চুয়াডাঙ্গা মঙ্গলবার , ২৩ নভেম্বর ২০২১
আজকের সর্বশেষ সবখবর

শিক্ষার ১০ প্রকল্পে বেহাল দশা

সমীকরণ প্রতিবেদনঃ
নভেম্বর ২৩, ২০২১ ১০:৪৩ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার ১০ প্রকল্পে আশানুরূপ কোনো অগ্রগতি নেই। কোনো কোনো প্রকল্পের চার বছরের মেয়াদ শেষে অগ্রগতি মাত্র ৫ শতাংশ। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) অধীনে শিক্ষার তিনটি প্রকল্পের অগ্রগতি মেয়াদ শেষে ১০ শতাংশের নিচে। বাকিগুলোর অগ্রগতিও শোচনীয়। সবমিলে শিক্ষার নানা প্রকল্প চলছে কচ্ছপগতিতে। আশানুরূপ অগ্রগতি না থাকায় নির্ধারিত সময় শেষে চার প্রকল্পে মেয়াদ বেড়েছে এক বছর। ২০২০-২১ অর্থবছরে এডিপিভুক্ত উন্নয়ন প্রকল্পসমূহের বাস্তব ও আর্থিক অগ্রগতি নিয়ে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত পর্যালোচনা সভা থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। শিক্ষাবিদসহ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অযোগ্যতা, অদক্ষতার কারণেই এগোতে পারছে না শিক্ষার এসব প্রকল্প। ‘আইসিটির মাধ্যমে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার প্রচলন (পর্যায় ২)’ প্রকল্পটি গত জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল। গত ২০১৬ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া এ প্রকল্পে পাঁচ বছরে ব্যয় হয়েছে মোট বরাদ্দের মাত্র ৮ দশমিক ৬৪ শতাংশ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ প্রকল্পের অগ্রগতি একেবারেই হতাশাজনক। মেয়াদ শেষ হওয়ায় প্রকল্পটি আগামী বছরের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এ ছাড়া গত অর্থবছরে আরএডিপিতে (সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি) ব্যয়যোগ্য বরাদ্দ ছিল ১৯ কোটি ১৮ লাখ টাকা। এর বিপরীতে গত অর্থবছরে (মে পর্যন্ত) ব্যয় হয়েছে ১ কোটি ২৮ লাখ টাকা। যা আরএডিপিতে বরাদ্দের মাত্র ৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ। গত অর্থবছরেও এ প্রকল্পের ৯৩ দশমিক ৩২ শতাংশ অর্থ অব্যয়িত থেকে গেছে। প্রকল্পের এমন হতাশাজনক অবস্থার ব্যাপারে প্রকল্প পরিচালক ড. মোরশীদুল হাসানের কাছে জানতে চাইলে তিনি কোনো তথ্য দেননি। ‘তথ্য অধিকার আইনে’ আবেদন করতে বলেন তিনি।
পর্যালোচনা সভা থেকে জানা যায়, ২০১৭ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া ‘ঢাকা শহর সন্নিকটবর্তী এলাকায় ১০টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন’ প্রকল্প চলতি বছরের জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল। এ প্রকল্পের অগ্রগতিও হতাশাজনক। চার বছরে মোট বরাদ্দের মাত্র ৫ দশমিক ৬৯ শতাংশ অর্থ খরচ হয়েছে। এই প্রকল্পের মেয়াদও এক বছর বাড়ানো হয়েছে। গত অর্থবছরে এ প্রকল্পে আরএডিপিতে ব্যয়যোগ্য বরাদ্দ ছিল ৫৭ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এর বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ২৪ কোটি ৬৪ লাখ টাকা, যা ব্যয়যোগ্য আরএডিপি বরাদ্দের প্রায় ৪২ দশমিক ৭১ শতাংশ। গত অর্থবছরেও এ প্রকল্পের ৫৭ দশমিক ২৯ শতাংশ অর্থ অব্যয়িত থেকে গেছে। প্রকল্প পরিচালক ড. মীর জাহিদা নাজনীন বলেন, প্রকল্পের অগ্রগতি মূলত জমি অধিগ্রহণের পর মূল্য পরিশোধে। ‘সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়সমূহের উন্নয়ন’ প্রকল্প গত ২০১৭ সালে শুরু হয়। চলতি বছরের জুনে প্রকল্প কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। অথচ সাড়ে চার বছর পরে এসে এ প্রকল্পে আর্থিক অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬ দশমিক ৬৫ শতাংশ। অগত্যা প্রকল্পের মেয়াদও এক বছর বাড়াতে হয়েছে। এ ছাড়া গত অর্থবছরে আরএডিপিতে ব্যয়যোগ্য বরাদ্দ ছিল ২৫৫ কোটি টাকা। গত মে মাস পর্যন্ত এর বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ১৬০ কোটি ৯৫ লাখ টাকা, যা ব্যয়যোগ্য আরএডিপি বরাদ্দের ৬৩ দশমিক ১২ শতাংশ। প্রকল্পের এমন ধীরগতির ব্যাপারে পরিচালক অধ্যাপক মো. নাসির উদ্দিন এ প্রতিবেদককে বলেন, প্রকল্প শুরু হওয়ার দেড় বছর পরে পরিচালক (পিডি) নিয়োগ করা হয়েছে। এভাবে শুরুতেই পিছিয়ে গেছে এ প্রকল্প। এ ছাড়া করোনার কারণে দুই বছর অর্থ বরাদ্দ বন্ধ থাকায় প্রকল্পের গতি কমেছে।
