চুয়াডাঙ্গা শনিবার , ১৬ এপ্রিল ২০২২
আজকের সর্বশেষ সবখবর

শিশুর ভুলে হাসাহাসি, বিভাজিত রাজনীতি

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষার লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করা হয়েছে শিশুটিকে
সমীকরণ প্রতিবেদনঃ
এপ্রিল ১৬, ২০২২ ৯:১১ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

পহেলা বৈশাখে একটি টেলিভিশন চ্যানেলের লাইভ সম্প্রচারে এক শিশুর বক্তব্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক ট্রল চলছে। প্রশ্ন উঠেছে সাংবাদিকতার নীতিমালা ও সংবাদমাধ্যমে একতরফা প্রচারের যৌক্তিকতা নিয়েও। পহেলা বৈশাখে ঢাকা বিশ্বিবিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় ‘কেমন লাগছে এখানে এসে, কোনটা বেশি ভালো লাগছে?’- এমন একটি প্রশ্নের জবাবে শিশুটি বলেছে, ‘ভালো লাগছে। পহেলা বৈশাখ মানে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। পহেলা বৈশাখ মানে…।’ এরপর অবশ্য লাইভে থাকা সাংবাদিক মাইক্রোফোন সরিয়ে আরেক ব্যক্তিকে প্রশ্ন করেন। লাইভ সম্প্রচারের পর ১৭ সেকেন্ডের ওই ভিডিও ক্লিপটি নিয়ে ব্যাপক ট্রল হচ্ছে। শিশুটিকে নিয়ে নানা আপত্তিকর মন্তব্য করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, ওই ভিডিও ক্লিপের সঙ্গে কেউ কেউ আপত্তিকর মন্তব্য জুড়ে দিয়ে, ভয়েস বিকৃত করে নতুন নতুন ভিডিও তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছাড়ছে। এই পরিস্থিতিকে তিনটি দিক দিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন সাংবাদিক, শিশু মনোবিদ, ইতিহাসবিদ এবং শিক্ষাবিদরা। তা হলো- ১. সাংবাদিকতার নীতিমালা ২. শিক্ষা সংকট এবং ৩. বঙ্গবন্ধুকে এক সময় অঘোষিতভাবে নিষিদ্ধ করার পর এখন অতি প্রচার।
সাংবাদিকতার নীতিমালা কী বলছে?
গ্লোবাল টিভির প্রধান সম্পাদক সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা মনে করেন, এখানে শিশুটিকে নিয়ে ট্রল করা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। সে একটি বিষয় জানতে পারে আবার নাও জানতে পারে। যারা ট্রল করছেন তারা অন্যায় করছেন। তারা ভেবে দেখছেন না এই শিশুটি কতটা কষ্ট পাচ্ছে। তাদের পরিবার কতটা কষ্ট পাচ্ছে। তারা ভেবে দেখছেন না এটা যদি তাদের পরিবারের কাউকে নিয়ে হতো তাহলে তারা কীভাবে নিতেন। তিনি বলেন, ‘আর সাংবাদিকদের ভিতরে একটা প্রবণতা আছে তারা কোনো অনুষ্ঠানে গেলে সেটা পাবলিক পরীক্ষা হলেও শিশু দেখলেই ক্যামেরটা তার দিকে নিয়ে তাকে প্রশ্ন করা। সাংবাদিকতা নীতি অনুযায়ী শিশুদের দিকে ক্যামেরা তাক করাই একটি অনুচিত কাজ। যদি খুব প্রয়োজন হয় সাংবাদিক এবং পুলিশ যদি শিশুদের কিছু জিজ্ঞেস করতে চাইলে তার অভিবাবকের অনুমতি নিতে হবে। আবার অনেক সময় অভিবাকরাও চান তার শিশু সন্তানের ছবি বা বক্তব্য প্রচার করা হোক। এখানেও সাংবাদিকের কাজ হলো তাদের নিরুৎসাহিত করা।’ তিনি মনে করেন, ‘এজন্য প্রত্যেকটি সংবাদমাধ্যমে একটা গাইডলাইন থাকা উচিত। আর যারা ফিল্ডে কাজ করেন তাদেরও বিষয়টি জানা উচিত।’
শিশুটির ওপর মানসিক চাপ পড়ছে:
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের শিশু মনো চিকিৎসক ডা. হেলালউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমিও ভিডিওটি দেখেছি এটা সত্য, না এডিটেড আমি জানিন না। তবে এটা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল করা, শিশুটিকে প্রশ্ন করা, মূল গণমাধ্যমে দেখানো কোনোভাবেই ঠিক হয়নি। এটা শিশুর মনের ওপর একটি প্রভাব ফেলবে। এখানে শিশুটির অধিকার ক্ষুন্ন করা হচ্চে।’ তাঁর মতে, ‘এখানে শিশুটির কোনো দায় নেই। তার শিক্ষায় ত্রুটি আছে। তাকে শিক্ষার লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করা হয়েছে। তাকে যা শেখানো হচ্ছে, তার বাইরে যে আরো কিছু বিষয় নিয়ে জানা দরকার সেটা তাকে শিখানো হচ্ছে না।
সংকট কোথায়?
শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ বলেন, ‘এই দেশের জন্ম বঙ্গবন্ধুর হাতে হয়েছে, তিনি দেশের জনক- এই কথাগুলো ঠিক আছে। কিন্তু এখন একটা প্রবণতা হয়েছে যে-কোনো ভালো কিছু হলেই বঙ্গবন্ধুর নামে চালিয়ে দেয়া। এই প্রবণতার কারণে সমাজে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী, কারাগারের রোজ নামচা কত জন জানেন? এমনকি যারা তার আদর্শের অনুসারী, তাদের কতজন পড়েছেন? তার সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে তাকে শ্রদ্ধা জানাতে হবে। তাঁর সম্পর্কে না জেনে এভাবে কথা বলে লাভ নেই। তিনি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, তাঁর কাজই তাঁকে শ্রেষ্ঠ করেছে। তাঁকে নিয়ে তিনি যা করেননি তা বলার দরকার নেই।’ তিনি বলেন, ‘একসময় বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে চর্চা অঘোষিতভাবে নিষিদ্ধ ছিল। আর এখন তার সম্পর্কে না জেনে অনেকে অনেক কিছু বলছেন। তাকে ভালোভাবে জানাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ৭৫-এর ১৫ আগস্টের পর আমাদের যে প্রতিবাদ করার কথা ছিল, আমরা তখন তা করিনি। এখন আবার না জেনে অনেক কিছু বলছি।’ তার কথা, ‘ওই শিশুটির তো কোনো দোষ নেই। তাকে যেভাবে শেখানো হয়েছে, সে সেভাবেই বলেছে। কিংবা আশপাশে যেভাবে শুনেছে, সেভাবেই বলেছে।
ইতিহাসবিদ আফসান চৌধুরী মনে করেন, শিশুটি যা বলেছে এটাকে এত সিরিয়াসলি নেওয়ার কিছু নেই, ‘একটি বাচ্চা কোথা থেকে শিখেছে, কীভাবে শিখেছে জানি না। হয়তো তার পরিবার থেকে শিখেছে। তার পরিবারে ওইভাবে বলা হয়। তবে এটা নিয়ে যে পরিমাণ ট্রল হচ্ছে, হাসাহাসি হচ্ছে, এর কোনো মানে হয় না। সব বাচ্চা তো এরকম বলে না। আমরা সবাইকে এভাবে বলতে শুনিনি। ফলে ওই শিশুটি যে প্রতিনিধিত্বশীল তা বলা যাবে না। আর সাংবাদিক কেন প্রশ্ন করেছে, সেটা সে-ই বলতে পারবে।’ তিনি বলেন, ‘পহেলা বৈশাখ নিয়েও এ বছর যে পরিমাণ রাজনীতি হচ্ছে, এর আগে আমরা এত রাজনীতি দেখিনি। আমদের সময় হলে তো এটাকে (শিশুর জবাব) কেউ পাত্তাই দিতো না। সিরিয়াসলি নিতো না। এখন সমাজের মধ্যে অস্থিরতা বাড়ছে, দুশ্চিন্তা বাড়ছে, বিভিন্ন গোষ্ঠী ও দল খুব সংঘাতপূর্ণ অবস্থানে চলে যাচ্ছে, সেই জন্য এখন প্রতিটি বিষয় এবং প্রতিটি উচ্চারণই রাজনৈতিক হয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিকভাবে নেওয়া হচ্ছে।’ তাঁর কথা, ‘আমার ধারণা ওই বাচ্চাটা পহেলা বৈশাখও বোঝে না, শেখ মুজিবুর রহমানও বোঝে না। সে হয়ত তার পরিবারে বা স্কুলে যা শুনেছে, তা বলেছে। এই বাচ্চাটির কথা নিয়ে যে ট্রল বা হাসাহাসি হচ্ছে এটা বিভাজিত রাজনীতির সূচক। বাচ্চাটি কী বলেছে সেটা কোনো সূচক না। সূত্র- ডয়চে ভেলে বাংলা

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।