চুয়াডাঙ্গা বুধবার , ১৭ নভেম্বর ২০২১
আজকের সর্বশেষ সবখবর

রডের দাম আকাশচুম্বী ; নির্মাণ খাতে বিপর্যয়ের আশঙ্কা

সমীকরণ প্রতিবেদনঃ
নভেম্বর ১৭, ২০২১ ৯:৪৩ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

মহামারি করোনাভাইরাস থেকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপন স্বাভাবিক পরিস্থিতির দিকে উন্নতি হচ্ছে। এর মধ্যে মানুষের চাহিদাও বাড়ছে। সেই চাহিদার অন্যতম নিত্যপণ্য হলো বাড়িঘরসহ স্থাপনা নির্মাণের প্রধান উপকরণ রড। বেশ কিছুদিন ধরেই লাগামহীনভাবে বাড়ছে পণ্যটির দাম। মাত্র গত দুই সপ্তাহের ব্যবধানে রডের দাম প্রতি টনে বেড়ে গেছে ৭ হাজার টাকা। আর গত এক বছরে রডের দাম ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এই প্রথম দেশের বাজারে রডের দাম এত বাড়লো, ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এতে বিপাকে পড়েছেন ব্যক্তিগত বাড়ি নির্মাণকারী ও আবাসন ব্যবসায়ীরা। রডের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় সরকারের চলমান উন্নয়নকাজ ও বেসরকারি পর্যায়ে আবাসন-শিল্প বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। ওদিকে সরকারি প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্যেও বাজারে সব ধরনের রডের দাম বেড়েছে। যদিও ব্যবসায়ীরা বলছেন, দাম দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেলেও উৎপাদনের সঙ্গে সমন্বয় করতে রডের দাম সেই তুলনায় বাড়ানো হয়নি।

জানা গেছে, করোনা মহামারির শুরুতে সারা দেশে নির্মাণকাজ প্রায় বন্ধ হয়ে পড়েছিল। ওই সময় নির্মাণ উপকরণ রডের চাহিদাও ব্যাপক হারে কমে যায়। বিপাকে পড়ে তখন কোম্পানিগুলোও পণ্যটির দাম কমায়। মহামারির ধাক্কা সামলে নির্মাণকাজের ভরা মৌসুম শুরু হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি নানা প্রকল্পের কাজও পুরোদমে শুরু হয়েছে। এতে চাহিদা বেড়ে গেছে। এই সুযোগে গত ১৫ দিনে প্রতি টন রডের দাম ৮ থেকে ৯ হাজার টাকা বাড়িয়ে দেয় কোম্পানিগুলো।

বাজার ঘুরে দেখা গেছে, এক সপ্তাহ আগে প্রতি টন রডের দাম ছিল ৭৫ হাজার টাকা। সেই রডের দাম বেড়ে ৮১ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। পাঁচ মাস আগে প্রতি টন রড বিক্রয় হতো ৫৫ হাজার টাকা। ফলে এই সময়ে টন প্রতি দাম বেড়েছে ২৫ হাজার টাকা। রডের এমন দাম বাড়ার কারণ হিসেবে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারের রড তৈরির কাঁচামাল স্ক্র্যাপ এবং বিলেটের দাম বৃদ্ধি পাওয়াকে দায়ী করছে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। তারা জানান, বিশ্ববাজারে কাঁচামালের দাম এবং জাহাজ ভাড়া ব্যাপকভাবে বেড়েছে। করোনার প্রভাব কাটিয়ে বিশ্বে নির্মাণকাজ বেড়ে যাওয়ায় চাহিদা অনুসারে কাঁচামাল পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে, নির্মাণকাজের ভরা মৌসুম হওয়াতেও এখন রডের চাহিদা বেশি। এসব কারণে দেশের বাজারেও রডের দাম বেড়েছে। কাঁচামালের দাম না কমলে সামনের মাসগুলোতে দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন তারা। দেশীয় উদ্যোক্তারা জানান, চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় উন্নত দেশগুলো এখন আর জাহাজ ভাঙতে চাচ্ছে না। ফলে দেশে জাহাজ ভাঙা স্ক্র্যাপের পরিমাণও কমে গেছে।

