সরকারী চাকরিতে ৫৫ ভাগ কোটা : কৌশলে মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে কথা বলা হচ্ছে

451

ঢুকেছে অপরাজনীতি : কোটা পদ্ধতি নিয়ে আন্দোলন
সমীকরণ ডেস্ক: সরকারী চাকরিতে কোটার পরিমাণ শতকরা ৫৫ ভাগেরও বেশি। ফলে অসন্তোষ বাড়ছে কোটা পদ্ধতিকে ঘিরেই। বিসিএস থেকে শুরু করে প্রতিটি সরকারী চাকরিতে ‘বিশাল কোটার ফাঁদে’ পড়ে অনেক মেধাবীর বাদ পড়ার প্রেক্ষাপটে এ পদ্ধতিকে ঘিরে এখন নানা প্রশ্ন সামনে আসছে। চাকরিতে কোটার পরিমাণ অর্ধেকেরও বেশি থাকায় এবার কোটা সংস্কারের দাবি উঠেছে। মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের ব্যানারে শুরু হয়েছে কোটা কমানোর বিপক্ষে আন্দোলন। এ অবস্থায় কোটা ব্যবস্থা সমন্বয়ের সুপারিশ করেছেন দেশের বিশিষ্টজন। ‘রাষ্ট্র পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে বঞ্চিত করতে পারে না’ এমন মন্তব্য করে বিশেষজ্ঞরা কোটার পরিমাণ কমানোসহ কোটা সমন্বয়ের সুপারিশ করেছেন।
গত কয়েকদিন ধরেই সরকারী চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন হচ্ছে। আন্দোলনকারীরা কোটা ৫৫ ভাগ থেকে কমিয়ে ১০ ভাগ করার মতো দাবিও তুলেছেন। মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের ব্যানারে আরেক গ্রুপ একই সঙ্গে তাদের কোটা কমানোর বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কোটা সংস্কারের দাবিতে বিক্ষোভ এবং অবস্থান কর্মসূচী পালন করেছেন শিক্ষার্থী এবং চাকরিপ্রার্থীরা। কর্মসূচী পালন করতে গিয়ে কোটা সংস্কার ও সংস্কার বিরোধীদের মধ্যে ঢাকায় সংঘর্ষও হয়েছে। কর্মসূচীর অংশ হিসেবে ঢাকাসহ সারাদেশের জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে কোটা সংস্কারের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দেয়া হয়েছে। তাতে সরকারী চাকরিতে কোটা কমিয়ে সর্বোচ্চ ১০ ভাগ রাখার দাবি করা হয়েছে। তবে এ আন্দোলন থেকে একটি বিশেষ গ্রুপের পক্ষ থেকে কেবল ‘মুক্তিযোদ্ধা কোটা’কে টার্গেট করে বক্তব্য দেয়া ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী একটি বিশেষ শ্রেণী আন্দোলনে সক্রিয় হয়ে ওঠার অভিযোগও উঠেছে। মুুক্তিযোদ্ধার সন্তানসহ প্রগতিশীল অনেকেই সময়ের প্রয়োজনে কোটার পরিমাণ কমানোর পক্ষে থাকলেও আন্দোলনে বিশেষ গোষ্ঠীর উদ্দেশ্য সম্পর্কে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
দেশে সরকারী চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা মূলত একটি প্রচলিত পদ্ধতিই। অনগ্রসর শ্রেণীকে এই সুবিধা দিয়ে সমাজে সমতা বিধানের লক্ষ্যে এই কোটার প্রবর্তন করা হয় স্বাধীনতার পরপরই। এরপর কাটার পরিমাণ বিভিন্ন সময় কমানো ও বাড়ানো হয়েছে। তবে ’৭৫ এ জাতির জনকের হত্যার পর থেকে দীর্ঘ সময় সরকারী চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা নিয়ে হয়েছে ষড়যন্ত্র। এ কোটা নিয়ে হয়েছে নানা অপকর্ম। বঞ্চিত হয়েছে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা। তবে এই মুহূর্তে দেশে কোটা সংস্কারের দাবির প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে বিশাল কোটার পরিমাণকে ঘিরেই।
