আরো বাড়বে, যা আগেই বলেছেন বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু, এরপরও যথাযথ সতর্কতা নেই। অনেক বিশেষজ্ঞ আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, হঠাৎ করে ভাইরাসের সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার বেড়ে যাওয়ার পেছনের কারণগুলোর মধ্যে একটি হতে পারে যুক্তরাজ্যের নতুন স্ট্রেইন। ব্রিটিশ বিজ্ঞানীদের মতে, আগের রূপের চেয়ে যুক্তরাজ্যের নতুন স্ট্রেইনটি ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি মারাত্মক। উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ। হাসপাতালে ভর্তির ঝুঁকি আরো বাড়িয়েছে। পাশাপাশি অন্যান্য স্ট্রেইনের তুলনায় এই স্ট্রেইনটি ৩৫ থেকে ৪৫ শতাংশ বেশি দ্রুত সংক্রমিত করছে। এছাড়া গত কয়েকমাস করোনাভাইরাসের সংক্রমণের হার কিছুটা কমতে থাকায় মানুষ যথাযথভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলেনি। সবাই বেশ গা-ছাড়াভাবে দেখেছেন ভাইরাসটিকে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের কর্মকর্তাদের মতে, এসব কারণেই নতুন করে আবার সংক্রমণের হার বাড়ছে।
স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন আরও ৩৯ জন। গত প্রায় সাড়ে তিন মাসের মধ্যে এটিই এক দিনে সর্বোচ্চ মৃত্যু। এর আগে গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর এক দিনে ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছিল। এখন পর্যন্ত দেশে করোনায় মারা গেছেন আট হাজার ৮৬৯ জন। একই সময়ে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত আরো তিন হাজার ৬৭৪ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে। এই সময়ে রেকর্ড ২৪৭২৬ নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয়েছে ২৪৬৬৪ জনের। পরীক্ষা বিবেচনায় শনাক্তের হার ১৪ দশমিক ৯০ শতাংশ। টানা পাঁচ দিন ধরে দৈনিক সাড়ে তিন হাজারের বেশি রোগী শনাক্ত হচ্ছে। এর মধ্যে গত ২৩ মার্চ তিন হাজার ৫৫৪ জনের, ২৪ মার্চ তিন হাজার ৫৬৭ জনের, ২৫ মার্চ তিন হাজার ৫৮৭ জনের ও ২৬ মার্চ তিন হাজার ৭৩৭ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছিল। এখন পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন পাঁচ লাখ ৯১ হাজার ৮০৬ জন। গত ১৪-২০ মার্চ তুলনায় ২১-২৭ মার্চ সপ্তাহে নুমনা সংগ্রহ বৃদ্ধি পেয়েছে ২৭ দশমিক ৯৪ শতাংশ, শনাক্ত বৃদ্ধি পেয়েছে ৮৫ দশমিক ২৪ শতাংশ এবং মৃত্যু বৃদ্ধি পেয়েছে ৪২ দশমিক ৫৫ শতাংশ।
যুক্তরাজ্যে পাওয়া করোনাভাইরাসের নতুন স্ট্রেইন বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ছে কি-না এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের গবেষণাকারী প্রতিষ্ঠান আইইডিসিআর’র পরিচালক প্রফেসর ডা. তাহমিনা শিরিন ইনকিলাবকে বলেন, কিছুটাতো ছড়িয়েছেই। এছাড়া স্বাস্থ্যবিধি কেউ মানছে না বরং মানুষ করোনা নিয়ে খামখেয়ালি আচরণ করছে। যা সংক্রমণ বাড়াতে কাজ করছে। সংক্রমণ কমাতে হলে স্বাস্থ্যবিধি মানতে জোরালো পদক্ষেপ- জমায়েত বন্ধ করা, মাস্ক পরতে বাধ্য করার ব্যবস্থা নিতে হবে। বিশ্বের অন্যান্য দেশেও তাই করা হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন ডা. তাহমিনা।