চুয়াডাঙ্গা বৃহস্পতিবার , ১২ মে ২০২২
আজকের সর্বশেষ সবখবর

সময়ের সমীকরণে সংবাদ প্রকাশের চার মাস পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সরেজমিনে তদন্ত শুরু

চুয়াডাঙ্গায় ভুয়া প্রকল্পে নিয়োগ দিয়ে অর্থ বাণিজ্য
নিজস্ব প্রতিবেদক:
মে ১২, ২০২২ ২:৫০ অপরাহ্ণ
Link Copied!

চুয়াডাঙ্গায় গোল্ডেন সার্ভিস ‘আস্থা’ নামক ভুয়া প্রকল্পে নিয়োগ দিয়ে অর্থ বাণিজ্যের ঘটনায় ‘দৈনিক সময়ের সমীকরণ’ পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশের চার মাস পর তদন্ত শুরু হয়েছে। গঠিত তদন্ত কমিটির ডাকে হাজির ছিলেন তৎকালীন সিভিল সার্জন ডা. এ এস এম মারুফ হাসান। গতকাল বুধবার দুপুর ১২টায় চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের সম্মেলনকক্ষ ও সিভিল সার্জন অফিসে বিকেল পর্যন্ত এ কমিটি তাদের তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করে। এরই মধ্যে চাকরি হারানোসহ এতোদিনের পারিশ্রমিক না পাওয়ার ভয়ে চুপ করে থাকা নিয়োগকৃতদের মধ্যে ৬০ জনের অধিক এই প্রকল্পে অর্থ দিয়ে নিয়োগ পাওয়ার বিষয়ে তদন্ত কমিটিকে লিখিতভাবে জানিয়েছে। বিভাগীয় তিন সদস্যবিশষ্ট তদন্ত কমিটিতে সভাপতি ছিলেন খুলনা বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. মনজুরুল মুরশিদ। এছাড়াও কমিটি থাকা অন্য দুজন সদস্য হলেন যশোর সিভিল সার্জন অফিসের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. নাজমুস সাদিক ও খুলনা স্বাস্থ্য অফিসের প্রশাসনিক কর্মকর্তা এমএম জাহাতাব হোসেন। তদন্ত কমিটির প্রয়োজনে চুয়াডাঙ্গার সাবেক সিভিল সার্জন ডা. এ এস এম মারুফ হাসানসহ চুয়াডাঙ্গার বিভিন্ন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তারা তদন্ত কার্যক্রমের সময় উপস্থিত ছিলন। তদন্ত চলাকালে প্রশ্নবানে জর্জরিত তৎকালীন সিভিল সার্জন ডা. এ এস এম মারুফ হাসান। তিনি কোনো প্রশ্নেরই সদুত্তোর দিতে পারেননি। চুয়াডাঙ্গার সাবেক এই সিএস শুধু বলেন তদন্ত কমিটির তদন্ত শেষ হোক। তারাই সব জানাবেন।

জানা যায়, গত বছর (২০২১ সালের) জুলাই মাসের ২৫ তারিখ করোনা অতিমারী সময়ে চুয়াডাঙ্গা জেলা স্বাস্থ্যখাতে লোকবলের নিয়োগের বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখার পরিচালক বরাবর অনুমতি সংক্রান্ত একটি চিঠি প্রেরণ করেন তৎকালীন সিভিল সার্জন ডা. এ এস এম মারুফ হাসান। ওই বছরেরই আগস্ট মাসের ৫ তারিখ স্বাস্থ্য বিভাগের মহাপরিচালকের পক্ষে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখার পরিচালকের অনুমতি পেয়ে তিনি গোল্ডেন সার্ভিসের আওতায় আস্থা প্রকল্পে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালসহ জেলা স্বাস্থ্য বিভাগে দুইশ’র অধিক কর্মী নিয়োগ করেন। এর মধ্যে বিভিন্ন উপজেলা ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা বরাবর নিয়োগকৃতদের নামসহ পদবি দিয়ে যোগদানের জন্য নির্দেশও দেন তৎকালীন সিভিল সার্জন। সদর হাসপাতালে নিয়োগপ্রাপ্তরা জেলা সিভিল সার্জন অফিস থেকে নিয়োগপত্র নিয়ে সরাসরি হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগে ও অন্যরা জেলার বিভিন্ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কাজ শুরু করেন। ওই যে নিয়োগ শুরু, তারপর থেকে এই কর্মীরা বেতন যেমন পাননি। তাদের খোঁজও কেউ রাখেনি।

