‘লকডাউন’ বাড়ছে এক সপ্তাহ, ঈদের আগে খুলতে পারে শপিংমল-মার্কেট

21

করোনা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ফল পেতে জাতীয় পরামর্শক কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত
সমীকরণ প্রতিবেদন:
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে চলমান ‘লকডাউনের’ (বিধিনিষেধ) মেয়াদ একই শর্তে এক সপ্তাহ বাড়িয়ে আগামী ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন সাপেক্ষে গতকাল এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হতে পারে। তবে অর্থনৈতিক ক্ষতি বিবেচনায় জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে ঈদের আগেই লকডাউন শিথিলের চিন্তাভাবনাও করছে সরকার। এক্ষেত্রে শপিংমল ও মার্কেটসহ দোকানপাট খোলা রাখা হতে পারে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
সূত্র আরও জানায়, লকডাউনের মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে গতকাল সোমবার বেলা ১১টার দিকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের উদ্যোগে আন্তঃমন্ত্রণালয় ভার্চুয়াল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানেই চলমান লকডাউনের মেয়াদ আরও এক সপ্তাহ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়। কোভিড-১৯ সংক্রান্ত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সুপারিশের আলোকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। করোনা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ফল পেতে টানা দুই সপ্তাহের ‘লকডাউনের’ সুপারিশ করে এই কমিটি।
চলমান আট দিনের ‘লকডাউনে’ শিল্পকারখানাসহ জরুরি সেবা ছাড়া সরকারি ও বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠান, গণপরিবহণ, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল বন্ধ রয়েছে। সীমিত পরিসরে দেওয়া হচ্ছে ব্যাংকিং সেবা। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হওয়াও নিষেধ। আর খোলা স্থানে কাঁচাবাজার এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি কেনাবেচা চলছে সকাল ৯টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত। গত ১৪ এপ্রিল থেকে এসব বিষয়সহ ১৩ দফা বিধিনিষেধ কার্যকর রয়েছে, যা ২১ এপ্রিল মধ্যরাত পর্যন্ত চলবে। সেই হিসাবে চলমান ‘লকডাউন’ এক সপ্তাহ বাড়ানো হলে সেটি ২২ এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়ার কথা। এদিকে চলমান ‘লকডাউন’ বাড়ানোর সিদ্ধান্তে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটের সিডিউল ফ্লাইট চলাচল আরও এক সপ্তাহের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ।
‘লকডাউনের’ মেয়াদ বাড়ানো প্রসঙ্গে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন বলেন, ‘কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটি ‘লকডাউনের’ মেয়াদ আরও সাত দিন বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। সায়েন্টিফিক্যালি তো ১৪ বা ১৫ দিন ‘লকডাউন’ না-হলে সংক্রমণের চেইনটা পুরোপুরি ভাঙা সম্ভব হয় না। সেই পরিপ্রেক্ষিতে সিদ্ধান্ত হয়েছে আগামী ২২-২৮ এপ্রিল পর্যন্ত আগের শর্ত মেনে ‘লকডাউন’ কন্টিনিউ (অব্যাহত) করবে। বিধিনিষেধ আরও সাত দিন বাড়ল। প্রধানমন্ত্রীর কাছে সামারি পাঠানো হয়েছে। তিনি অনুমোদন দিলে প্রজ্ঞাপন জারি হয়ে যাবে।’
