চুয়াডাঙ্গা সোমবার , ৩ অক্টোবর ২০২২
আজকের সর্বশেষ সবখবর

রেমিট্যান্স রফতানিতে ধস

চাপের মুখে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ : রেকর্ড বাণিজ্য ঘাটতি দুই মাসে
সমীকরণ প্রতিবেদনঃ
অক্টোবর ৩, ২০২২ ৯:২২ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

Girl in a jacket

সমীকরণ প্রতিবেদন: ডলারের মূল্য কমানোয় আশঙ্কা করা হচ্ছিল রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাবে। আর এটিই বাস্তব হলো বিদায়ী মাসে। গত সেপ্টেম্বরে দেশে রেমিট্যান্স আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ১১ শতাংশ কমে ১৫৩ কোটি ৯০ লাখ ডলারে নেমে এসেছে। গত আগস্ট মাসেও রেমিট্যান্স এসেছিল ২০৩ কোটি ৭০ লাখ ডলার। রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাওয়ার পাশাপাশি রফতানি আয়ও কমতে শুরু করেছে। ইপিবির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরে রফতানি আয়ের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ঋণাত্মক ৬.২৫ শতাংশ।

এ দিকে রেমিট্যান্স ও রফতানি আয় কমে যাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার মজুদের ওপর চাপ আরো এক ধাপ বেড়ে গেল বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তারা বলছেন, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাস অর্থাৎ জুলাই ও আগস্টে রেমিট্যান্স ও রফতানি আয় বাড়ার পরও চাহিদা বেশি থাকায় বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ কমে গেছে। প্রায় প্রতিদিনই সঙ্কটে পড়া ব্যাংকগুলোর কাছে ডলার বিক্রি করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ সুবাদে বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ ৩৬ বিলিয়ন ডলারের ঘরে নেমে আসে, যেখানে গত বছরের আলোচ্য সময়ে রিজার্ভ ছিল ৪৬.২৮ বিলিয়ন ডলার। অর্থবছরের তৃতীয় মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহ ও রফতানি আয় কমে যাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চলমান চাপ আরো এক ধাপ বেড়ে যাবে।

Girl in a jacket

বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমাতে আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নানা পদক্ষেপ বাস্তবায়ন হচ্ছে। বেশির ভাগ পণ্যের আমদানিতে এলসি মার্জিন তুলে দেয়া হয়েছে; অর্থাৎ পণ্য আমদানিতে আমদানিকারকদের শতভাগ ব্যয় মেটাতে হচ্ছে। একই সাথে ৩০ লাখ ডলারের পণ্য আমদানির জন্য এলসি খোলার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তদারকি করা হচ্ছে। এর পরও আমদানির ব্যয়ের প্রবৃদ্ধি জুলাই-আগস্টে ১৭ শতাংশে রয়ে গেছে, যদিও গত জুনে এই প্রবৃদ্ধি ছিল ৪৫ শতাংশে। ফলে আমদানি নিয়ন্ত্রণের পরও দুই মাসে রেকর্ড বাণিজ্য ঘাটতি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান মতে, গত দুই মাসে বাণিজ্য ঘাটতি হয়েছে ৪৫৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৪২৮ কোটি ৫০ লাখ ডলার। এ সুবাদে দুই মাসে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে প্রায় সাড়ে ৬ শতাংশ। সেপ্টেম্বর মাসে বাণিজ্য ঘাটতি আরো বেড়ে যাবে। কারণ এরই মধ্যে রফতানি আয় কমে গেছে।

১৩ মাস পরে রফতানি আয়ে ধাক্কা : ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে আগের বছরের জুলাইয়ের চেয়ে রফতানি আয় কমেছিল ৬ শতাংশের মতো। এর পর থেকে এক বছরের বেশি ধরে রফতানি আয়ে বড় প্রবৃদ্ধি হচ্ছিল। ২০২১-২২ অর্থবছর শেষে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৩৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ। চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ২৫ দশমিক ৩১ শতাংশ। কিন্তু সেপ্টেম্বর মাসে এসে ৬ দশমিক ২৫ শতাংশ নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

ইপিবির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সেপ্টেম্বর মাসে রফতানি আয়ে যে ধাক্কা লেগেছে, তা মূলত তৈরী পোশাক রফতানি কমার কারণে। গত মাসে ৩১৬ কোটি ডলারের তৈরী পোশাক রফতানি হয়েছে, যা গত বছরের সেপ্টেম্বরের চেয়ে ৭ দশমিক ৫২ শতাংশ কম। গত মাসে ওভেন ও নিট উভয় ধরনের পোশাক রফতানিই হ্রাস পেয়েছে।

চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর মেয়াদে পোশাক রফতানিতে ১৩ দশমিক ৩৮ শতাংশের বেশি, পাট ও পাটজাত দ্রব্যে ১৫ দশমিক ৭১ শতাংশ, প্লাস্টিক পণ্যে ৫৬ দশমিক ৫৫ শতাংশ ও চামড়াজাত পণ্যে ২০ দশমিক ৮৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
অন্য দিকে গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে কম আয় হয়েছে একাধিক পণ্যে। কৃষিপণ্যে ১৭ দশমিক ৯৮ শতাংশ, কেমিক্যাল পণ্যে ২৩ দশমিক ২৮ শতাংশ ও কাঁচজাত পণ্যে ৫২ দশমিক ৭৯ শতাংশ কম আয় হয়েছে।

পোশাক রফতানিকারক ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের পোশাকের প্রধান দুই বাজার যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতি অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় তারা পোশাক কেনা কমিয়ে দিয়েছে। তাদের এখন খাদ্যের পেছনেই অনেক বেশি অর্থ খরচ করতে হচ্ছে। সে কারণেই রফতানি আয় কমছে।

রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে গেল: বলা হচ্ছিল রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাবে। কারণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরামর্শে রেমিট্যান্সের ডলারের মূল্য বেঁধে দেয় ব্যাংকাররা। যেখানে আগে প্রতি ডলার আনতে ব্যয় করা হতো ১১৪ থেকে ১১৫ টাকা। সেখানে হঠাৎ গত ১১ সেপ্টেম্বর রেমিট্যান্সের ডলার ১০৮ টাকা বেঁধে দেয়া হয়। আর রফতানির ডলার বেঁধে দেয়া হয় ৯৯ টাকা। মূলত এর পর থেকেই রেমিট্যান্স প্রবাহ কমতে দেখা যায়। এর পরও গত ২৬ সেপ্টেম্বর রেমিট্যান্সের ডলারের মূল্য আরো ৫০ পয়সা কমিয়ে ১০৭ টাকা ৫০ পয়সায় নামিয়ে আনা হয়। এর পর থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহ আরো কমে যায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, ৪ থেকে ৮ সেপ্টেম্বর দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ৫২২ মিলিয়ন ডলার, ১১ থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর ৫ দিনে তা আরো কমে হয় ৪১২ মিলিয়ন ডলার, আর পরের ৫ দিন অর্থাৎ ১৮ থেকে ২২ সেপ্টেম্বর রেমিট্যান্স প্রবাহ আরো কমে হয় ২৫৬ মিলিয়ন ডলার। আর ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে ৩০ সেপ্টেম্বরে রেমিট্যান্স এসেছে ২৭৪ মিলিয়ন ডলার। সব মিলে গত সেপ্টেম্বরে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ১ হাজার ৫৩৯ মিলিয়ন ডলার, যেখানে আগের মাস অর্থাৎ আগস্টে এসেছিল ২ হাজার ৩৬ মিলিয়ন ডলার। আগস্টের চেয়ে সেপ্টেম্বরে রেমিট্যান্স কম এসেছে প্রায় সাড়ে ২৪ শতাংশ। আর গত বছরের সেপ্টেম্বরের (১৭২৬ মিলিয়ন ডলার) চেয়ে প্রায় ১১ শতাংশ কম।

কেন রেমিট্যান্সের দাম বেঁধে দেয়া হলো- এ বিষয়ে ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, চাহিদার থেকে সরবরাহ কম থাকায় প্রতিনিয়তই ডলারের দাম বেড়ে যায়। একসময় প্রতি ডলার ১২০ টাকা উঠে যাওয়ার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি জোরদার করা হয়। এতে বেশ কয়েকটি ব্যাংকের অনিয়মের চিত্র পাওয়া যায়। এরই পরিপেক্ষিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ডজনখানেক ব্যাংককে শোকজ করা হয়। এর মধ্যে ছয় ব্যাংকের ট্রেজারি প্রধানদের অপসারণের নির্দেশ দেয়া হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ শাস্তি থেকে রেহাই পেতে ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাথে দফায় দফায় বৈঠক করেন। একপর্যায়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরামর্শে ডলারের একক দর কার্যকর করার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়, যদিও তা আজো বাস্তবায়ন হয়নি। তবে রেমিট্যান্সের ডলার ও রফতানির ডলারের মূল্য কমিয়ে এনে বাজার স্থিতিশীল করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এরপর অনেকটা মুচলেকা নিয়ে ব্যাংকগুলোর ওপর থেকে আরোপিত শাস্তি প্রত্যাহার করে নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

রেমিট্যান্সের এ চিত্র চলমান পরিস্থিতিতে মোটেও সুখকর নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, হুন্ডি ঠেকাতে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশী শ্রমের নতুন নতুন বাজার সৃষ্টি করতে হবে; অন্যথায় সরবরাহ পরিস্থিতি আরো খারাপ অবস্থানে চলে যাবে।

Girl in a jacket

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।