শ্বাসরুদ্ধকর জয়ে সিরিজ বাংলাদেশের

162

সমীকরণ প্রতিবেদন:
তিরিপানো ক্রিকেটে চিরাচরিত কথাটি আবারও মনে করিয়ে দিলেন। শত বছরের খেলাটি ‘চরম অনিশ্চয়তার’। বাংলাদেশের ঘাম ঝরিয়ে ম্যাচ হারল জিম্বাবুয়ে। আফসোস থাকতেই পারে। গতকাল মঙ্গলবার ক্রেইগ আরভিন স্কোয়াডে থাকলে কি হতো কে বলতে পারে! বাংলাদেশ ৪ রানে জিতল ম্যাচটি। তবে তৃপ্তির ঢেঁকুর নেই। মাশরাফির পথচলা এই ক্যারিয়ারের পড়ন্ত বিকেলেও নতুন মাত্রা পেল। জিম্বাবুয়ের সঙ্গে আমাদের খেলা মানেই ‘হারলে কলঙ্ক, জিতলে হওয়ার কথা ছিল’ ভাব থাকেই। ফলে যে ফলাফলও বাংলাদেশ করুক কোনোভাবেই প্রশংসা আসবে না। তামিম ইকবালের অমন সেঞ্চুরির পর ম্যাচ জিতবে না বাংলাদেশ! এমন কি হয় নাকি! বাংলাদেশ সিলেটে দ্বিতীয় ম্যাচেও জিতে সিরিজ আগেভাগে নিশ্চিত করেছে। তামিম রেকর্ড গড়া ১৫৮ ও ৭ হাজার রানের মাইলফলকের দিনটিতে বাংলাদেশ হারেনি। জিম্বাবুয়ে এই ম্যাচে শেষের দিকে বাংলাদেশ জীবন কঠিন করে তোলে। তিরিপানো ও মুটুমবদজি লড়াই জমিয়ে তোলেন। মাশরাফিদের ঘাম ঝড়ান তারা। শেষ ওভারে জয়ের জন্য জিম্বাবুয়ের ২০ রান দরকার ছিল। ৮০ রানের পার্টনারশিপ ছিল এই দুজনের (৪৫ বল)। মুটুম (৩৪) শেষ ওভারের দ্বিতীয় বলে আউট হয়ে গেলে নির্বিষ হয়ে যায় জিম্বাবুয়ে।
করাচিতে বাংলাদেশ একমাত্র ওয়ানডে ম্যাচটি খেলবে ৩ এপ্রিল। এছাড়া দ্বিতীয় টেস্ট ম্যাচটি তো রয়েছেই। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ১ ম্যাচ হাতে রেখে সিরিজ জয়ের ব্যাপারটি শুধু মানসিক প্রশান্তি দেবে। মুশফিক যাবেন না পাকিস্তানে। সেজন্য জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে তৃতীয় ওয়ানডে ম্যাচটিতে মুশফিককে বসিয়ে কম্বিনেশন বুঝতে চাইবেন কোচ ডমিঙ্গো। পাকিস্তানের ওয়ানডে দলটি কেমন হবে সেটা যাচাই করবেন। সবচেয়ে বড় আতঙ্ক হচ্ছে করোনা ভাইরাস। করাচির স্কুল-কলেজ এখন বন্ধ রয়েছে। এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে সিটিয়ে গেছেন করাচিবাসী। এমন দুর্যোগের মধ্যেই বাংলাদেশ ক্রিকেট যাবেন। ইতোমধ্যে করোনাভাইরাসের আতঙ্কে পড়েছে ফুটবলের ইউরো ও টোকিও অলিম্পিক। জিম্বাবুয়ের এই জয় নিয়ে মাশরাফির ষোলোকলা পূর্ণ হয়েছে। কথিত ছিল, এটাই মাশরাফির শেষ সিরিজ অধিনায়ক হিসেবে। ওয়েসলে মাধেভিরে ভয়ংকর হয়ে উঠছিলেন। তাকেও তাইজুল এলবিডব্লিউ করে ফেরান। তিনিও ৫২ রান করেছিলেন। জিম্বাবুয়ে ১৮৩ রানে ৫ উইকেট হারায় (৩৬.২ ওভার)। সিকান্দার রাজা একা লড়াই করে যাচ্ছিলেন। তাইজুল আবারো মুটুম্বুমিকে আউট করেন। আর এবারও এলবিডব্লিউ। ৪১ ওভারে ২১৩ রানে জিম্বাবুয়ে ৬ উইকেট হারালে আর জেতার আশা থাকে না সফরকারীদের। তখন ৫৪ বলে ১১০ রান দরকার ছিল।
জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে এটা বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রানের ইনিংস। প্রথম ওয়ানডেতেও তিনশর বেশি রান তাড়া করতে গিয়ে ১৬৯ রানে হেরেছে জিম্বাবুয়ে। বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি রানের ব্যবধানে ম্যাচ জিতেছে। জিম্বাবুয়ে পরের ম্যাচেও সেভাবে হাত খুলে খেলতে পারেনি শুরুর দিকে। দলের ১৫ রানে চাকাভা (২) ও ৪৪ রানে ব্রেন্ডন টেলর (১১) মেহেদি হাসানের দারুণ থ্রোতে রান আউট হয়ে ফেরেন। অধিনায়ক শন উইলিয়ামসের কাঁধে বিশাল চাপ ছিল। ১৪ রানে তিনি মেহেদি মিরাজের দারুণ ডেলিভারিতে লেগ বিফোর দ্য উইকেট হয়ে সাজঘরে ফেরত যান। তবে জিম্বাবুয়ের ওপেনার তিনাশে একদিক ধরে রেখেছিলেন। তিনি তাইজুলের বলে ব্যাক ফুটে খেলতে গিয়ে লেগ বিফোর দ্য উইকেট হন ৫১ রানে। ১০২ রানে জিম্বাবুয়ে যখন ৪ উইকেট হারায় তখন ২৩.