চুয়াডাঙ্গা বুধবার , ৮ ডিসেম্বর ২০২১
আজকের সর্বশেষ সবখবর

সব হারাচ্ছেন মুরাদ!

সমীকরণ প্রতিবেদনঃ
ডিসেম্বর ৮, ২০২১ ১১:৫০ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

এক মাসও যায়নি। আওয়ামী লীগের বড় নেতা গাজীপুরের মেয়র জাহাঙ্গীর আলম দলীয় পদ ও মেয়র দুটোই হারিয়েছেন। সেই একই পথে হাঁটছেন ড. মুরাদ হাসান। নারী বিদ্বেষমূলক ও কুরুচিপূর্ণ নানা বক্তব্য দিয়ে কঠোর সমালোচিত হয়েছেন। এখনো দেশব্যাপী বইছে নিন্দার ঝড়। ফলশ্রুতিতে ইতোমধ্যে প্রতিমন্ত্রীর পদ হারিয়েছেন তিনি। এমপি পদ নিয়েও তৈরি হয়েছে সংশয়। যেকোনো সময় এমপি পদও হারাতে পারেন। এ নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনাও শোনা যাচ্ছে। ফলে সব হারিয়ে কারাগারেও যেতে পারেন মুরাদ হাসান। এমন আশঙ্কাও উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না।

এদিকে প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগের পরই জামালপুর জেলা আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদকের পদ থেকেও অব্যাহতি দেয়া হয়েছে মুরাদকে। আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারক পর্যায় থেকেও কঠোর সিদ্ধান্তের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। দলীয় সাধারণ সম্পাদক ও একজন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকও মুরাদের দলীয় সাধারণ সদস্যপদ থেকে অব্যাহতি দেয়ার কথা গণমাধ্যমে বলেছেন। এ অবস্থায় দলীয় সকল পদ থেকে তাকে বহিষ্কার করা হলে এমপি পদ থাকবে কি থাকবে না সেটা নিয়েও সাংবিধানিক ও আইনি প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

এমন অবস্থায় আইনজ্ঞরা বলছেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘কোনো নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হয়ে কোনো ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে (ক) উক্ত পদ দল হতে পদত্যাগ করলে অথবা (খ) সাংসদ উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান করলে, তাহলে সংসদে তার আসন শূন্য হবে।’ এছাড়া অনলাইনে নারী-বিদ্বেষী হেইট স্পিচ ছড়ানো, নারীর প্রতি সহিংস আচরণ ও ধর্ষণ চেষ্টার মামলাও হতে পারে। যদি তাই হয়, তবে তিনি জেলেও যেতে পারেন।

আইনজীবীরা বলছেন, মুরাদ হাসান একজন নায়িকাকে কুপ্রস্তাব দিয়েছেন। ধর্ষণের হুমকি দিয়েছেন। খালেদা জিয়ার নাতনি সম্পর্কে কুরুচিকর মন্তব্য করেছেন। একজন সাবেক নারী এমপিকে প্রকাশ্যে বর্ণবাদী মন্তব্য করেছেন। এগুলো সবই নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধ। তাই সংবিধানের ৬৬ এর (২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তার সংসদ সদস্য পদ হারানো উচিত। এমনকি অপরাধ বিজ্ঞানের সংজ্ঞায় এ চারটিই ফৌজদারি অপরাধ। ফলে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ আইনানুযায়ী, যৌন হয়রানির সাজা সাত থেকে ১৪ বছর জেল। সেই তুলনায় শুধু মন্ত্রিত্ব থেকে বাদ, খুবই লঘুদণ্ড হবে। তাকে আইনের আওতায় এনে উপযুক্ত বিচার করা উচিত বলে মনে করেন তারা।

এদিকে সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রীর আওয়ামী লীগের প্রাথমিক সদস্যপদ বাতিল হচ্ছে কি-না জানতে চাইলে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেন, এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠক হলে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। মুরাদ হাসানের সংসদ সদস্যপদ থাকবে কি-না সে প্রশ্নের জবাবে কাদের বলেন, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন স্পিকার।

সংসদ সদস্যপদ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘দল থেকে বহিষ্কার করা হলে তিনি এমপি পদে থাকতে পারেন না। এ ধরনের নজির আগেও ছিলো। যেহেতু তিনি একটি দলের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত, তাই ওই দল যদি তাকে বহিষ্কার করে তাহলে সংবিধান অনুযায়ী মুরাদের সংসদ সদস্যপদও খারিজ হয়ে যাবে। তবে সংসদ সদস্যপদ থাকা না থাকার বিষয়টি সুরাহা করবেন স্পিকার। এ বিষয়ে স্পিকারকে অবগত করা হলে তিনি কার্যপ্রণালি ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট জামিউল হক ফয়সাল বলেন, ‘সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী যদি কোনো সংসদ সদস্য দল হইতে পদত্যাগ করেন কিংবা দলের বিপক্ষে ভোটদান করেন তাহলে তার আসন শূন্য হইবে। অনুচ্ছেদ ৬৬(২)( ঘ) অনুযায়ী তিনি যদি নৈতিক স্খলনের কারণে দুই বছরের অধিক দণ্ডিত হন, তাহলেও যাবে।’ কিন্তু ডা. মুরাদ দল থেকে পদত্যাগও করেননি, দণ্ডিতও হননি। তাই এই মুহূর্তে তার সদস্যপদ শূন্য হওয়ার কথা না। তবে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হলে, তার সংসদ সদস্যপদ শূন্যতার প্রশ্ন দেখা দিলে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬৬(৪) অনুযায়ী বিষয়টি নিষ্পত্তি করার জন্য নির্বাচন কমিশন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। তার সদস্যপদ শূন্য করতে পারবে, আবার নাও করতে পারবে। ৬৬( ৪) অনুযায়ী তখন কমিশনের ক্ষমতা।