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ডা. মোহাম্মদ সায়েদুর রহমান বলেন, আমাদের এখানে জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের সংখ্যা খুবই অপ্রতুল। কারণ এটা খুবই ব্যয়বহুল। দেশে যুক্তরাজ্যের নতুন স্ট্রেইন কী পরিমাণে ছড়িয়েছে তা জানার জন্য আরো বেশি জিনোম সিকোয়েন্সিং করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য সংক্রান্ত নীতিমালা মেনে চলার অনীহা এবং ‘টিকা নিলে আর করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা নেই’ বলে যে প্রচলিত ভুল ধারণা, তার কারণেও ভাইরাসের সংক্রমণ বাড়ছে। প্রফেসর সায়েদুর রহমান বলেন, দেখতে পাচ্ছি, সংক্রমণের হার, হাসপাতালে রোগী ভর্তির সংখ্যা ও মৃত্যুর হার বেড়ে যাচ্ছে। আমাদের অবশ্যই জিনোম সিকোয়েন্সিং ও অ্যান্টিবডি পরীক্ষার সংখ্যা বাড়াতে হবে। তাহলেই কেবল আমরা বুঝতে পারব টিকা কতটা ভালো কাজ করছে।
আচমকা কেন এতটা বাড়ছে সংক্রমণ এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাস্ক, গ্লাভস কিংবা স্যানিটাইজার ব্যবহারের মতো নিয়মগুলি বর্তমানে অনেকটাই ব্র্যাত্য হয়েছে দেশে। আর সে কারণেই আরো দ্রুত ছড়াচ্ছে করোনাভাইরাস।
বর্তমানে যে হারে সংক্রমণ বাড়ছে তা চলমান থাকলে কি মৃত্যু আরো বাড়তে পারে? ঠিক এই মুহূর্তে আমাদের করণীয় কী? এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাবেক পরিচালক (রোগনিয়ন্ত্রণ) প্রফেসর ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, বর্তমানে করোনার সংক্রমণ যেভাবে বাড়ছে, এভাবে বাড়তে থাকলে করোনায় মৃত্যুও বাড়ার সম্ভাবনা আছে। তিনি বলেন, ইউকে ভ্যারিয়েন্টটা আমাদের দেশে এসেছে। বাংলাদেশে যেভাবে ফ্লাইট চলাচল করছে, যে কোনো দেশ থেকে যে কেউই আসতে পারছে, তাদের কোয়ারেন্টিনও যথাযথভাবে নিশ্চিত করা হচ্ছে না। যে কারণে অন্যান্য ভ্যারিয়েন্টগুলোও আমাদের এখানে আসার তীব্র সম্ভাবনা আছে। ইউকে ভ্যারিয়েন্টে তরুণরা বেশি আক্রান্ত হয়, এটার সংক্রমণ ও মৃত্যুর হারও উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। আমাদের যারা শনাক্ত হচ্ছেন, তাদের মধ্যে কতজন ইউকে ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্ত হচ্ছেন সেটা কিন্তু আমরা জানি না। কিন্তু, অবশ্যই কিছুসংখ্যক হলেও তো ইউকে ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্ত হচ্ছেন, যারা হাসপাতালে ভর্তি আছেন, যারা আইসিইউতে আছেন। গত কয়েকদিনের চিত্র দেখলে বোঝা যায়, সংক্রমণ কী পরিমাণে বাড়ছে। তাদের মধ্যেই তো অনেকের অবস্থা গুরুতর। কাজেই প্রতিদিনই যদি এটা বাড়ে, তাহলে সামনের দিনগুলোতে মৃত্যু স্বাভাবিকভাবেই বাড়বে।
চলমান পরিস্থিতিতে করণীয় নিয়ে এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, প্রথমেই সরকারকে ঘোষণা দিতে হবে, বাংলাদেশে এখন পরিস্থিতিটা মারাত্মক। ‘স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করা উচিত। দ্বিতীয়ত, এটা ঘোষণা দেয়ার পরপরই সরকারের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কিছু উদ্যোগ নিতে হবে। যাতে মানুষের কাছে প্রতীয়মান হয়, পরিস্থিতি গুরুতর, সরকার এতে গুরুত্ব দিচ্ছে ও সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা নিচ্ছে। সরকারের উচিত এখনই একটি জাতীয় বিশেষজ্ঞ কমিটির সঙ্গে বসে আপদকালীন পরিকল্পনা তৈরি করা। সেই পরিকল্পনায় নির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকতে হবে। যেমন- আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে সংক্রমণ কমিয়ে আনা; হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা কমিয়ে আনা; হাসপাতালে যারা ভর্তি হবে তাদের সিভিয়ারিটি কমিয়ে আনা ও মৃত্যু কমিয়ে আনা। এখন এই লক্ষ্যগুলো অর্জনে কিছু উদ্যোগ নিতে হবে। এর সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজনে সংক্রামক আইনও ব্যবহার করতে হবে। যাতে সরকারের উদ্যোগ দ্রুত কার্যকর করা যায়।
