রাজপথের আন্দোলনে সরকারের পতন হবে

29

রাজশাহীতে বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশে বক্তারা
সমীকরণ প্রতিবেদন:
রাজশাহীতে আয়োজিত বিভাগীয় সমাবেশে বিএনপি নেতারা বলেছেন, পৃথিবীতে অনেক স্বৈরাচারের পতন হয়েছে। ফেরাউনের পতন হয়েছে। বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারেরও পতন হবে। তারা বলেন, রাজপথের আন্দোলনের মাধ্যমেই এই স্বৈরাচার সরকারের পতন ঘটানো হবে। এ জন্য নেতাকর্মীদের প্রস্তুত থাকতে হবে। শেখ হাসিনার সরকার নির্বাচিত নয়। এই সরকার হলো ভারতের পুতুল। নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন দাবিতে গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে রাজশাহী নগরীর নাইস কনভেনশন সেন্টার চত্বরে এই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
এতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপি জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, সরকার আল জাজিরার খবরকে মিথ্যা বলেছে। সরকার কি ধোয়া তুলসী পাতা- কোনো অপরাধ করে না। তিনি আরো বলেন, গণতন্ত্র হারিয়ে যাওয়ার জিনিস নয়। জীবনের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনব। মঞ্চে উপবিষ্ট বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেন ও তাবিথ আউয়ালকে দেখিয়ে তিনি বলেন, আজকের তরুণরাই তারেক রহমানের নেতৃত্বে এ দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনবে ইনশাআল্লাহ। বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক, রাজশাহী মহানগর বিএনপির সভাপতি ও সাবেক মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক মেয়র মিজানুর রহমান মিনু, উপদেষ্টা হাবিবুর রহমান হাবিব, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থী অ্যাডভোকেট মো: মজিবর রহমান সরোয়ার, চট্টগ্রাম সিটির মেয়রপ্রার্থী ডা: শাহাদাত হোসেন, খুলনা সিটির মেয়রপ্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু, ঢাকা উত্তর সিটির মেয়রপ্রার্থী তাবিথ আউয়াল, ঢাকা দক্ষিণ সিটির মেয়রপ্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হারুন অর রশিদ এমপি ও বিএনপির রাজশাহী বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু।
মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল হক মিলনের পরিচালনায় সমাবেশে আরো বক্তব্য দেন বিএনপির বিভাগীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ শাহীন শওকত, নওগাঁর বিএনপি নেতা কর্নেল অব: আব্দুল লতিফ, বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য নাদিম মোস্তফা, নওগাঁর বিএনপি নেতা শামসুল আলম প্রামাণিক, তাঁতি দলের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ, মহানগর যুবদলের সভাপতি আবুল কালাম আজাদ সুইট, মহানগর মহিলা দলের যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট রওশন আরা পপি, জেলা মহিলা দলের সভাপতি অ্যাডভোকেট সামসাদ বেগম মিতালী, জেলা ছাত্রদলের সভাপতি রেজাউল করিম টুটুল, মহানগর ছাত্রদলের সভাপতি আসাদুজ্জামান জনি, সেক্রেটারি রবিউল ইসলাম রবি প্রমুখ। উপস্থিত ছিলেন বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও রাজশাহী জেলা আহ্বায়ক আবু সাঈদ চাঁদ, জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম মার্শাল, সদস্যসচিব অধ্যাপক বিশ্বনাথ সরকারসহ রাজশাহী মহানগর ও জেলা বিএনপি এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর বিভিন্ন স্তরের নেতা এবং বিভাগের অন্যান্য জেলার বিএনপি নেতারা। সমাবেশে যেতে পুলিশি বাধার অভিযোগ : রাজশাহী থেকে সব রুটেই যাত্রীবাহী বাস চলাচল সোমবার সকাল থেকেই বন্ধ ছিল। তারপরও সবকিছু উপেক্ষা করে বিকল্প যানবাহন ও হেঁটে বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশে আসেন নেতাকর্মীরা। তবে সমাবেশে আসতে পথে পথে বিএনপি এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের বাধা দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন নেতারা।
নওগাঁর ধামুরহাট থানা যুবদলের আহ্বায়ক তৌহিদুল ইসলাম জানান, তারা মাইক্রোবাস ভাড়া করেছিলেন। শেষ মুহূর্তে চালকরা জানিয়েছেন, তারা আসতে পারবেন না। চাপ আছে। পরে পাঁচটি মোটরসাইকেলে ১০ জন এবং একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় চারজন আমরা সমাবেশে এসেছি। মোড়ে মোড়ে আমাদের আটকে তল্লাশি করা হয়। আমরা একসাথে আসতে পারিনি। আলাদা আলাদা এসেছি। নওগাঁয় নওহাটা মোড়ে এবং রাজশাহীতে নওদাপাড়ায় আমাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। সমাবেশের কথা না বলে নানা অজুহাত দিয়ে আসতে হয়েছে। আমাদের অনেক নেতা আসতে পারেননি। গোদাগাড়ী উপজেলা বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মী জানান, তারা ২৭ কিলোমিটার হেঁটে সমাবেশে এসেছেন। কিছু দূর পর পর তাদের পকেটে হাত দিয়ে তল্লাশি করা হয়। জেরা করা হয়েছে কোথা থেকে এসেছেন, কোথায় যাবেন। পবা উপজেলার কয়েকজন নেতাকর্মী জানান, তারা মোটরসাইকেল নিয়ে কয়েকজন নেতাকর্মী সমাবেশে আসছিলেন। তাদের কাছে ড্রাইভিং লাইসেন্স, হেলমেটসহ সব কাগজপত্র ছিল। কিন্তু কোনো কারণ ছাড়াই তাদেরকে সমাবেশস্থলে পৌঁছতে দেয়া হয়নি।
মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল বলেন, আমরা এর আগে বিভাগীয় সমাবেশ করেছি। তখনো বাধা দেয়া হয়েছে। এটি আসলে নতুন কিছু নয়। তবে বাধা উপেক্ষা করে সব জেলা থেকেই আমাদের নেতাকর্মীরা সমাবেশে এসেছেন। নাইস কনভেনশন সেন্টারসহ পুরো এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে। রাজশাহী মহানগর পুলিশের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত উপকমিশনার গোলাম রুহুল কুদ্দুস সাংবাদিকদের জানান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়। ভেনুকেন্দ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়, শহরের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে পর্যাপ্তসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন এবং টহলের ব্যবস্থা করা হয়। তিনি আরো বলেন, গাড়ি চলাচল স্বাভাবিক করতে বাস মালিক সমিতি ও কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করা হয়েছে। নানা কারণে তারা বাস চালাতে পারছেন না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কাউকে বাধা দেয়া হয়েছেÑ এমন তথ্য আমার জানা নেই।
বাধার মুখে তাবিথ আউয়াল : রাজশাহীর সমাবেশে যাওয়ার পথে পুলিশি বাধার মুখে পড়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়রপ্রার্থী তাবিথ আউয়াল। ঢাকা থেকে রাজশাহীর সমাবেশ স্থলে যাওয়ার পথে পুঠিয়াতে পুলিশ তার গাড়িবহর আটকায় এবং সেখানে তাকে রাজশাহীতে না যাওয়ার জন্য অনুরোধ জানায়। এ সময় পুলিশের সাথে তাবিথ আউয়াল সমর্থকদের বাগি¦তণ্ডা হয়। বিএনপি নেতা তাবিথ আউয়াল বলেন, সমাবেশে যোগ দিতে রাজশাহীতে আসার পথে বেলা ১টায় পুঠিয়া উপজেলায় আমাকে বাধা দেয়া হয়েছে। আমার সাথে আরো ১০ জন নেতাকর্মী ছিলেন। পরে প্রায় আধা ঘণ্টা পর আমাকে পুঠিয়া থেকে রাজশাহীতে আসতে দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া আমার পেছনে আরো একটি গাড়িতে ১০ জন নেতাকর্মী ছিলেন। তাদেরকে আটকে দেয়া হয়। তিনি আরো বলেন, শুধু পুঠিয়াতে নয়, রাজশাহীতে আসতে বিভিন্ন জেলার প্রবেশমুখে নেতাকর্মীদের বাধা দেয়াসহ নানাভাবে হয়রানি করা হয়।
সীমিত পরিসরে সমাবেশ করার অনুমতি : রাজশাহীতে বিএনপিকে বিভাগীয় সমাবেশ করার অনুমতি দেয়া হয়। কিন্তু তা সীমিত পরিসরে ও ঘরোয়াভাবে। রাজশাহী মহানগর পুলিশের (আরএমপি) মুখপাত্র ও অতিরিক্ত উপকমিশনার (সদর) জানান, বিএনপি একেবারেই মধ্য শহরের রাস্তায় সমাবেশ করার অনুমতি চেয়েছিল। কিন্তু এসব এলাকায় সমাবেশ করলে মানুষের চলাচল বাধাগ্রস্ত হবে। তীব্র যানজট দেখা দেবে। এ জন্য মধ্যশহরে সমাবেশের অনুমতি দেয়া হয়নি। আমরা বলেছি, ইনডোরে সমাবেশ করতে হবে।
এ দিকে ইনডোরে সমাবেশের অনুমতি প্রসঙ্গে মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল জানান, তারা নগরীর সাহেববাজার জিরো পয়েন্ট, মনিচত্বর, সোনাদীঘি বা গণকপাড়া এলাকায় সমাবেশের জন্য অনুমতি চেয়েছিলেন। কিন্তু পুলিশ তার কোনোটিতেই সমাবেশ করার অনুমতি দেয়নি।
অঘোষিত ধর্মঘটে অচল রাজশাহী : সমাবেশকে কেন্দ্র করে অঘোষিত বাস ধর্মঘটের দ্বিতীয় দিনে গতকাল অচল হয়ে পড়ে বিভাগীয় শহর রাজশাহী। এতে যাত্রী সাধারণ পড়েন চরম ভোগান্তিতে। তবে ঠিক কখন আবার বাস চলাচল শুরু হবে সে ব্যাপারে কেউ স্পষ্ট করে কিছু বলতে পারছেন না। এর আগে গত সোমবার সকাল থেকে পূর্ব ঘোষণা ছাড়া হঠাৎ করেই পরিবহন ধর্মঘট শুরু হয়। পরিবহন নেতারা বলছেন, বগুড়ায় তাদের দুই শ্রমিককে মারধর ও সড়কে নিরাপত্তার আশঙ্কায় তারা বাস চলাচল বন্ধ রেখেছেন। তবে বিএনপির নেতারা বলছেন, সমাবেশ বানচাল করতেই সোমবার থেকে বাস চলাচল বন্ধ করে রাখা হয়েছে। সকালে রাজশাহী নগরীর শিরোইলে বাস টার্মিনাল ও নওদাপাড়ায় কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে গিয়ে দেখা গেছে, সবধরনের বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। শিরোইল টার্মিনাল থেকে প্রথম দিনের মতো ঢাকার পথে কোনো দূরপাল্লার বাস ছেড়ে যায়নি। অপর দিকে নওদাপাড়া কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল থেকেও ছেড়ে যায়নি আন্তঃজেলাসহ কোনো রুটের বাস। তবে টার্মিনালগুলোতে বাস কাউন্টার খোলা রয়েছে।