চুয়াডাঙ্গা বৃহস্পতিবার , ২১ জুলাই ২০২২
আজকের সর্বশেষ সবখবর

লোডশেডিং থেকে সহসা মুক্তি নেই

প্রথম দিনে ১৯১৫ মেগাওয়াট লোডশেডিং : পল্ল্নী বিদ্যুতের লোডশেডিং সবচেয়ে বেশি : কারখানায় জেনারেটর ব্যবহারের পরামর্শ
সমীকরণ প্রতিবেদনঃ
জুলাই ২১, ২০২২ ৮:৪২ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

Girl in a jacket

সমীকরণ প্রতিবেদন: বিদুতের লোডশেডিং থেকে সহসাই মুক্তি মিলছে না। সম্প্রতি রাশিয়াইউক্রেনের নতুন নতুন এলাকা দখলের ঘোষণা দেওয়ায়সেই শঙ্কা আরো বেড়েছে। কারণ যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় জ্বালানি সংকট আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এদিকে জ্বালানি সংকটের ফলে লোডশেডিং দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি গ্রামে। ২৪ ঘণ্টায় চার থেকে পাঁচ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ থাকছে না। ইতোমধ্যেই কারখানা মালিকদের ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিদ্যুতের কারণে উন্নয়ন চাকার গতি কমে আসছে। কলকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় শ্রমিক ছাঁটাইয়ের সূত্রধরে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এদিকে সমুদ্রে সৃষ্ট নিম্নচাপ আর মৌসুমি বায়ুর কারণে সারাদেশে ভ্যাপসা গরম বেড়েছে বলে আবহাওয়া অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে। যা অন্যান্য বছরের তুলনায় অনেক বেশি। গরমের মধ্যে বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের কারণে মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। যদিও গত দুই দিনে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টিপাত হয়েছে। বৃষ্টির কারণে ভ্যাপসা গরম কিছুটা কমেছে। মানুষের মধ্যে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরেছে। 

Girl in a jacket

পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, ভ্যাপসা গরমের মধ্যেই ঘন ঘন লোডশেডিং করতে হচ্ছে বিদ্যুৎ বিতরণী সংস্থাগুলোকে। যদিও এটি ইচ্ছাকৃত নয়, বাধ্য হয়েই করতে হচ্ছে। দিন যত যাচ্ছে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে বিদ্যুতের লোডশেডিং বাড়াতে হচ্ছে। মূলত জ্বালানি সংকটের কারণেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়েছে। ভারত থেকে কোনোভাবেই বিদ্যুৎ আনা যাচ্ছে না। এছাড়া বেশ কিছু বিদ্যুৎ কেন্দ্র সংস্কারের অভাবে উৎপাদনে যেতে পারছে না। ফলে দেশে চাহিদা অনুপাতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাচ্ছে না।

ুসূত্রটি বলছে, দেশে দৈনিক ৪১০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। স্থানীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে এই পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব না। এজন্য ২০১৮ সালে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করা শুরু হয়। ব্যয়বহুল এই জ্বালানির দাম বিশ্ববাজারে দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। বর্তমানে বিশ্ববাজারে প্রতি ইউনিট এলএনজির দাম ৩৮ মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। সবশেষ ২৫ ডলারে কেনা হয়েছে। দেশে দৈনিক ১০০ কোটি ঘনঘুটের সমপরিমাণ এলএনজি আমদানি ব্যবহারের সক্ষমতা ছিল। বর্তমানে তা অর্ধেকে নেমেছে। দাম বাড়ার কারণে বর্তমানে খোলাবাজার থেকে এলএনজি কেনা স্থগিত রাখা হয়েছে। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্ট সব ক্ষেত্রে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, বিদ্যুতের অস্বাভাবিক লোডশেডিংয়ের কারণে মানুষের মধ্যে চরম অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। তারা যেকোনো সময় বিদ্যুৎ অফিসে হামলা বা ভাঙচুরের মতো ঘটনা ঘটাতে পারে। এজন্য পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বিদ্যুৎ অফিস পাওয়ার পস্নান্টের নিরাপত্তার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা চাওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যেই কোনো কোনো পলস্নী বিদ্যুৎ অফিসে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।  স্থানীয় গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, প্রতিটি এলাকায় বিশেষ করে উপজেলাগুলোতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের ঘটনাকে পুঁজি করে দেশে পরিকল্পিতভাবে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা চলছে।

