চুয়াডাঙ্গা বৃহস্পতিবার , ১১ জুন ২০২০
আজকের সর্বশেষ সবখবর

লাশের হদিস মেলেনি, নিহতের জন্য গায়েবানা জানাযা

সমীকরণ প্রতিবেদন
জুন ১১, ২০২০ ৯:১৭ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

ফরিদপুরে ট্রলারডুবিতে আলমডাঙ্গার ৩ দিনমজুর নিহত, পরিবারগুলোর পাশে ইউএনও
আলমডাঙ্গা অফিস:
ফরিদপুর জেলায় দিনমজুরের কাজ করতে গিয়ে ট্রলারডুবিতে নিহত হয়েছেন আলমডাঙ্গা উপজেলার হোসেনপুর গ্রামের ৩ দিনমজুর। সাঁতরে জীবন নিয়ে ফিরেছেন একই গ্রামের আরও ৩ দিনমজুর। নিহত দিনমজুরদের পরিবারে এখন শোকের মাতম চলছে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির মৃত্যুতে অসহায় হয়ে পড়েছে পরিবারগুলো।
সাঁতার কেটে বেঁচে যাওয়া দিনমজুরদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আলমডাঙ্গা উপজেলার হোসেনপুর গ্রামের ৬ দিনমজুর গত ৩১ মে কাজের সন্ধ্যানে জেলা ফরিদপুরের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান। ফরিদপুর পৌঁছে তাঁরা সকলে ফরিদপুর বাইপাস সড়কের আদমহাটে উপস্থিত হন। সেখানে ফরিদপুর সদর উপজেলার মোহাম্মদপুর খারকান্দি গ্রামের লালন ফকির নামের এক ব্যক্তি তাদেরকে দৈনিক ৬ শ টাকা হিসেবে বাদাম তুলতে শ্রমিক নিয়োগ করেন। লালন ফকিরের জমি পদ্মা নদীর ওপারে অবস্থিত। প্রতিদিন ছোট ট্রলারে করে লালন ফকিরের ছেলে শাকিল ফকির শ্রমিকদের পদ্মার ওপারে বাদাম খেতে নিয়ে যাওয়া আসা করতেন। গত ৫ মে মোট ২৭ জন দিনমজুর ট্রলারে তুলে নিয়ে শাকিল ফকির পদ্মার ওপারে নিয়ে যাচ্ছিলেন। ছোট ট্রলারে অতিরিক্ত যাত্রী তোলায় নদীর মাঝামাঝি শয়তানখালির ঘাট বরাবর ট্রলারটি পানিতে ডুবে যায়। কিছুক্ষণের ব্যবধানে ঘটনাস্থলে আরেকটি ট্রলার উপস্থিত হলে অনেকে সাঁতার কেটে ট্রলারে উঠে জীবন বাঁচান। তাঁরাও কোনো রকম সাঁতার কেটে ট্রলাবে উঠে জীবন বাঁচাতে সক্ষম হন। কিন্তু তীব্র স্রোতের পানিতে ডুবে হারিয়ে যান তাঁদের সঙ্গে থাকা আলমডাঙ্গা হোসেনপুরের ৩ জনসহ ৫ দিনমজুর। পানিতে ডুবে নিহত হোসেনপুরের এ তিনজন দিনমজুর হলেন, নূরুল হকের ছেলে ২ সন্তানের জনক শাহাবুল হক (৩২), আয়নাল হকের ছেলে শিলন (২৫) ও তারাচাঁদ মন্ডলের ছেলে ২ সন্তানের জনক আব্দুর রাজ্জাক (৫০)। এছাড়া জীবন বাঁচিয়ে বাড়ি ফিরেছেন একই গ্রামের আজিজুল হকের ছেলে একরামুল হক (৩৮), হানেফ মণ্ডলের ছেলে মোমেন হক (২৫) ও লস্কর মন্ডলের ছেলে আমজেদ আলী (৩৫)। স্রোতের তোড়ে হারিয়ে যাওয়া ৩ দিনমজুরের লাশের হদিস এখানো পাওয়া যায়নি। সে কারণে গতকাল গ্রামবাসি ৩ দিনমজুরের গায়েবানা জানাযা করেছেন।
এদিকে, যার খেতে কাজ করতে গিয়ে এই দুর্ঘটনা ঘটে, ফরিদপুর জেলার সেই লালন ফকির নিহতদের কোনো আর্থিক সহযোগিতা করেননি বলে নিহতদের পরিবার জানায়। অতিরিক্ত যাত্রী ট্রলারে ওঠানোর ফলে ট্রলারডুবির ঘটনা ঘটলেও ট্রলারের মালিক ও চালক শাকিল ফকিরও কোনো দায় নেননি। তিনিও নিহতদের পরিবারের কোনো খোঁজ নেননি বলেও জানা যায়।
মোবাইলফোনে কথা হয় ফরিদপুর জেলার চর নাসিরপুর ইউনিয়নের সংশ্লিষ্ট মেম্বার রিপন ফকিরের সঙ্গে। তিনি জানান, ট্রলারডুবির সংবাদ পেয়ে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়েছিলেন। সে সময় পুলিশ লালন ফকিরকে আটক করে জেলহাজতে প্রেরণ করেছে।
সরেজমিন হোসেনপুর গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, নিহত ৩ হতদরিদ্র দিনমজুরের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। নিহত শাহাবুল হকের দেড় বছরের শিশুকন্যা ক্রন্দনরত মা ও দাদাদাদির মুখের দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখা গেছে। এখনও এ অবুঝ শিশুটি বুঝতে শেখেনি কী মূল্যমান সম্পদ সে চিরদিনের জন্য হারিয়েছে। শাহাবুল হকের বৃদ্ধ বাপ-মায়ের আহাজারিতে বাড়ির বাতাস ভারি হয়ে আছে। নিহত যুবক শিলনের স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা। তিনি এখনও মাঝে মধ্যেই মুর্ছা যাচ্ছেন। তিনি নিজের ও অনাগত সন্তানের ভবিষ্যতের আশঙ্কায় ডুকরে ডুকরে কাঁদছেন। কাদঁছেন তার মা-বাপ ও ভাইবোন। অনুরূপে, বিলাপ করতে দেখা গেছে নিহত দিনমজুর আব্দুর রাজ্জাকের স্ত্রী ও মা-বাপকে। ঘরের ভেতর থেকে ফুঁফিয়ে ফুঁফিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বের হয় আব্দুর রাজ্জাকের এক মাত্র ছেলে। নিহত ৩ দিনমজুরের পরিবারে শুধু তারাই ছিলেন একমাত্র উপার্জনক্ষম। ফলে অভাবের সংসারে অজানা ভবিষ্যতের আতঙ্কের ছায়া ছিল সবার চোখে মুখে।
আলমডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লিটন আলী নিহত ৩ দিনমজুরের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেছেন ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেছেন। তিনি উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সাধ্যমত আর্থিক সহযোগিতার আশ্বাস দেন। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা প্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করতেও চেষ্টা করবেন বলে জানান।

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।