চুয়াডাঙ্গা রবিবার , ৩ জুলাই ২০২২
আজকের সর্বশেষ সবখবর

রক্ষক যখন ভক্ষক!

জীবননগরে বন বিভাগের কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম কাজল নিজেই করছেন হরিলুট
সমীকরণ প্রতিবেদনঃ
জুলাই ৩, ২০২২ ৩:৪৩ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

জীবননগর অফিস: চুয়াডাঙ্গার জীবননগর বন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শরিফুল ইসলাম কাজলের বিরুদ্ধে দরপত্র ছাড়া উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের রাস্তার পাশে সামাজিক বনায়নের কোটি টাকার গাছ বিক্রির অভিযোগ উঠেছে।

জানা গেছে, সমিতির সদস্যদের না জানিয়ে তাদের স্বাক্ষর জাল করে বন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শরিফুল ইসলাম কাজলের মনোনীত তার আত্বীয় খয়েরহুদা গ্রামের কাঠ ব্যবসায়ী হায়াত আলী ও পাশ্ববর্তী উপজেলা কোটচাদপুরের কাঠ ব্যবসায়ী শাজাহানকে ঠিকাদার বানিয়ে সামাজিক বনায়নের আওতায় রাস্তার পাশে লাগানো গাছ বিক্রি করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। মেহগনি, নিম, বাবলা ও চটকাসহ বিভিন্ন প্রজাতির কোটি টাকা মূল্যের গাছ মাত্র ২৫ লক্ষ টাকায় বিক্রিসহ তার ছোট ভাই ডাবলু এবং তার নিকট আত্বীয় নারায়নপুর গ্রামের শামসুলকে সদস্য বানিয়ে বন বিভাগের টাকার ভাগ দিয়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। শুধু তাই নয় নিজের নামে জীবননগর উপজেলা জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে টিউবওয়েল স্থাপনের খরচ বাবদ উঠিয়েছেন ১ লক্ষ টাকা বলেও অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া গাছ পাহারা দেওয়ার জন্য পাহারাদারের বেতন সরকারিভাবে দিলেও এই কর্মকর্তা পাহারাদারের বেতন তুলে নিজের পকেটে রাখেন আর সদস্যদের নিকট থেকে টাকা তুলে পাহারাদারের বেতন দেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। দুর্নীতিবাজ এই কর্মকর্তাকে অপসারণের দাবিতে ইতোমধ্যেই এলাকার শতাধিক মানুষ গণস্বাক্ষর করে কুষ্টিয়া বিভাগীয় বন কর্মকর্তার নিকট একটি লিখিত অভিযোগপত্র দাখিল করেছে।

আরও জানা যায়, জীবননগর উপজেলার হাসাদহ ইউনিয়নের মাধবপুর রাস্তার দুইপাশের গাছগুলো বিক্রি করা হয়েছে ১৪ লক্ষ টাকায়। যার হিসাব দিয়েছেন তিনি মাত্র ৩ লক্ষ টাকা। এছাড়া সীমান্ত ইউনিয়নের চ্যাংখালী রোডের গাছ বিক্রি হয়েছে ৯ লক্ষ টাকায়, আর তিনি হিসাব দিয়েছেন ৭ লক্ষ টাকার। হরিহরনগর থেকে করতোয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় পযন্ত গাছ বিক্রি হয়েছে ৫ লক্ষ টাকায়, আর তিনি হিসাব দিয়েছেন মাত্র ৬০ হাজার টাকার। যাদবপুর থেকে করতোয়া স্কুল পর্যন্ত গাছ বিক্রি হয়েছে ৪ লক্ষ টাকায়, আর তিনি হিসাব দিয়েছেন মাত্র ১ লক্ষ টাকার। এরমধ্যে স্থানীয় সাবেক শিক্ষক আব্দুর রশিদকে ৫০ হাজার টাকা ও বাকি টাকা শরিফুল ইসলাম কাজল তার নিজের পকেটে রেখে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে, জীবননগরের কয়া কবরস্থান থেকে ধান্যখোলা রাস্তা পর্যন্ত গাছ বিক্রি হয়েছে ১২ লক্ষ টাকায় আর তিনি হিসাব দিয়েছেন মাত্র সাড়ে ৪ লক্ষ টাকার। অন্যদিকে সন্তোষপুর-দেহাটি রোডের গাছের কোনো হিসাবই নাকি এই কর্মকর্তার কাছে নেই।

সামাজিক বনায়নের সদস্য হাফিজুল ইসলাম বলেন, ‘বন বিভাগের কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম কাজলের দুর্নীতির কোনো শেষ নেই। আমাদের কাউকে না জানিয়ে দরপত্র ছাড়াই সড়কের পাশে অবস্থিত গাছ বিক্রি করেছেন। কত টাকায় গাছ বিক্রি হয়েছে এবং কে গাছগুলো কিনেছে? আমরা কিছুই জানি না। আমাদের জানামতে সদস্য ছিল ১৬ জন, আর টাকা ভাগ করার সময় সদস্য দেখাচ্ছেন ১৭ জন। এই একজন তার আপন ভাই ডাবলু। সে কোনোদিন আমাদের সমিতির মধ্যে ছিল না। গাছগুলো যে পাহারা দিতেন, তার বেতন আমরা সমিতির সদস্যরা দিতাম। শরিফুল ইসলাম কাজল সাহেব টাকা ছাড়া কিছুই বোঝেন না।’