ফরহাদ হোসেন আরও বলেন, ‘সংক্রমণ ম্যানেজ করাটা আমাদের উদ্দেশ্য, ব্যবসায়ীরা যাতে ঈদের ব্যবসাটা করতে পারেন, সেটা মাথায় রেখে এখন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে পরিস্থিতি কী হয়, সেটা বিবেচনা করেই পরে সিদ্ধান্ত হবে। আমরা মনে করছি, আরও (লকডাউন) সাত দিন দিলে সংক্রমণটা অনেকটা নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। তবে এর মধ্যে কঠোর স্বাস্থ্যবিধিটা মানার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। মাস্ক পরার অভ্যাসটা সবাইকে গড়ে তুলতে হবে। যতদিন-না স্থায়ী সমাধান হচ্ছে, ততদিন প্রত্যেক ব্যক্তিকে বাইরে এলে মাস্ক পরতে হবে। আমরা আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের অবস্থা দেখছি। স্বাস্থ্যবিধি মানলেই আমরা এটা ম্যানেজ করতে পারব।’
এর আগে গতকাল সোমবার নিজের সরকারি বাসভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, “বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে সরকার সারা দেশে আরও এক সপ্তাহ ‘লকডাউন’ বাড়ানোর সক্রিয় চিন্তা করছে। পাশাপাশি জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে সরকার ঈদের আগে লকডাউন শিথিলের চিন্তাভাবনা করছে। ঈদের সময় ঘরমুখো মানুষের যাতায়াতের জন্য ‘লকডাউন’ শিথিল হতে পারে। মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকুন ও ধৈর্য ধরুন।”
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের উদ্যোগে আন্তঃমন্ত্রণালয় ভার্চুয়াল বৈঠকে উপস্থিত থাকা প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সুরথ কুমার সরকার সোমবার সন্ধ্যায় বলেন, ‘চলমান লকডাউনের মেয়াদ একই শর্তে আরও এক সপ্তাহ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে বৈঠকে। সেখানে বিজেএমইএ এবং বিকেএমইএর নেতারা ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষতি হচ্ছে বলে আর্জি করেছেন। তাদের বলা হয়েছে, পরিস্থিতি বিবেচনা করে ঈদের আগে লকডাউন শিথিল করা হবে। আমার মনে হয়, অর্থনৈতিক ক্ষতি পোষাতে ঈদের আগেই দোকানপাট খুলে দেওয়া হতে পারে। তবে এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট করে কোনো কিছু বলা হয়নি।’ কখন প্রজ্ঞাপন জারি হবে-এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধান তথ্য কর্মকর্তা বলেন, ‘আজ (গতকাল সোমবার) তো এখনো হলো না। তবে কাল (আজ মঙ্গলবার) প্রজ্ঞাপন হয়ে যাবে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানান, চলমান লকডাউন এক সপ্তাহ বাড়ানোর বিষয়সহ বৈঠকের সারসংক্ষেপ প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে। দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির বিষয় বিবেচনা করে শপিংমল ও দোকানপাট স্বাস্থ্যবিধি মেনে কিছু সময়ের জন্য খোলা রাখা যায় কি না, সে ব্যাপারে ব্যবসায়ী নেতারা সুপারিশ করেছেন। সে বিষয়টিও সারসংক্ষেপে উল্লেখ রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি বিবেচনা করলে বা এ ব্যাপারে সায় দিলে নতুন কোনো নির্দেশনাও আসতে পারে। মূলকথা, সবকিছুই প্রধানমন্ত্রীর ওপর নির্ভর করছে।
জাতীয় কমিটির বৈঠক:
কোভিড ১৯ সংক্রান্ত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির ৩১তম সভা জুমের মাধ্যমে রোববার রাতে অনুষ্ঠিত হয়েছে। কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সহিদুল্লা সভায় সভাপতিত্ব করেন। সভায় জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি কমপক্ষে দুই সপ্তাহের জন্য পূর্ণ লকডাউন সুপারিশ করে। সরকার ইতোমধ্যে ১৪ এপ্রিল থেকে এক সপ্তাহের লকডাউন ঘোষণা করেছে। কমিটি এতে সন্তোষ প্রকাশ করে। যদিও বৈজ্ঞানিকভাবে দুই সপ্তাহের কম লকডাউনে কার্যকর ফলাফল আশা করা যায় না। কমিটি আরও এক সপ্তাহের জন্য কঠোর লকডাউনের সুপারিশ করে। পরবর্তী সপ্তাহ শেষ হওয়ার আগে সংক্রমণের হার বিবেচনা করে পুনঃসিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষযটি উল্লেখ করে ধীরে ধীরে লকডাউন শেষ করার পূর্বপরিকল্পনা প্রস্তুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়।
