রোহিঙ্গা নিধন : ১৩ সেনা কর্মকর্তার বিচার হোক

420

মিয়ানমারে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর চালানো গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও জাতিগত নিধনযজ্ঞের অভিযোগ ক্রমেই জোরদার হচ্ছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) অভিযুক্তদের বিচারের দাবিও প্রবল হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর এসব অভিযোগের সপক্ষে অনেক তথ্য-প্রমাণ তুলে ধরেছে। এসব তথ্য-প্রমাণে দেখা যায়, দেশটির ৩৩ ও ৯৯ ডিভিশন মূলত রোহিঙ্গাবিরোধী অভিযান চালায়। একটি ডিভিশনের প্রধানকে এর মধ্যে বরখাস্তও করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের গত বুধবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে নাম উল্লেখ করে বলা হয়, মিয়ানমারের সেনাপ্রধান অং মিন হ্লিয়াংসহ ১৩ জন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রোহিঙ্গা নিধনে সমন্বয়কের ভূমিকায় ছিলেন। অ্যামনেস্টির প্রতিবেদনে অভিযুক্ত সেনা কর্মকর্তাদের আইসিসিতে বিচারের দাবি জানানো হয়। ফলে বিষয়টি পাশ কাটিয়ে যাওয়া মিয়ানমারের জন্যও ক্রমে কঠিন হয়ে উঠছে।
মিয়ানমারে দীর্ঘ সেনাশাসনের সময়ই রোহিঙ্গা সংকটের শুরু। আইন করে নাগরিকত্ব বাতিল করা এবং পরিকল্পিত হত্যা-নির্যাতন চলতে থাকে। এসব কারণে গত চার দশকে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে চলে আসে। সবচেয়ে বর্বর নির্যাতন শুরু হয় ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে। এরপর আরো সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়। কয়েক হাজার রোহিঙ্গাকে এ সময় হত্যা করা হয়, তাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়, বুলডোজার-ট্রাক্টর চালিয়ে বাড়িঘরের চিহ্ন পর্যন্ত মুছে দেওয়া হয় এবং বহু রোহিঙ্গা নারী ধর্ষণের শিকার হয়। আক্রান্ত জনগোষ্ঠী, সাবেক সেনা কর্মকর্তা, রাখাইনের অধিবাসীসহ অনেকের ভাষ্য, গুরুত্বপূর্ণ নথি ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উঠে আসা কথোপকথনের সূত্র ধরে তৈরি করা রয়টার্সের প্রতিবেদনে সেনাবাহিনীর বহু নিষ্ঠুরতার চিত্র উঠে এসেছে। ফেসবুকে দেখা যায়, এক জুনিয়র সেনা কর্মকর্তা তাঁর বন্ধুকে লিখেছেন, রাখাইনে যাচ্ছি। তাঁর বন্ধু জানতে চাইছেন, বাঙালির মাংস খেতে? একেবারে সাফ করে দিস। উত্তর, চেষ্টা করব। অনেকে ঘৃণাভরে রোহিঙ্গাদের ‘কালার’ বলে আখ্যায়িত করে। হামলার পর পালাতে থাকা রোহিঙ্গাদের ছবি পোস্ট করে মজা করা হয়। অগ্নিকা- কিংবা হত্যাপূর্ব দৃশ্যও দেখা গেছে ফেসবুকে। আন্তর্জাতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করে মিয়ানমারের সরকার বাংলাদেশ ও জাতিসংঘের সঙ্গে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিষয়ে চুক্তি করতে বাধ্য হয়েছে। এতেও ক্ষুব্ধ দেশটির সেনাবাহিনী। ফলে সরকার ও সেনাবাহিনীর সম্পর্ক ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। থাইল্যান্ডের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা ব্যাংকক পোস্টের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সম্পর্ক এখন বিপজ্জনক মোড় নিয়েছে। সেনা কমান্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত একাধিক সূত্রের উল্লেখ করে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা সু চির সঙ্গে সেনাপ্রধানের এক বৈঠকে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়েছে এবং আবার সেনা অভ্যুত্থানের হুমকি দেওয়া হয়েছে। মিয়ানমারে এটা অসম্ভব কোনো ঘটনা নয়। এ অবস্থায় বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এ ক্ষেত্রে আরো দৃঢ় ভূমিকা নিতে হবে। মানবতার স্বার্থে মিয়ানমারের উদ্ধত জেনারেলদের যথাযথ বিচারের আওতায় আনতে হবে। রোহিঙ্গাদের দ্রুত তাদের নিজ ভূমিতে পুনর্বাসন করতে হবে।