জানা গেছে, এই মুহূর্তে সরকারী চাকরিতে মোট কোটার পরিমাণ শতকরা ৫৫ ভাগেরও বেশি। অর্থাৎ চাকরির অর্ধেকেরও বেশি কোটার দখলে। অথচ মেধার দখলে অর্ধেকেরও কম, শতকরা ৪৫ ভাগ।
সরকারী চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা ৩০, জেলা ১০, নারী ১০ এবং বাদিবাসী কোটা ৫ শতাংশ। ১০ শতাংশ জেলা কোটা থাকায় বেশি জনসংখ্যার জেলাগুলোর মানুষ বেশি চাকরি পাচ্ছেন, যা এক ধরনের বৈষম্য তৈরি করছে বলে মনে করা হয়। এই ৫৫ শতাংশ কোটায় পূরণযোগ্য প্রার্থী পাওয়া না গেলে মেধাবীদের থেকে সেই পদ পূরণেও আছে নানা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। এই ৫৫ শতাংশ কোটায় পূরণযোগ্য প্রার্থী পাওয়া না গেলে সেক্ষেত্রে এক শতাংশ পদে প্রতিবন্ধী নিয়োগের বিধান রয়েছে। ফলে এর কোন শ্রেণীতে যারা পড়েন না, তাদের প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে বাকি ৪৫ শতাংশের জন্য। দেশে যখন ১৭ জেলা ছিল তখন চালু হয় ‘জেলা কোটা’। পরে ১৭ জেলা ভেঙ্গে ৬৪টি করা হলেও সেই কোটাই রয়ে গেছে।
এদিকে গত অন্তত চারটি বিসিএস ছাড়াও নন-ক্যাডার নিয়োগের বিভিন্ন পরীক্ষায় দেখা গেছে কোটার আসনের পরিমাণে র্প্রার্থীই পাওয়া যায়নি। মুক্তিযোদ্ধা ও আদিবাসী কোটার ক্ষেত্রে এখন প্রতিটি নিয়োগ পরীক্ষাতেই এখন প্রয়োজনীয় সংখ্যক প্রার্থীই পাওয়া যায় না। এ অবস্থা বিবেচনা করেও কোটা বাদ না দিয়ে কমানোর দাবি করেছেন বিশেষজ্ঞরা। অন্যথায় প্রার্থী পাওয়া না গেলে সাধারণ প্রার্থীদের নিয়ে সকল আসন পূরণ করার ব্যবস্থা রাখারও দাবি তোলা হয়েছে।
কোটা সংস্কারের দাবিতে যারা আন্দোলন করছেন তাদের আহ্বায়ক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শাহেদুল আনোয়ার বলছিলেন, আমাদের দাবি কোটা বাতিল নয়, সংস্কারের দাবিতে আমরা আন্দোলন করছি। কোটা আমাদের সংবিধানেই আছে। তবে কোটা যেখানে বৈষম্য দূর করার জন্য করা হয়েছে সেখানে এখন কোটা ব্যবস্থাই বৈষম্যের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে কোটা বহাল রাখার পক্ষে অবস্থানকারী মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ডের সাধারণ সম্পাদক সেলিম রেজা বলেন, ‘আমরাও কোটা ব্যবস্থার সংস্কার চাই। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা এবং তাদের সন্তানদের কোটা বাতিলের দাবির বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান।
জানা গেছে, সরকারী চাকরিতে বিদ্যামান কোটা পদ্ধতির সরলীকরণে কয়েকবার সুপারিশ করেছে সরকারী কর্মকমিশন (পিএসসি)। টানা কয়েক বছর বার্ষিক প্রতিবেদনে পিএসসি বিদ্যমান কোটা পদ্ধতি সরলীকরণের সুপারিশ করে বলেছে, বর্তমানের কোটা সংক্রান্ত নীতিমালা প্রয়োগ অত্যন্ত জটিল, দুরূহ ও সময় সাপেক্ষ ব্যাপার।