নারী অধিকারকর্মীরা বলছেন, ‘সমাজের চোখে যা কিছু নৈতিক তার ব্যত্যয় ঘটলে স্খলন বা চ্যুতি ঘটেছে বলে ধরে নেয়া হয়। নৈতিক স্খলন কোথাও সংজ্ঞায়িত নেই। ন্যায়বিচার, সততা, নৈতিক সদ্গুণের যা কিছু বিপরীত, তা-ই নৈতিক স্খলন। যার যার ক্ষেত্র বিবেচনা করে সেটিকে ব্যাখ্যা করা হয়। মুরাদ হাসান ছাত্রলীগ নেত্রীদের চরিত্রহনন করেছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাকে অপব্যবহারের হুমকি ধমকি দিয়েছেন। তার অপরাধের তালিকা বেশ লম্বা। দেখা যাক, লঘুদণ্ডতেই পার পেয়ে যাবেন মুরাদ হাসান, নাকি অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনায় গুরুদণ্ড পান।

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, ‘সংবিধানের ওপর শপথ নেয়া একজন মানুষ এ ধরনের বক্তব্য দেবেন তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এটা সংবিধান অবমাননা। বাংলাদেশের দণ্ডবিধি অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ রয়েছে। তথ্য মন্ত্রণালয় এবং সংসদ থেকে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া উচিত।’

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার পরিবারের এক সদস্যকে নিয়ে দেয়া বক্তব্য এবং এক চিত্রনায়িকার সঙ্গে ফোনে ডা. মুরাদ হাসানের কথা বলার ভিভিও-অডিও সমপ্রতি বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। শুধু এই বিষয়টি নয়, এর বাইরেও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বক্তব্য ও মন্তব্য করে সমপ্রতি তিনি আলোচনা-সমালোচনায় উঠে আসেন। এছাড়া তিনি আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগের নেত্রীদের নিয়েও কুরুচীপূর্ণ মন্তব্য করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। যে ভিডিও ও অডিওগুলো বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে সেগুলো ডা. মুরাদ হাসানের বলে সরকার ও আওয়ামী লীগ নিশ্চিত হয়েছে।

আর তা নিশ্চিত হওয়ার পরই গত সোমবার সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মন্ত্রিসভা থেকে মুরাদকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন। সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থেকেও মুরাদ হাসান তার ওইসব বক্তব্যে নারী বিদ্বেষ এবং অশ্লীল ভাষা ও শব্দ ব্যবহার করেন, যার মাধ্যমে নারীর প্রতি চরম অবমাননা প্রকাশ পেয়েছে। এমনকি ওই চিত্রনায়িকা তার (মুরাদের) নির্দেশ না মানলে বলপ্রয়োগ ও সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীকে ব্যবহারের হুমকিও দেন ফোনে।

এসব ঘটনায় সরকার ও আওয়ামী লীগ বিব্রত ও অস্বস্তিতে পড়ে। এই ধরনের একজনকে দলে রাখা হবে কি-না তা নিয়েও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভিন্ন আলোচনা ও গুঞ্জন চলছে। এর আগে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়ার পর প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী দল থেকে বহিষ্কার হন ও তার সংসদ সদস্যপদ চলে যায়। ২০১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদ থেকে পদত্যাগ করেন আবদুল লতিফ সিদ্দিকী। এর আগে ২০১৪ সালের ১২ অক্টোবর মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়েন তিনি। ওই সময় প্রধানমন্ত্রী সংবিধানের ৫৮ অনুচ্ছেদের (২) দফা অনুযায়ী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর মন্ত্রী পদে নিয়োগের অবসান ঘটানোর জন্য প্রেসিডেন্টকে পরামর্শ দেন।

পরামর্শ অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট সংবিধানের ৫৮ অনুচ্ছেদের (১) দফার (গ) উপ-দফা অনুযায়ী ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর মন্ত্রী পদে নিয়োগের অবসান করা হয়। ওইদিন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য পদ থেকে অব্যাহতি ও প্রাথমিক সদস্যপদ অস্থায়ীভাবে স্থগিত করা হয় আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর। পরে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বহিষ্কার করা হয়।

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।