‘৯টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন’ প্রকল্প গত জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল। অথচ এই প্রকল্পে গত মে পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে মোট বরাদ্দের মাত্র ১৩ দশমিক ৯ শতাংশ। সে হিসাবে ৮৬ দশমিক ১ শতাংশ বরাদ্দ অব্যয়িতই থেকে গেছে। এমন শোচনীয় অবস্থায় বাধ্য হয়ে মেয়াদ বাড়াতে হয়েছে আগামী জুন পর্যন্ত। এর মধ্যে গত অর্থবছরে আরএডিপিতে ব্যয়যোগ্য বরাদ্দ ছিল ৩৯ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। গত মে পর্যন্ত মোট বরাদ্দের ৭৩ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ ব্যয় হয়েছে। প্রকল্প পরিচালক রায়হানা তসলিম জানান, বিদ্যালয় স্থাপনের জন্য জমি অধিগ্রহণেই বড় একটি সময় চলে যায়। আর প্রকল্পের ব্যয় মূলত হয়, জমির মূল্য পরিশোধ কেন্দ্রিক। সব স্কুলের জমি অধিগ্রহণ হলে প্রকল্প ব্যয় সন্তোষজনক পর্যায়ে যাবে। গত অর্থবছরেও প্রকল্পের অগ্রগতি ৭৩ দশমিক ৫ ছিল বলে এ প্রতিবেদকের কাছে দাবি করেন তিনি। ২০১৪ সালের শুরুতে চালু হওয়া ন্যাশনাল একাডেমি ফর অটিজম ও নিউরো ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅ্যাবিলিটিস প্রকল্প শেষ হবে আগামী ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে। অথচ সাড়ে সাত বছরে এই প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে মোট বরাদ্দের মাত্র ১৫ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। অপরদিকে গত ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রকল্পের অনুকূলে আরএডিপিতে বরাদ্দ ছিল ৭ কোটি ২৭ লাখ। এর মধ্যে ব্যয় হয়েছে ৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা, যা আরএডিপি বরাদ্দের মাত্র ৪৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. ছিদ্দিকুর রহমান সম্প্রতি বলেন, অনেক প্রকল্পে পরিচালকের কর্মসূচি বাস্তবায়নে পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকে না। ফলে যারা তুলনামূলক দক্ষ ও বিচক্ষণ তারা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে পারেন। কিন্তু অন্যরা পিছিয়ে যান। এ ছাড়া যোগ্য স্থানে যোগ্য ব্যক্তিরা আসীন না হওয়ায় প্রকল্প থেকে কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া যায় না। এ শিক্ষাবিদ বলেন- প্রকল্পে অদক্ষ, অযোগ্যরা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পেলে জাতি এর সুফল পায় না; কিন্তু ঋণের বোঝা ঠিকই বাড়ে।
২০১২ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে নির্বাচিত বেসরকারি কলেজের উন্নয়ন প্রকল্প চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। এ প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে মোট বরাদ্দের ৭১ দশমিক ৫৮ শতাংশ। গত অর্থবছরে এ প্রকল্পে আরএডিপিতে ব্যয়যোগ্য বরাদ্দ ছিল ২৩৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা। এর মধ্যে গত মে পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ২১১ কোটি ৪০ লাখ টাকা। এ প্রকল্পে ৩৭ দশমিক ২৭ শতাংশ বরাদ্দই ব্যয়ের বাইরে থেকে গেছে। কারিগরি প্রকল্প জেনারেশন ব্রেক থ্রুতে (দ্বিতীয় পর্যায়) গত অর্থবছরে আরএডিপিতে বরাদ্দ ছিল ২ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। এর বিপরীতে গত মে পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা। যা বরাদ্দের ৫৫ দশমিক ১৯ শতাংশ। সভা সূত্র জানায়, গত ২০২০-২১ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে মাউশির আওতাধীন নয়টি বিনিয়োগ প্রকল্প ও একটি কারিগরি সহায়তা প্রকল্পের অনুকূলে আরএডিপিতে ব্যয়যোগ্য মোট বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ৩৮১ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এর মধ্যে প্রায় পুরো অর্থ ছাড় হলেও ব্যয় হয়েছে ১ হাজার কোটি ৮৬ লাখ টাকা। যা মোট বরাদ্দের ৭২ দশমিক ৪৪ শতাংশ। ২৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ বরাদ্দ অব্যয়িতই থেকে গেছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতির ব্যাপারে মাউশি মহাপরিচালক ড. সৈয়দ মো. গোলাম ফারুক সম্প্রতি এ প্রতিবেদককে বলেন, জমি অধিগ্রহণে বড় সময় চলে যায় কোনো কোনো প্রকল্পে। আবার কোনো প্রকল্প মামলার কারণে গতি শ্লথ হয়ে যায়। তা ছাড়া করোনার কারণে অনেকটা সময় আশানুরূপ কোনো কাজ হয়নি। কর্মকর্তাদের অযোগ্যতা, অদক্ষতা রয়েছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এভাবে তো চিহ্নিত হয়নি। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ২০১৮ সালে শুরু হওয়া ‘সরকারি কলেজে বিজ্ঞান শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ’ প্রকল্পের মেয়াদ এক বছর বাকি থাকলেও আর্থিক অগ্রগতি মাত্র ১৫ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। ‘শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে জেলা সদরে সরকারি পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কলেজের উন্নয়ন’ প্রকল্পটির মোট আর্থিক অগ্রগতি ৬৭ দশমিক ৯৮ শতাংশ বলে জানা গেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. মাহবুব হোসেন সম্প্রতি এ প্রতিবেদককে বলেন, প্রকল্পের অগ্রগতি আশানুরূপ না থাকায় অতীতে অনেক পিডিকে (প্রকল্প পরিচালককে) অপসারণ করা হয়েছে। শিক্ষার এসব প্রকল্প সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে বলা সম্ভব হবে।

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।