চুয়াডাঙ্গা সোমবার , ২৩ জানুয়ারি ২০২৩
আজকের সর্বশেষ সবখবর

সঞ্চয় নিয়ে দুশ্চিন্তায় মধ্যবিত্তরা

সমীকরণ প্রতিবেদনঃ
জানুয়ারি ২৩, ২০২৩ ৭:২২ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

Girl in a jacket

সমীকরণ প্রতিবেদন:
দেশের অধিকাংশ ব্যাংক বর্তমানে সঞ্চিত হিসাবের বিপরীতে তিন থেকে চার শতাংশ এবং স্থায়ী আমানতের বিপরীতে সর্বোচ্চ ছয় শতাংশ হারে সুদ দিচ্ছে। অথচ সর্বশেষ ডিসেম্বর মাসে দেশে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৮.৭১ শতাংশ। এর আগের দুই মাস নভেম্বর ও অক্টোবরে এ হার ছিল যথাক্রমে ৮.৮৫ এবং ৮.৯১ শতাংশ। ফলে ব্যাংকে টাকা জমা রেখে আমানতকারীদের মুনাফার পরিবর্তে উল্টো লোকসান গুনতে হচ্ছে। এর ওপর ব্যাংকে তারল্য সংকটসহ নানা গুঞ্জনে সঞ্চিত অর্থের সুদের ওপর নির্ভরশীল মধ্যবিত্ত শ্রেণির আমানতকারীরা কোথায় অর্থ লগ্নি করবেন সে চিন্তায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। এ শ্রেণির নাগরিকরা মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে কিছুটা উচ্চ সুদে কোথায়, কীভাবে আমানত নিরাপদে গচ্ছিত রাখা যায় তা খোঁজার চেষ্টা করছেন। ব্যাংক থেকে টাকা সরিয়ে এনে আর্থিক প্রতিষ্ঠানে (লিজিং) রাখবেন, সে সাহস পাচ্ছেন না অনেকেই। সেখানে সুদ বেশি পাওয়া গেলেও সময়মতো মূল টাকা ফেরত পাওয়া যাবে কি না, সে আশঙ্কা রয়েছে অনেকের। শেয়ারবাজারের টালমাটাল অবস্থার কারণে সেখানেও আস্থা নেই বিনিয়োগকারীদের। অন্যদিকে নানা শর্তের বেড়াজালে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। ফ্ল্যাট ও জমি কেনার ক্ষেত্রেও নানাভাবে প্রতারিত হয়ে সঞ্চয় হারানোর ভয় রয়েছে। এ খাতে বিনিয়োগ করলে তা থেকে উপযুক্ত হারে মাসিক রিটার্ন পাওয়ার সুযোগ নেই। বিপদে-আপদে বিনিয়োগকৃত অর্থ নগদায়নের সুযোগও অনেক কম। এ পরিস্থিতিতে নানা গুঞ্জনে আতঙ্কিত হয়ে যারা ব্যাংক থেকে আমানত তুলে নিয়েছেন, তারা অনেকে মহাবিপাকে পড়েছেন। এদিকে সুযোগ বুঝে মধ্যবিত্তের গচ্ছিত সঞ্চয় হাতিয়ে নিতে একাধিক ধান্ধাবাজ চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠায় অর্থনীতিবিদদের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সম্প্রতি বিপুল সংখ্যক নামসর্বস্ব মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) কোম্পানি, কো-অপারেটিভ সোসাইটি এবং পাড়া-মহল্লাভিত্তিক বিভিন্ন সমিতি উচ্চ হারে মুনাফা দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে মধ্যবিত্তের আমানত সংগ্রহ করছে। না বুঝে অনেকে এসব ঝুঁকিপূর্ণ খাতে সঞ্চয় বিনিয়োগের ফাঁদে পড়ছেন। ঢাকা মহানগরের পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে থানায় আগেও অভিযোগ আসত। তবে এসব অভিযোগ সম্প্রতি কয়েকগুণ বেড়েছে। অর্থ লেনদেন সংক্রান্ত বিষয়গুলো আদালতের এখতিয়ারভুক্ত হওয়ায় তাদেরকে সেখানে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এসব ফন্দিবাজ চক্র যাতে উচ্চ মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষের সঞ্চয় হাতিয়ে নিতে না পারে এ ব্যাপারে সর্বস্তরে সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি এ চক্রের অপতৎপরতার তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এ চক্রের অপতৎপরতা দ্রুত থামিয়ে দেওয়া না গেলে দেশের অর্থনীতিতে চরম মন্দা নেমে আসবে। শিল্প-কলকারখানা ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নিয়মমাফিক বিনিয়োগ ভীষণভাবে বাধাগ্রস্ত হবে। মধ্যবিত্তের