চুয়াডাঙ্গা বৃহস্পতিবার , ৩০ জুন ২০২২
আজকের সর্বশেষ সবখবর

শেষ মাসে ব্যাংক ঋণে চাপ

সমীকরণ প্রতিবেদনঃ
জুন ৩০, ২০২২ ৭:৪৩ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

সমীকরণ প্রতিবেদন: বাজেট ঘাটতি মেটাতে অর্থবছরের পুরো সময়ে ব্যাংকঋণে ধীরগতি থাকলেও শেষ মাসে এসে মোটা অঙ্কের ঋণ নিয়েছে সরকার। মোট ঋণের ৩০ শতাংশের বেশি নেয়া হয়েছে জুন মাসে। সধারণত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) ওপর নির্ভর করে সরকারের ব্যাংকঋণের পরিমাণ। অর্থবছরের শেষ দিকে এসে এডিপির বিভিন্ন প্রকল্পের বকেয়া পরিশোধ করতে গিয়ে ব্যাংকে চাপ পড়ে বলে মত বিশ্লেষকদের। তারা বলছেন, অধিকাংশ মন্ত্রণালয় সারা বছর তাদের চাহিদার অধিকাংশ অর্থ ব্যয় করতে না পেরে শেষের দিকে অর্থছাড়ের আবেদন করে। তাই ঢালাও এসব আবেদনের অর্থ তাৎক্ষণিক পরিশোধে একমাত্র বিকল্প হয়ে দাঁড়ায় ব্যাংক। এসব দিক বিবেচনায় নিয়ে সারা বছর ব্যাংকঋণে ধীরগতি থাকলেও সংশোধিত বাজেটে লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়েছে। অন্যদিকে সুদ হার কমে যাওয়ায় ও নানা শর্তের বেড়াজালে ভাটা পড়েছে সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে। বিপরীতে বেড়েছে ব্যাংক ঋণ। তাই চলতি অর্থবছরের ৭৬ হাজার কোটি থেকে বাড়িয়ে আগামী ২০২২-২৩ অর্থবছরে ব্যাংক খাত থেকে ঋণের লক্ষমাত্রা এক লাখ ছয় হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছে। এ ছাড়া সুদ হার বেশি হওয়ার সাথে নিরাপদ বিনিয়োগ হওয়ায় সরকারি খাতে বিনিয়োগে ব্যাংকগুলোও বেশ আগ্রহী। এর প্রভাব পরার শঙ্কা রয়েছে ব্যক্তি খাতের ঋণে।

বিশ্ব ব্যাংকের বাংলাদেশ আবাসিক মিশনের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘অর্থবছরের শেষে এসে ব্যাংক খাত থেকে ঋণের পরিমাণ অধিক মাত্রায় বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি বার্ষিক উন্নয়ন প্রকল্পের (এডিপি) সাথে সম্পর্কিত। এ ক্ষেত্রে বলা হয়ে থাকে, এ সময়টাতে অনেক বকেয়া বিল (২৫-৩০ শতাংশের মতো) পরিশোধ করা হয়। এছাড়া দেখা যায়, অর্থবছরের শেষ দিকে এসে অনেক মন্ত্রণালয় চাহিদার অর্থ ব্যয় করতে পারেনি। তখন তারা তড়িঘড়ি করে অর্থছাড়ের আবেদন করে। এ অর্থ ছাড়ের জন্য যখন এক সাথে অনেক টাকার প্রয়োজন হয়, তখন অধিকাংশ টাকা ব্যাংক থেকে নেয়া হয়। তাই এ সময়টাতে ব্যাংক ঋণের পরিমাণ বেড়ে যায়। তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের মে পর্যন্ত প্রথম ১১ মাসে সরকারের মোট ঋণের পরমাণ ৩২ হাজার ৬৫২ কোটি টাকা। আর শেষ মাস জুনের মাত্র ২২ দিনেই ঋণের এই পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ১৫ হাজার ২৬৫ কোটি টাকায়। মাসের বাকি সময় (২৩-৩০ জুন) এ ধারা অব্যাহত থাকলে এ পরিমাণ আরও অনেক বেশি হবে বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।