এখন যারা আক্রান্ত হচ্ছেন, তাদের মধ্যে কতজন যুক্তরাজ্যের স্ট্রেইনে আক্রান্ত হচ্ছেন, তা শনাক্ত করা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন প্রফেসর বে-নজির আহমেদ। এই কাজটা আমাদের অবশ্যই করা দরকার। যখন সমস্যা হয়, তখন সঙ্গে সঙ্গে যথাযথ ব্যবস্থা নিলে কিন্তু সমস্যাটা আর বাড়ে না। যুক্তরাজ্যে পরিস্থিতি একসময় খারাপ ছিল। এখন তারা রিকভার করছে। এখন তাদেরকে ইউরোপের মডেল বলা হচ্ছে। আমরা কেন তাদের অনুসরণ করছি না? আগামী চার থেকে পাঁচ মাসের মধ্যে অবশ্যই ইউরোপে সংক্রমণ ও মৃত্যু কমে আসবে, তারা হার্ড ইমিউনিটি অর্জন করবে। আমাদের এখানে থ্রি-জিন কিট দিয়ে আরটি-পিসিআর পরীক্ষা করলে কতজন যুক্তরাজ্যের স্ট্রেইনে আক্রান্ত হচ্ছেন, তা বোঝা যাবে। আরো আগে থেকেই থ্রি-জিন আরটি-পিসিআর পরীক্ষা চালু করা দরকার ছিল। এখন যত দ্রুত সম্ভব সেটা চালু করা দরকার।
চুয়াডাঙ্গা:
চুয়াডাঙ্গায় নতুন করে আরও ৫ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে। এ নিয়ে জেলায় মোট করোনা শনাক্তের সংখ্যা দাড়িয়েছে ১ হাজার ৬৯৫ জনে। গতকাল শনিবার রাত আটটায় জেলা সিভিল সার্জন অফিস এ তথ্য নিশ্চিত করে। গতকাল জেলায় নতুন কেউ সুস্থ হয়ছি। এখন পয়ন্ত জেলায় মোট সুস্থ হয়েছে ১ হাজার ৬২১ জন। জানা যায়, গত শুক্রবার জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ করোনা আক্রান্ত সন্দেহে কোন নমুনা সংগ্রহ করেনি তবে গতকাল পূর্বের ১৮টি পেন্ডিং নমুনাসহ সিভিল সার্জন অফিস ১৯টি নমুনার ফলাফল প্রকাশ করে। গতকাল প্রাপ্ত ১৯টি নমুনার মধ্যে ৫ জনের নমুনায় করোনা শনাক্ত হয়েছে বাকী ১৪টি নমুনার ফলাফল নেগিটিভ আসে। নতুন শনাক্ত ৫ জনের মধ্যে সদর উপজেলার ২জন, আলমডাঙ্গার ১জন, দামুড়হুদার ১জন ও জীবননগরের ১ জন রয়েছে। গতকাল জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ করোনা পরীক্ষার জন্য সদর উপজেলা থেকে ২৩টি নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য প্রেরণ করেছে।
চুয়াডাঙ্গা সিভিল সার্জন অফিসের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী জেলা থেকে এ পর্যন্ত মোট নমুনা সংগ্রহ ৮ হাজার ৪৬০টি, প্রাপ্ত ফলাফল ৮ হাজার ২৩৮টি, পজিটিভ ১ হাজার ৬৯৫টি, নেগেটিভ ৬ হাজার ৯৫টি। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত চুয়াডাঙ্গা জেলায় ২১ জন করোনা আক্রান্ত রোগী চিকিৎসাধীন অবস্থায় ছিল। আক্রান্তদের মধ্যে ১৫জন হোম আইসোলেশন ও অন্য ৬জন প্রাতিষ্ঠানিক আইসোলেশনে আছেন। এছাড়া উন্নত চিকিৎসার জন্য চুয়াডাঙ্গার বাইরে রয়েছেন ১ জন ও চুয়াডাঙ্গার বাইরে অবস্থানরত অবস্থায় করোনা আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালের করোনা ইউনিটে চিকিৎসাধীন রয়েছে অপর একজন। চুয়াডাঙ্গায় করোনা আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত মোট মৃত্যু হয়েছে ৫১ জনের। এর মধ্যে ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে জেলার বাইরে।