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দেশে বর্তমানে প্রায় ১৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে। আর বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা রয়েছে ২২ হাজার ৩৪৮ মেগাওয়াট, কিন্তু অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র অচল হয়ে পড়ায় উৎপাদন করতে পারছে না। প্রতিদিন প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং হচ্ছে। বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের মাত্রা হিসাব করলে দেশে বিদ্যুতের ঘাটতির পরিমাণ প্রায় আড়াই হাজার মেগাওয়াট। জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সপ্তাহে একদিন জ্বালানি পাম্প বন্ধ রাখার চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। শিল্প পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ঈদের সময় সব শ্রমিক ছুটিতে ছিলেন। ঈদ শেষে তারা কর্মস্থলে ফিরেছেন। ফলে কলকারখানা নতুন করে চালু হয়েছে। তবে জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কারখানা মালিকদের ডিজেলচালিত জেনারেটর দিয়ে কারখানা চালানোর কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু জেনারেটর চালাতেও ডিজেল, পেট্রল বা অকটেনের প্রয়োজন। তবে অধিকাংশ কারখানাতেই গ্যাস জেনারেটর আছে।

দায়িত্বশীল একজন পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, গ্যাস সংকট হওয়ায় অনেক কারখানার গ্যাস জেনারেটর বন্ধ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে কারখানার উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সব মেশিন যদি জ্বালানি সংকটের কারণে সচল রাখা সম্ভব না হয়, তাহলে অনেক অর্ডার ঠিকমতো ডেলিভারি দিতে পারবে না। এমন পরিস্থিতিতে কারখানা থেকে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের মতো ঘটনা ঘটতে পারে। কারণ উৎপাদিত পণ্য বিক্রি না হলে টাকা আসবে না। টাকা ছাড়া শ্রমিকের বেতনভাতা দেওয়া সম্ভব হবে না। তখন হয়তো শ্রমিক আন্দোলন হওয়াও বিচিত্র নয়। আমাদের আঞ্চলিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জেলা পর্যায়ের চেয়ে গ্রামের অবস্থা সবচেয়ে বেশি খারাপ। গ্রামে ২৪ ঘণ্টায় গড়ে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ থাকছে না। এমন পরিস্থিতিতে গ্রামের মানুষ রীতিমতো ক্ষেপে আছে। অনেক পলস্নী বিদ্যুৎ অফিসের কর্মকর্তাকর্মচারীরা অফিস ছেড়ে নিরাপদ জায়গায় অবস্থান করছেন। বিদ্যুতের মিটার রিডাররাও ভয়ে মিটারের রিডিং নিতে যাচ্ছেন না। লুকিয়ে লুকিয়ে বিদ্যুতের মিটারের রিডিং নিয়ে আসছেন। তাও আবার মনগড়া রিডিং নিয়ে আসছেন। একদিকে বিদ্যুৎ থাকছে না, তার ওপর ইচ্ছামতো বিদ্যুতের বিল ধার্য করা হচ্ছে।

প্রথম দিনে ১৯১৫ মেগাওয়াট লোডশেডিং

এদিকে বিদ্যুতের ঘাটতি মোকাবিলায় অপচয় রোধ বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে মঙ্গলবার থেকে রাজধানীসহ সারাদেশে এলাকাভিত্তিক লোডশেডিং চলছে। প্রথম দিনের শিডিউল লোডশেডিংয়ে সারাদেশে হাজার ৯১৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ লোডশেডিং হয়েছে বলে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সূত্রে জানা গেছে। গতকাল বুধবার সকালে পিডিবির জনসংযোগ বিভাগের সদ্য পদোন্নতিপ্রাপ্ত পরিচালক শামীম হাসান বলেন, প্রতিদিন একই পরিমাণে লোডশেডিং হবে বিষয়টা এমন নয়। আমাদের পরিস্থিতি বুঝে কম বেশি করার প্রয়োজনও হতে পারে। যতটুকু লোডশেডিং হবে, আমরা ততটুকুকেই সাশ্রয় হিসেবে ধরব। পিডিবি সূত্রে জানা গেছে, লোডশেডিংয়ের প্রথম দিন ১৪ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ১২ হাজার ৪৪২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে। চাহিদা সরবরাহের মধ্যে ব্যবধান মেটাতে হাজার ৯১৫ মেগাওয়াট লোডশেডিং করার পরিকল্পনা ছিল। যেটি বাস্তবায়ন হয়েছে। এর আগে গত সোমবার (১৮ জুলাই) প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা ডক্টর তৌফিকইলাহী চৌধুরী জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় ১৯ জুলাই থেকে রাজধানীসহ সারাদেশে দৈনিক দুই ঘণ্টা এলাকাভিত্তিক লোডশেডিং কার্যকর করার পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেন। পরবর্তী সময়ে তা কমিয়ে দৈনিক এক ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের সংশোধিত সিদ্ধান্তের কথা সাংবাদিকদের জানান বিদ্যুৎ, জ্বালানি খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে পরীক্ষামূলক ভিত্তিতে দৈনিক এলাকাভিত্তিক এক ঘণ্টার লোডশেডিং দেওয়া হবে। এক সপ্তাহ পর প্রয়োজনে আমরা সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করব।

Girl in a jacket

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।