অন্যদিকে অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে সরকারের সঞ্চয়পত্র থেকে মোট ঋণের পরিমাণ ১৮ হাজার ১৫৭ কোটি টাকা, যা সরকারের লক্ষ্যমাত্রার ৫৬.৭৪ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের জন্য সরকার সঞ্চয়পত্রে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে ৩২ হাজার কোটি টাকা। তাই অর্থবছরের শেষ মাস জুনে লক্ষ্যমাত্রা পূরণে এ খাত থেকে ঋণ নেয়ার কথা আরও ১৩ হাজার ৮৪২ কোটি টাকা।  তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরের ২২ জুন পর্যন্ত ব্যাংক থেকে সরকার নিট ৪৭ হাজার ৯১৭ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছে। গত মে পর্যন্ত যা ৩২ হাজার ৬৫২ কোটি টাকা ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ জুন ১৮২ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলে সুদহার ছিল ৬.৫৯ শতাংশ। একই দিন ৯১ দিন মেয়াদি বিলে সরকার সুদ দিয়েছে ৬.০৫ শতাংশ। এর আগে গত ১৫ জুন পাঁচ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদহার দাঁড়ায় ৭.৮০ শতাংশ। অথচ গত বছরের জুনে ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের সুদহার ছিল মাত্র ০.৫২ শতাংশ। আর ১৮২ দিন মেয়াদি বিলে ছিল ০.৬৮ শতাংশ। এ ছাড়া পাঁচ বছর মেয়াদি বিলের সুদহার ছিল ৩.৮৪ শতাংশ।

এসব সুদের হার বাড়তি থাকায় ব্যাংকগুলো অধিক পরিমাণে সরকারি ঋণে বিনিয়োগ করছে। সামপ্রতিক সময়ে সরকার ঋণ নেয়া অনেক বাড়িয়েছে। সব মিলিয়ে গত ১৪ জুন ব্যাংক ব্যবস্থায় সরকারের মোট ঋণ দুই লাখ ৫০ হাজার ৩২ কোটি টাকায় ঠেকেছে। নতুন অর্থবছর ২০২২-২৩ এর জন্য এক লাখ ছয় হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। এর মধ্যে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ৮৭ হাজার ২৮৭ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে চলতি অর্থবছরের জুলাই মাসে বিভিন্ন স্কিমে মোট ৯৭ হাজার ৩৫০ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র জমা হয়েছে। এর মধ্যে মূল টাকা ও মুনাফার অর্থ পরিশোধ হয়েছে ৭৯ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। আর রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে সঞ্চয়পত্রের গ্রাহকদের পরিশোধ করা হয়েছে ৩৬ হাজার ২৮ কোটি টাকা। জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের প্রতিবেদন সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

এ বিষয়ে জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করা শর্তে বলেন, সরকারের ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে কম সুদে ঋণ পাচ্ছে, তাই তারা সঞ্চয়পত্র ঋণের চাহিদা কামিয়ে দিয়েছে। এ ছাড়া উন্নয়ন বাজেটে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় চলতি অর্থবছরে ব্যয় কম হওয়ায় সঞ্চয়পত্র ঋণ কমেছে। অন্যদিকে ব্যাংকগুলো সরকারি খাতে বিনিয়োগে বেশি আগ্রহী হওয়ায় সঞ্চয়পত্রে বেশি শর্ত আরোপ করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মত দিয়েছেন। সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন প্রকল্পের চিত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের এডিপি বাস্তবায়নের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে দুই লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা। অথচ চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই-মে পর্যন্ত) এডিপি বাস্তবায়ন করা হয়েছে এক লাখ ৪২ হাজার ৩৮৭ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমত্রার ৬৫.৫৬ শতাংশ।

খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, বার্ষিক উন্নয়ন প্রকল্পে (এডিপি) ব্যয় কম হওয়ায় এতদিন সরকার এ খাত থেকে ঋণ কম নিয়েছে। তবে অর্থবছরের শেষে ঋণ আদায় বাড়িয়ে দেয় সরকার। এর ফলে সংশোধিত জাতীয় বাজেটে ২০২২ অর্থবছরের জন্য সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণের লক্ষ্যমাত্রা পুননির্ধারণ করা হয়েছে এক লাখ ২৪ হাজার ২৮৮ কোটি টাকায়। ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রাও পুনর্র্নিধারিত হয়েছে ৮৭ হাজার ২৮৭ কোটি টাকায়। এ ছাড়া, অন্যান্য অভ্যন্তরীণ নন-ব্যাংকিং উৎস থেকে ৩৭ হাজার এক কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে জাতীয় সঞ্চয় প্রকল্পের নেট বিক্রয়ের মাধ্যমে ৩২ হাজার কোটি টাকাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ড. জাহিদ বলেন, ‘যেহেতু ব্যাংক লোনের ক্ষেত্রে লক্ষমাত্রার চেয়ে অনেকটা পিছিয়ে আছে, তবুও সংশোধিত বাজেটে লক্ষ্যমাত্রা কেন বাড়ানো হলো তা বোধগম্য নয়।  চলতি অর্থবছরের ২২ জুন পর্যন্ত সরকার ব্যাংক থেকে প্রায় ৪৮ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। এক সপ্তাহে বাকি সব নেবে কিভাবে। এ অর্থনীতিবিদ আরো বলেন, সরকারের উচ্চ সুদে অধিক পরিমাণ ব্যাংক ঋণের ফলে ব্যক্তি খাতে ঋণ বিতরণে প্রভাব পড়বে।

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।