৪ ওভার চলে। প্রায় ১৯ মাস ও দিনের হিসাবে ৫৮৩ দিন পর সেঞ্চুরি তুলে নেন তামিম ইকবাল। ক্যারিয়ারে ছিল এটা ১২তম শতরান। সর্বশেষটি করেছিলেন ২০১৮ সালের ২৮ জুলাই। সেবার প্রতিপক্ষ ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। এক ইনিংসে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রানের ইনিংস ছিল তামিমের। এবার তিনি করলেন ১৫৮ রান। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে এটা দ্বিতীয় সেঞ্চুরি। এ ছাড়া প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে সাত হাজার রানের মাইলফলক স্পর্শ করেন তামিম (৭০৪৪)। বাংলাদেশের ব্যাটসম্যান হিসেবে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সবচেয়ে বেশি রানও তামিমের (১৫৫৬)। ৩২৩ রানের টার্গেট কম নয়। মুশফিক ও মাহমুদউল্লাহ ভাল ব্যাট করেছেন। তবে মিথুনের ১৮ বলে ৩২ রানের ইনিংসটি বাংলাদেশকে বেশ সাহায্য করে। বাংলাদেশ পৌঁছে যায় ৩২২ রানে। জিম্বাবুয়ের মুম্বা ও তিরিপানো দুটি করে উইকেট শিকার করেছেন।
ওপেনিংয়ে তামিম বেশ চাপে ছিলেন। আগের ম্যাচে ২৪ রানে আউট হন তিনি। রানের চেয়ে বল বেশি ডট দিচ্ছিলেন। পুরো সেই তামিমকে আবার দেখলো বাংলাদেশ। পাওয়ার প্লেতে দুরন্ত ব্যাটিং করেছেন তিনি। সকল সমালোচনাকে ঝেটিয়ে বিদায় করেছেন তিনি। তবে লিটন ও তিনি ভালোই খেলছিলেন। তামিমের একটি শট বোলার মুম্বার হাতে লেগে অপরপ্রান্তের স্ট্যাম্প ভেঙে যায়। লিটন ক্রিজের বাইরে ছিলেন। ৯ রানে সাজঘরে ফেরেন লিটন। শান্তও এদিন ইনিংস বড় করতে পারেননি। তিনি রান আউট করে ফেরেন ৬ রানে। মুশফিক ও তামিম তৃতীয় উইকেটে ৮৭ রানের জুটি উপহার দেন। মুশফিক ৫৫ রানে ফেরেন। তৃতীয় ওয়ানডেতে মুশফিক বিশ্রামে থাকতে পারেন। তামিম ইনিংস বড় করছেন রীতিমত। মাহমুদউল্লাহর সাথে তামিমের ১০৬ রানে জুটি আসে। মাহমুদউল্লাহ ফেরেন ৪১ রানে। বাংলাদেশের ব্যাটিং ডিসপ্লে টা ভালই হয়। তবে পুরো আলোটাই নিয়ে নেন তামিম ইকবাল।
প্রধান কোচ ডমিঙ্গো চমক দিলেন বলতেই হবে। উইনিং কম্বিনেশন ভেঙে দিলেন তিনি। প্রথম ওয়ানডেতে বাংলাদেশ জিতে ১-০ তে এগিয়ে যায়। স্বাভাবিকভাবে পরের ম্যাচে একই একাদশ থাকার কথা ছিল। তবে কোচ মোস্তাফিজুর রহমান ও সাইফউদ্দিনকে এই দ্বিতীয় ওয়ানডের একাদশে রাখেননি। তাদের দুজনের বদলে দলে আসেন শফিউল ইসলাম ও আল-আমিন হোসেন। জিম্বাবুয়ের একাদশেও পরিবর্তন আসে। শন উইলিয়ামস দলে ফিরেছেন। তবে আরভিন পুরো সুস্থ না হওয়ায় একাদশে সুযোগ পাননি। বাংলাদেশ টসে জিতে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নেয়। মাশরাফি বেশ আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। আগের ম্যাচে লিটন দাস সেঞ্চুরি করেছিলেন। বাংলাদেশ প্রথম ম্যাচে ৩২১ রান তুলেছিল। মাশরাফির সিদ্ধান্ত যে সঠিক ছিল সেটা কাল আবার প্রমাণ হয়েছে। বাংলাদেশ এবারও ৩২২ রান তুলে নিয়ে চাপে ফেলে জিম্বাবুয়েকে।