এরপর বিভিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে গোল্ডেন সার্ভিসের ‘আস্থা’ নামক প্রকল্প নিয়ে অনুসন্ধানে নামে দৈনিক সময়ের সমীকরণ। এরপর ‘দৈনিক সমেয়র সমীকরণ’ পত্রিকায় ২০২১ সালের ২৯ ডিসেম্বর ‘আস্থার নিয়োগে অনাস্থা, হাতে গোনা ছাড়া কেউ পায়নি বেতন: নিয়োগে অর্থ বাণিজ্যসহ নানা অভিযোগ’ ও ২০২২ সালেল ১ জানুয়ারি ‘চুয়াডাঙ্গায় যেভাবে আস্থার আবির্ভাব’ শিরোনামে পরপর দুটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে ডিবিসি টেলিভিশনে আস্থা প্রকল্পে অর্থ বাণিজ্যের অভিযোগ সংক্রান্ত রিপোর্ট অন-এয়ার হলে বিষয়টি স্বাস্থ্য বিভাগের নজরে আসে। এরপরই গঠন হয় তদন্ত কমিটি। আর সেই তদন্ত কমিটিই গতকাল তদন্ত করতে চুয়াডাঙ্গা আসে। এরপর নিয়োগকৃতদের থেকে এই প্রকল্পে চাকরির জন্য বিভিন্ন মাধ্যমে ১ লাখ টাকা থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা আদায় করার বিষয়ে গতকাল তদন্ত কমিটিকে নিশ্চিত করে ভুক্তভোগীরা। এর পূর্বেই আস্থা প্রকল্পের আওতায় চুয়াডাঙ্গার সদর হাসপাতাল, সিভিল সার্জন অফিস, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও কমিউনিটি ক্লিনিকে মোটা অংকের বেতনের লোভ দেখিয়ে ২ শতাধিক নারী-পুরুষকে নিয়োগ দেয় প্রকল্প পরিচালকের সহযোগিতায় সাবেক সিভিল সার্জন ও তার সহযোগীরা বলে অভিযোগ তো রয়েছেই।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চুয়াডাঙ্গার তৎকালীন সিভিল সার্জন ডা. এ এস এম মারুফ বলেন, ‘করোনা মহামারি সময়ে মানুষের সেবার লক্ষে গোল্ডেন সার্ভিসের আস্থা নামক একটি প্রকল্প থেকে চুয়াডাঙ্গা জেলায় বিভিন্ন পদে স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করতে চেয়ে আমার নিকট একটি চিঠি প্রেরণ করে। চিঠিতে তারা এটি একটি অলাভজনক এবং সেবামূলক প্রতিষ্ঠান বলে জানায়। নিয়োগকৃত লোকবলের বেতন ও ভাতার সকল ব্যায় গোল্ডেন সার্ভিস লিমিটেড বহন করবে বলে জানায়। সেসময় লোকবলের প্রয়োজন ছিল, তবে পরিপূর্ণরুপে প্রকল্পটি যাচাই-বাছাই করার সুযোগ ছিল না। তবে এ প্রকল্পে কোনো অর্থ বাণিজ্যের বিষয়ে আমি জড়িত নই।’

তদন্ত কমিটির সভাপতি ও খুলনা বিভাগের পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. মনজুরুল মুরশিদ বলেন, ‘বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি স্বাস্থ্য বিভাগের নজরে আসে। পরবর্তীতে এ বিষয়ে তদন্তের জন্য কমিটি গঠন করা হয়। আজ (গতকাল) সরেজমিনে আমরা ভুক্তভোগী ও অভিযুক্তদের লিখিত ও মৌখিক বক্তব্য নিয়েছি। সিভিল সার্জন অফিস থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও সংগ্রহ করা হয়েছে। ৬০ জনের অধিক নিয়োগকৃত ভুক্তভোগী আমাদেরকে লিখিতভাবে তাদের অভিযোগ জানিয়েছে। অভিযোগ পর্যালোচনা করে ২ সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন তৈরি করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হবে। রিপোর্ট পাঠানোর পর কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। তবে যারা প্রতারণার শিকার হয়েছে, কাজ করেও বেতন পাননি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ভবিষ্যতে কোনো প্রকল্পে তাদের কাজ দেওয়া হতে পারে।’

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।