রাজধানীর বেশকিছু স্থানে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে বাজারে তিন ধরনের রড পাওয়া যাচ্ছে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি বা অটো কারখানাগুলোতে তৈরি ৭৫-গ্রেড (৫০০ টিএমটি), সেমি-অটো কারখানাগুলোতে তৈরি ৬০-গ্রেড (৫০০ ওয়াট) এবং সাধারণ বা ৪০-গ্রেডের রড। ভালো মানের (৬০ গ্রেডের উপরে) রড বিক্রি হচ্ছে প্রতি টন ৮০ থেকে ৮১ হাজার টাকায়, যা ১৫ থেকে ১৬ দিন আগেও বিক্রি হয় ৭২ থেকে ৭৩ হাজার টাকায়। এক মাস আগে দাম ছিল ৬৯ থেকে ৭০ হাজার টাকা। রড উৎপাদনের প্রধান কাঁচামাল স্ক্র্যাপের প্রায় ৮০ শতাংশই আমদানি করা হয় আমেরিকা ও ইউরোপের কয়েকটি দেশ থেকে। বাকি ২০ শতাংশ আসে দেশীয় জাহাজ ভাঙা স্ক্র্যাপ থেকে। রডের পাশাপাশি অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে ইস্পাত তৈরির কাঁচামাল বিলেট, প্লেট ও স্ক্র্যাপের দামও। বর্তমানে বাজারে প্রতি টন স্ক্র্যাপ ৫৫ হাজার টাকা, প্লেট ৬০ হাজার টাকা এবং বিলেট ৬৬ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দুই সপ্তাহে আগে স্ক্র্যাপ ৫০ হাজার টাকা, প্লেট ৫৬ হাজার টাকা এবং বিলেট ৬০-৬১ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। এদিকে, সরকারি প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্যেও গত এক মাসের ব্যবধানে বাজারে সব ধরনের রডের দাম বেড়েছে। গত বছরের তুলনায় এখন ৬০ গ্রেডের রড ৩৩.৯২ শতাংশ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। এর মধ্যে গত এক সপ্তাহে বেড়েছে ৫.৩৮ শতাংশ। খুচরা পর্যায়ে ৬০ গ্রেডের রড ৭৯ হাজার ৬০০ থেকে ৮১ হাজার ১০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে, যা এক বছর আগে ছিল ৫৪ হাজার থেকে ৬৬ হাজার টাকার মধ্যে। এ ছাড়া একই মানের রডের দাম সপ্তাহখানেক আগে বিক্রি হয়েছে ৭৫ হাজার থেকে ৭৭ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে। অন্যদিকে গত বছরের তুলনায় এখন ৪০ গ্রেডের রড ৪০.৬৪ শতাংশ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। এর মধ্যে গত এক সপ্তাহে বেড়েছে ৪.০৫ শতাংশ। খুচরা পর্যায়ে ৪০ গ্রেডের রড ৭৬ হাজার ৫০০ থেকে ৭৭ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে, যা এক বছর আগে ছিল ৫১ হাজার থেকে ৫৮ হাজার টাকার মধ্যে। এ ছাড়া একই মানের রডের দাম সপ্তাহখানেক আগে বিক্রি হয়েছে ৭৩ হাজার ৫০০ থেকে ৭৪ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে।

বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব কনস্ট্রাকশন ইন্ডাস্ট্রির (বিএসিআই) সভাপতি প্রকৌশলী সফিকুল হক তালুকদার বলেন, বাজারে এক সপ্তাহ আগে প্রতি টন রডের দাম ছিল ৭৫ হাজার টাকা। সেই রডের দাম বেড়ে এখন ৮০ হাজার টাকা দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, বাস্তবিক পরিস্থিতিতে সাশ্রয় তো হচ্ছেই না বরং আমরা ঠিকাদাররা কেউ কেউ দেউলিয়া হওয়ার পথে যাচ্ছি। সুতরাং সরকারের উন্নয়নমূলক কাজ সঠিক সময়ে কম খরচে বাস্তবায়নের জন্য আইন অনুযায়ী মূল্য সমন্বয় জরুরি। আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহ্যাবের প্রথম সহ-সভাপতি কামাল মাহমুদ বলেন, রডের দাম বৃদ্ধির কারণে আবাসন নির্মাণে আগের চেয়ে খরচ বেড়েছে ১৫ থেকে ১৮ শতাংশ। ফলে যেসব ফ্ল্যাট আগে বুকিং নেয়া হয়েছে, সেগুলোতে লোকসান গুনতে হচ্ছে। এ কারণে অনেক ভবনের নির্মাণকাজ বন্ধ করতে হয়েছে।

মিল মালিকদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে বার্ষিক রডের চাহিদা ৫৫ লাখ টন। এর মধ্যে সরকারি উন্নয়ন কাজে ব্যবহার হয় ৬০ শতাংশ। অবশিষ্ট ৪০ শতাংশ বেসরকারি খাতে। রডের প্রধান কাঁচামাল পুরনো লোহালক্কড় বা স্ক্র্যাপ আমদানি করে তা রি-রোলিং মিলে গলিয়ে রড তৈরি করা হয়। দেশে রি-রোলিং মিলের সংখ্যা ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১৩০টি। এর মধ্যে বড় আকারের ৫০টি। বাকিগুলো ছোট ও মাঝারি আকারের। দেশে রডের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার পেছনে পাঁচটি কারণকে দায়ী করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এগুলো হলো- আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি, জাহাজ ভাড়া, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, ডলারের দাম বৃদ্ধি এবং করোনা-পরবর্তী সারা বিশ্বে রডের চাহিদা বেড়ে যাওয়া।

বাংলাদেশ স্টিল মিলস ম্যানুফ্যাকচারার্স এসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মাসুদুল আলম মাসুদ বলেন, রড তৈরির প্রধান কাঁচামাল পুরনো লোহা, যা স্ক্র্যাপ নামে পরিচিত। এই স্ক্র্যাপ আমদানি করে আমরা কারখানায় বিলেট তৈরি করে রড উৎপাদন করি। তিনি বলেন, সরকার আমদানি পর্যায়ে নির্ধারিত ট্যারিফ মূল্য কমিয়ে ৫০০ টাকা নির্ধারণ এবং উৎপাদন পর্যায়ে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট ২ হাজার টাকার পরিবর্তে ৫০০ টাকা আরোপ করতে পারে। এতে দাম কমে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। খুচরা রড ব্যবসায়ী মিলন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে রডের ব্যবসা করছি। এর আগে কখনো এভাবে রডের দাম বাড়তে দেখিনি। প্রায় প্রতিদিন রডের দাম বাড়ছে। টন প্রতি আমাদের কেনা পড়ে প্রায় ৭৮-৭৯ হাজার টাকা। সেখানে আমাদের বিক্রি করতে হয় ৮০-৮১ হাজার টাকা করে। ক্রয় আর আনুষঙ্গিক খরচের সঙ্গে মিল রেখেই আমরা বিক্রি করছি।

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।