রোহিঙ্গা প্রশ্নে এনএলডির নীতি বদল

37

বাংলাদেশকে কৌশলী হতে হবে
রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে মিয়ানমার সরকার কোনো প্রতিশ্রুতি এ পর্যন্ত দেয়নি। ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসি (এনএলডি) নেত্রী অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন সরকার একধরনের প্রতারণায় লিপ্ত হয়েছিল। সু চি সরাসরি গণহত্যা ও রোহিঙ্গা বিতাড়নের জন্য অভিযুক্ত দেশের সামরিক বাহিনীকে সমর্থন করেছেন। এর পরও তার কাছ থেকে সামরিক বাহিনী শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছে। পটপরিবর্তনের মধ্যে সু চি আবার অন্তরীণ হয়েছেন। তার দলের নেতারা পালিয়ে থেকে ‘জাতীয় ঐক্যের’ ছায়া সরকার গঠন করেছে। এই ছায়া সরকারের পক্ষ থেকে প্রথমবারের মতো রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার ফিরিয়ে দেয়ার প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করা হয়েছে। এরাই ক্ষমতায় থাকতে রোহিঙ্গাদের প্রতি কোনো ধরনের দায় বোধ করেনি। এ অবস্থায় বাংলাদেশকে নিপীড়িত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ও বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে কৌশল নির্ধারণ করতে হবে, নতুন অবস্থান নিতে হবে।
গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের বুলি আওড়ানো এনএলডির নৈতিক অবস্থান এই নতুন ছায়া সরকারের বর্তমান অবস্থান থেকে আমরা আঁচ করতে পারি। সামরিক বাহিনীর জাঁতাকলে পিষ্ট হওয়ার পর তারা রোহিঙ্গাদের অধিকারের ব্যাপারটি উপলব্ধি করতে পেরেছে। তারা এখন টের পাচ্ছে রোহিঙ্গা নয়, মিয়ানমারের জন্য শত্রু তাদের নিজেদের সামরিক বাহিনী নিয়ন্ত্রিত জান্তা। ছায়া সরকার ইতোমধ্যে মিয়ানমারের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীকে নিয়ে সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে একটি মৈত্রী গড়ে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গোষ্ঠী এই ছায়া সরকারের প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশকে নতুন করে তার নীতি কৌশল প্রণয়ন করতে হবে। ঐক্য সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে বাংলাদেশের সমর্থন আদায়। অন্য দিকে বাংলাদেশকে বিবেচনা করতে হবে এরাই ক্ষমতায় থাকাকালে রোহিঙ্গা ইস্যু সমাধানে কোনো অঙ্গীকার প্রতিশ্রুতি পালন করেনি।
গত সপ্তাহের শেষে ছায়া সরকারের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে একটি বিবৃতি দেয়া হয়েছে। সেখানে তারা রোহিঙ্গাদের প্রতি স্পষ্ট অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। তারা বলেছে, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন করবে, তাদের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেবে। এমনকি তারা ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি ব্যবহার করতেও আর কোনো কার্পণ্য বোধ করেনি। অথচ এনএলডি সরকার বাংলাদেশকেও বাধ্য করেছিল তারা যাতে ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি ব্যবহার না করে। বাংলাদেশ তাদের কথামতো রোহিঙ্গাদের পরিচয় দিয়েছিল ‘রাখাইনে বসবাসকারী মুসলিম’ হিসেবে। অধিকার ফিরিয়ে দেয়ার এমন পুরো বিপরীত অবস্থান কেন সেটি বুঝতে অসুবিধা হয় না। বিবৃতিতে তারা রোহিঙ্গাদের কাছে সরাসরি আহ্বান জানিয়েছে, তারা যেন সামরিক জান্তা হটানোর চলমান লড়াইয়ে অংশ নেয়। এখন সু চির এনএলডি যেকোনোভাবে হোক সামরিক জান্তাকে পরাস্ত করতে চায়। এ জন্য রোহিঙ্গাদের শক্তিকেও ব্যবহার করতে চায়। উদ্ভব হওয়া নতুন পরিস্থিতিতে তার এমন নীতি পরিবর্তন। আবার নতুন কোনো পরিস্থিতি উদ্ভব হলে তারা যে এ প্রতিশ্রুতিও ভঙ্গ করবে না তার নিশ্চয়তা নেই।
উদ্ভূত নতুন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ কী করবে, সে প্রশ্ন সামনে এসেছে। এক দিকে সামরিক জান্তা চায় প্রতিবেশী বাংলাদেশ তাদের সমর্থন করুক। এখন প্রতিবেশী হিসেবে জান্তা সরকারের জন্য বাংলাদেশের গুরুত্ব অনেক বেশি। অন্য দিকে ছায়া সরকার রোহিঙ্গাদের প্রতি যেসব প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে বাংলাদেশের চাওয়াও একই রকম। মনে রাখতে হবে, মিয়ানমারে সামরিক জান্তা এবং সু চির গণতন্ত্রপন্থীরা কেউই রোহিঙ্গাদের মানবাধিকারসহ বেঁচে থাকার ন্যূনতম অধিকারের স্বীকৃতি আগে দেয়নি। এ অবস্থায় বাংলাদেশকেও তার স্বার্থসিদ্ধির পথে হাঁটতে হবে। ইতোমধ্যে বিপুল রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী এ দেশের উন্নয়ন অগ্রগতি ও শান্তির জন্য বাধা হিসেবে দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশের প্রধান অগ্রাধিকার হবে এই বিপুল রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো। এমনকি তারা যাতে আর কখনো উৎখাত হয়ে ফিরে না আসে সে জন্য তাদের মৌলিক মানবাধিকারের নিশ্চয়তা বিধান করা জরুরি। তাই কোনো পক্ষকে সমর্থন করার পরিবর্তে বাংলাদেশকে এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে অগ্রসর হতে হবে। মিয়ানমার যেমন রোহিঙ্গাদের নিয়ে নিষ্ঠুর অন্যায্য নীতি অবলম্বন করেছে এর বিপরীতে বাংলাদেশকে নিতে হবে যেকোনো মূল্যে তাদের সেখানে প্রতিষ্ঠিত করার নীতি।