কয়া গ্রামের সামাজিক বনায়ণের সাধারণ সম্পাদক তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘নামে আমাদের কমিটি গঠন করে দিয়েছেন তিনি। কিন্তু কারা সদস্য আছে আমরা কিছুই জানি না। কারা সদস্য সেই তালিকার জন্য একাধিকবার তাকে বলা সত্ত্বেও তিনি আমাদের কোনো তালিকা দেননি। আমার জানামতে সদস্য ছিল ৪৫ জন। কিন্তু টাকা ভাগ করার সময় দেখছি সদস্য ৪ ৬জন। বন বিভাগের কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম কাজল সাহেব তার আত্মীয় জীবননগর পৌরসভার নারায়নপুরের শামসুল হক নামের একজনকে সদস্য বানিয়ে টাকা দিয়েছেন। আমাদের হাতে ৯ হাজার টাকা দিয়ে বলছে এই টাকা ভাগ হয়েছে। কিন্তু গাছগুলো কত টাকায় বিক্রি হয়েছে সেটা আমাদের জানাননি। আমি এর প্রতিবাদ করায় তিনি আমাকে বাতিল করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বিষয়টি আমি যখন বিভাগীয় বন কর্মকর্তাকে জানালে তিনি আমাকে কমিটিতে রাখেন।’

জাবেদ নামের স্থানীয় এক প্রতিবেশী অভিযোগ করে বলেন, ‘আমপান ঝড়ের সময় রাস্তার পাশে পড়া গাছগুলো বন বিভাগের কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম কাজল সাহেব যখন নিলাম ছাড়া তার আত্মীয় হায়াতের কাছে বিক্রি করছিল, এসময় আমরা বাধা দিলে সে গাছগুলো রেখে দেয়। কিন্তু পরদিন সুযোগ-বুঝে গাছগুলো বিক্রি করে দেয়। এ ঘটনায় আমরা এলাকার সাধারণ মানুষ তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা কুষ্টিয়ার নিকট একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছিলাম। কিন্তু এখন পর্যন্ত এর কোনো সমাধান হয়নি।’

গাছ ক্রয় করা ঠিকাদার মো. সাইদুর রহমান বলেন, ‘আমরা তিনজন কাঠ কেনার জন্য নিলামে অংশগ্রহণ করি। কাজল সাহেব নিজে আমাদের তিনজনের রেট বসিয়ে দেন এবং আমাদের সবার কাগজপত্র সে নিজে লিখে জমা দেন। এর মধ্যে কাজল সাহেবের আত্মীয় হায়াত আলীকে কৌশলে কাঠ পাইয়ে দেন। এবিষয়টি নিয়ে আমি তার অফিসারের কাছে অভিযোগ দিলে তিনি ২১ লট কাঠের মধ্যে আমাকে এবং আর একজনকে ৪ লট কাঠ দেয়। আর বাকি ১৭ লট হায়াত আলীকে দিয়ে দেন। কাজল সাহেব হায়াত আলী ও কোর্টচাঁদপুরের কাঠ ব্যবসায়ী শাজাহানের নিকট বন বিভাগের সমস্থ কাঠ টেন্ডার ছাড়াই বিক্রি করে থাকেন বলে জেনেছি।’

হাসাদহ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. রবিউল ইসলাম বিশ্বাস বলেন, ‘আমার ইউনিয়নের রাস্তার পাশে অনেক গাছ ছিল। কিন্তু কত টাকায় বিক্রি হয়েছে এবং এই গাছগুলো কারা নিয়েছে এবিষয়ে আমি কিছুই জানি না। জীবননগর বন বিভাগের কর্মকর্তা কাজল সাহেব একদিন আমার ইউনিয়নে ৭ হাজার টাকার একটি চেক দিয়ে আসে গাছ বাবদ এটাই জানি।’

এবিষয়ে জানতে চাইলে জীবননগর বন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শরিফুল ইসলাম কাজল বলেন, ‘জীবননগর উপজেলা বিভিন্ন রাস্তার পাশ থেকে যে গাছগুলো কাটা হয়েছে তার সমস্থ অর্থ সুবিধাভোগী এবং সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদে দেওয়া হয়েছে। আর আমপান ঝড়ের গাছগুলো একেবারে নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো। এ জন্য অল্প দামে বিক্রি করা হয়েছে। তা ছাড়া আমি কোনো দুর্নীতি করিনি। সাংবাদিকরা ভুল তথ্য পাচ্ছেন।’

এবিষয়ে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা-কুষ্টিয়া জিএম কবিরের সাথে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোনটি রিসিভ করেননি।

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।