চুয়াডাঙ্গা শনিবার , ১৬ এপ্রিল ২০২২
আজকের সর্বশেষ সবখবর

রায়পুরের বিষফোঁড়া ‘রফির ইটভাটা’

নিজস্ব প্রতিবেদক:
এপ্রিল ১৬, ২০২২ ৮:৫১ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

চারদিকে তিনটি বিদ্যালয়। মাঝখানে শত শত একর ফসলি জমি। ফাঁকে ফাঁকে জনবসতি। জীবননগর উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নের কৃষ্ণপুর গ্রামের চিত্র এটি। এসটিএইসবি নামের একটি মাত্র ইটভাটার দাপটে চরম ঝুঁকিতে গ্রামের শত শত শিক্ষার্থীসহ প্রায় ১ হাজার গ্রামবাসী। আর এ ইটভাটাটি তৈরি করেছেন স্থানীয় ইউপি সদস্যর ভাই রফিকুল ইসলাম রফি।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১১ সালের দিকে কৃষ্ণপুর গ্রামের বেশ কিছু মানুষকে জিম্মি করে জোরপূর্বক জমি দখল করে এবং এলাকার কিছু সাধারণ মানুষকে প্রলোভন দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়ে এসটিএইসবি ব্রিক ফিল্ড নামে একটি ইটভাটার কার্যক্রম শুরু করেন কৃষ্ণপুর গ্রামের মৃত দুলাল ম-লের ছেলে মো. রফিকুল ইসলাম রফি। কৃষ্ণপুর গ্রামের সাধারণ মানুষের ফসলি জমি দখল করে এখন সেই ইটভাটার আয়তন দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০ বিঘা। তবে রহস্যজনকভাবে এ ইটভাটা তৈরি করলেও নেই তার কোনো পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র। অবৈধভাবেই পরিচালনা করছে ভাটাটি। ভাটা থেকে মাত্র তিনশ গজ দক্ষিণে অবস্থিত রায়পুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও রায়পুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এই বিদ্যালয় দুইটিতে প্রায় আটশত ছাত্র-ছাত্রী রয়েছে।

রায়পুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বলেন, কয়লার বিষাক্ত ধোয়ার গন্ধে ছাত্র-ছাত্রী ও শিক্ষকদের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। মাটিকাটা এস্কাভেটর, ট্রাক ও ট্রাক্টরের ভয়াবহ শব্দদূষণে ক্লাসে পাঠদান করানো দূরূহ হয়ে পড়েছে। কৃষ্ণপুর গ্রামের মোস্তফা অভিযোগ করে বলেন, ‘রফিকুল ইসলাম তার সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে আমার ছেলেকে তুলে নিয়ে গলায় হাসুয়া ধরে ১৮ কাটা জমি জোরপূর্বক তার নামে করে নিয়েছে। তার ভয়ে এলাকার কেউ কথা বলতে পারে না সবাই নীরবে সহ্য করে যাচ্ছে। রফিকুলের ইটভাটার কারণে এলাকায় তেমন কোনো চাষ হয় না।’

বালিহুদা গ্রামের সাবেক সেনা সদস্য মো. আশরাফ আলী বলেন, ‘আমি সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেওয়ার পরে এলাকাতে থাকতাম তখন একদিন রফিকুল আমাকে এসে বলে আপনি তো অবসরে চলে এসেছেন, তো আসেন আমরা এক সাথে একটা ইটভাটা দিয়ে ব্যবসা করি। তার কথা মতো আমি ৫ লাখ টাকা দিয়েছি। লাভ তো দূরের কথা, এখন আমার আসল সেই টাকা আর ফেরত দিচ্ছে না। অবশেষে আমি বাধ্য হয়ে রফিকুলের বিরুদ্ধে ২০১২ সালে কোর্টে মামলা করেছি। এই মামলা করার অপরাধে রফিকুল তার ক্যাডার বাহিনী দিয়ে আমাকে তুলে এনে অনেক নির্যাতন করেছে। তার ভয়ে আমি আজ গ্রাম ছাড়া।’

সরেজমিনে দেখা গেছে, কোনো অনুমতি ছাড়াই পার্শ্ববর্তী নদীর তীর থেকে ব্রিকফিল্ডের জন্য এস্কাভেটর দিয়ে কেটে নেওয়া হচ্ছে সরকারি জমির মাটি। এতে ধ্বংস হচ্ছে সংরক্ষিত বনভূমিও। আর টাফিগাড়িতে মাটি পরিবহনকালে কাদা-মাটি পড়ে পড়ে নষ্ট হচ্ছে পিচঢালা স্থানীয় সড়ক।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইট প্রস্তুত ও ভাটা (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০১৩ অনুযায়ী কৃষিজমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বনভূমি, অভয়ারণ্য, জনবসতিপূর্ণ ও আবাসিক এলাকায় ইটভাটা স্থাপন করা কঠোরভাবে নিষেধ থাকলেও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাকে ‘ম্যানেজ’ করে প্রচলিত আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে গড়ে তোলা হয় এই বিশাল ইটভাটাটি।

এ বিষয়ে ভাটার মালিক, মো.রফিকুল ইসলাম রফি বলেন, ‘আমার ব্রিক ফিল্ডের অনুকূলে পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো ছাড়পত্র নেই এবং কোনো অনুমোদন নেই। সবাই যেভাবে ইটভাটা চালায়, আমিও সেভাবে চালাচ্ছি। তা ছাড়া আমি কারও জমি দখল করে বা টাকা আত্মসাৎ করে ইটভাটা তৈরি করি নাই। স্থানীয় বেশ কিছু ব্যক্তি আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তুলে বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিচ্ছেন।’

রায়পুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আ. রশিদ শাহ বলেন, এসটিএইসবি ইটভাটার মালিক মো. রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে জমি দখল করা এবং টাকা আত্মসাৎ করার অনেক অভিযোগ আমাদের কাছে এসেছে। কিন্তু আমরা তো লাখ লাখ টাকার বিচার করতে পারব না। এ জন্য আমরা তাদের কোর্টে যেতে বলেছি এবং বেশ কয়েকজন তার বিরুদ্ধে কোর্টে মামলা করেছে। পাশাপাশি রফিকুল ইসলাম যেখানে ইটভাটা স্থাপন করেছে, সেখানে কোনো মানুষ বসবাস করতে পারছে না এবং পাশের জমিগুলোতে ফসল হচ্ছে না। তার ইটভাটার কোনো অনুমোদন নেই। কিন্তু দীর্ঘদিন যাবৎ সে ইটভাটা পরিচালনা করে যাচ্ছে। আমরা চাই এ ধরণের অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ইটভাটাগুলো বন্ধ হোক। এ বিষয়ে জীবননগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আরিফুল ইসলাম জানান, সরকারিভাবে অনুমোদন নেওয়া এবং সরকারি নিয়মের মধ্যে যদি কেউ ইটভাটা পরিচালনা না করে, তাহলে তদন্তপূর্বক তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।