সভায় দেশের অর্থনীতি সচল রাখার স্বার্থে শিল্প-কলকারখানা খোলা রাখার বিষয়ে আলোচনা হয়। তবে, বেসরকারি দপ্তর, ব্যাংক খোলা রাখা, ক্রমবর্ধমানভাবে ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচল, ইফতারি বাজারে অনাকাক্ষিত ও অপ্রয়োজনীয় ভিড় লকডাউনের সাফল্যকে অনিশ্চিত করে দেবে বলে মনে করেন তারা। এক্ষেত্রে স্বাস্থ্য, ফায়ার সার্ভিস ও অন্যান্য জরুরি সেবা ছাড়া সবকিছু বন্ধ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। পাশাপাশি কমিটি খোলা রাখা জরুরি সেবার তালিকা প্রকাশ করার অনুরোধ করে। অন্যথায় বিরূপ পরিস্থিতির আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়। উদাহরণ হিসাবে চলমান লকডাউনে চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের ডিউটির জন্য চলাচলে বাধা ও অনাকাক্ষিত ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়।
ডিএনসিসি কোভিড হাসপাতাল চালু হওয়ায় সরকারকে অভিনন্দন জানিয়ে কমিটি রোগী ভর্তির বাড়তি চাপ থাকায় দ্রুত আরও সক্ষমতা বাড়াতে জোর দেন। এ ছাড়া কমিটি বলে, করোনা রোগী দ্রুত শনাক্ত করা সংক্রমণ প্রতিরোধের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সরকার ল্যাবরেটরির সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য কাজ করছে। কিন্তু সাম্প্রতিককালে নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে। নমুনা সংগ্রহ সহজ ও রোগীদের হাতের নাগালের মধ্যে আনতে শহরাঞ্চলে প্রতি ওয়ার্ডে নমুনা সংগ্রহের বুথ স্থাপন করতে পরামর্শ দেন। রিপোর্ট দ্রুত দিতে নমুনা সংগ্রহ বুথে র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন টেস্ট করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
নমুনা পরীক্ষা সহজলভ্য করতে ইতোমধ্যে সরকারি নমুনা পরীক্ষা বিনা মূল্যে করার পরামর্শ দিয়েছে জাতীয় কমিটি। পিসিআর টেস্ট কিটের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় বেসরকারি পরীক্ষাগারে নমুনা পরীক্ষার মূল্য পুননির্ধারণের পরামর্শ দেওয়া হয়। যাতে পরীক্ষার সংখ্যা বাড়ে এবং সাশ্রয়ীমূল্যে পরীক্ষা করা যায়।
কমিটির পক্ষ থেকে সরকারি-বেসরকারি সব হাসপাতাল, ক্লিনিকে গর্ভবতী করোনা/নন-করোনা মা-দের চিকিৎসাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে অনুরোধ করা হয়। করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালে অবশ্যই গর্ভবতী মা-দের সেবার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। নতুন ডিএনসিসি হাসপাতালে গর্ভবতী মা-দের একটা কর্নারে বিশেষায়িত (আইসিইউ) ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য অনুরোধ করা হয়। প্রতিটি হাসপাতাল তার নিজস্ব সক্ষমতা অনুযায়ী চেইন অব রেফারেন্স সিস্টেম মেনে চলবেন। সভার শুরুতে কোভিড-১৯-এ সংক্রমিত হয়ে যারা মৃত্যুবরণ করেছেন তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করা হয়।
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে বাড়তে থাকায় এর আগে গত ৫ এপ্রিল ভোর ৬টা থেকে ১৪ এপ্রিল ভোর ৬টা পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা ছিল। তবে গণপরিবহণ, মার্কেট খোলা রেখে ওই নিষেধাজ্ঞা ছিল অনেকটাই অকার্যকর। এমন পরিস্থিতিতে কোভিড-১৯ মোকাবিলায় সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা এলাকায় দুই সপ্তাহ পূর্ণ লকডাউনের সুপারিশ করে জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি। তাদের সুপারিশের ভিত্তিতে ১৪ এপ্রিল থেকে নতুন করে কঠোর বিধিনিষেধ ‘লকডাউন’ ঘোষণা করা হয়। যেটি চলমান।