আমানত অপ্রচলিত খাতে চলে যাওয়ার পাশাপাশি অর্থ পাচার আরও বাড়বে। ব্যাংকে তারল্য সংকট আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অর্থনীতিবিদরা জানান, দেশে সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠী কিছুটা আর্থিক নিরাপত্তা সুবিধা গ্রহণ করতে পারছিলেন। তবে যাদের ব্যবসা-বাণিজ্য করার সামর্থ্য নেই, আবার যেটুকু সঞ্চয়, সেই অর্থ কোথাও বিনিয়োগের মতো পরিস্থিতি নেই কিংবা ঝুঁকি নিতে চান না, এমন মানুষের শেষ ভরসা জাতীয় সঞ্চয় ব্যুরোর সঞ্চয়পত্র স্কিম। নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা এ খাতে সহজে বিনিয়োগ করতে না পারায় তারা তাদের ক্ষুদে সঞ্চয় বিভিন্ন কো-অপারেটিভ কিংবা স্থানীয় সমবায় সমিতিতে বিনিয়োগ করছেন। অনেকেই আবার ছুটছেন পুঁজি বাজারে। এতে তাদের সঞ্চয় বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এদিকে বেশ কয়েক মাস ধরে দেশের পুঁজিবাজার দরপতনের মধ্যে রয়েছে। এতে অনেকটা নীরবে পুঁজি হারিয়েছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। কিছু কিছু বিনিয়োগকারী পুঁজিবাজারের বর্তমান পরিস্থিতিকে ২০১০ সালের থেকেও ভয়াবহ বলে মনে করছেন।
তারা বলছেন, পুঁজিবাজারে ২০১০ সালে যে মহাধস নামে তা সবাই স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিলেন। সে সময় একের পর এক প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দরপতনের সঙ্গে সূচকের বড় পতন হয়েছিল। এতে নিঃস্ব হন লাখ লাখ বিনিয়োগকারী। সাম্প্রতিক সময়েও তালিকাভুক্ত প্রায় সব প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম কমেছে। এতে একটু একটু করে পুঁজি হারিয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। যাদের সংখ্যা লাখের অধিক। কিন্তু সূচকের বড় পতন হয়নি। অর্থনীতিবিদরা জানান, দেশে ঝুঁকিমুক্ত বিনিয়োগের কোনো প্রকল্প নেই। সারা জীবনের সঞ্চয় বিনিয়োগ করে নির্দিষ্ট পরিমাণের কিছু টাকা পাওয়া যায়, মূল্যস্ফীতি এবং কর বাদ দিলে তার সামান্য পরিমাণ অবশিষ্ট থাকে। এরপর সে সুযোগ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী ক্ষতির মুখে পড়েছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, ‘দেশে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তার জন্য একটা ব্যবস্থা থাকা দরকার। বিশেষ করে বয়স্ক মানুষ এবং কিছু সংখ্যক গৃহবধূর পক্ষে কোনো ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্য করা সম্ভব নয়। তারা সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগকে নিরাপদ মনে করেন। এ খাতে সহজে বিনিয়োগ করতে না পারায় তাদের পক্ষে জীবনধারণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।’ গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিআরআইএর নির্বাহী পরিচালক ও ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান ডক্টর আহসান এইচ মনসুর এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘মূল্যস্ফীতির তুলনায় আমানতের সুদহার কম হলে মানুষ টাকা ব্যাংকে রাখতে চাইবেন না। রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, যারা সঞ্চয় করেন তারা যে শুধু সঞ্চয় দেশে রাখবেন, তা নয়। বিদেশেও সঞ্চয় করতে পারেন। কাজেই আমাদের আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গেও প্রতিযোগিতা করতে হবে। তা না হলে দেশ থেকে টাকা পাচার বেড়ে যাবে।’

Girl in a jacket

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।