চুয়াডাঙ্গা শুক্রবার , ৭ জানুয়ারি ২০২২
আজকের সর্বশেষ সবখবর

রক্তের দায় কার : ইউপি নির্বাচন সহিংসতায় শতাধিক প্রাণহানি

সমীকরণ প্রতিবেদনঃ
জানুয়ারি ৭, ২০২২ ১০:৪০ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

পাল্টে গেছে দেশের নির্বাচন পদ্ধতির গতিধারা। এক সময় নির্বাচন ছিল উৎসব। এখন হয়ে গেছে ভীতি-আতঙ্ক-প্রাণহানি আর বিশেষ মার্কার প্রার্থীকে জিতিয়ে দেয়ার এজেন্ডা। ভোট দিলে ফলাফল পাল্টে যাবে এমন ধারণা থেকে মানুষ ভোটকেন্দ্র বিমুখ হয়েছে। আবার এই সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ না নেয়ার ঘোষণা দিয়ে বিএনপি ঘরে বসে থাকলেও ধাপে ধাপে অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। এ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর সঙ্গে বিদ্রোহী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। প্রতি দফার এই নির্বাচনে রক্ত ঝরছে, প্রাণ হারিয়েছে প্রায় শতাধিক মানুষ। অথচ সিইসি কে এম নুরুল হুদার স্পষ্ট বক্তব্য নির্বাচনী সহিংসতা, রক্তারক্তি ও প্রাণহানির দায় নির্বাচন কমিশনের নয়। প্রশ্ন হচ্ছে এই প্রাণহানির দায় কার? তাছাড়া সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটির ইমেজ যখন তলানীতে; তখন ইসির দায়িত্বপ্রাপ্তরা ঝগড়াবিবাদ করছেন।

স্থানীয় এই নির্বাচনে একের পর এক হত্যাকাণ্ডের দায় সিইসি না নিলেও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটির মধ্যে চলছে স্ববিরোধী কথাবার্তা। ইসির তিনজন কমিশনার কার্যত সিইসির ‘পুতুল’। ৫ জানুয়ারি ইসির ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার বলেছেন, ‘২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালট পেপারে সিল মারার ঘটনাটি আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় প্রকাশ করার পর নির্বাচন কমিশন দিনের ভোট রাতে করে বলে আমরা প্রশ্নবিদ্ধ হই।’ পঞ্চম ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নিয়ে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদারের এই পর্যবেক্ষণ মানতে রাজি নন সিইসি কে এম নুরুল হুদা। তিনি মনে করেন ইসি সফল এবং ভোটকেন্দ্রে সংঘাত-হত্যকাণ্ডের দায় ইসির নয়। তিনি বলেছেন, ‘কোনো এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য মাহবুব তালুকদার ইসি নিয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এমন কথা বলছেন। মিডিয়ায় কভারেজ পাওয়ার জন্য তিনি একেকটা সময় একেকটা শব্দ চয়ন করেন।’ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ইসিতে কর্মরত মাহবুব তালুকদার ও কে এম নুরুল হুদা দু’জনই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল। নেটিজেনরা প্রশ্ন তুলছেন মাহবুব তালুকদার কোনো এজেন্ডা বাস্তবায়নে এমন কথা বলে থাকলে সিইসি নুরুল হুদা কার এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছেন? অনেকেই মাহবুব তালুকদারের বক্তব্য সঠিক উল্লেখ করলেও অনেকেই কে এম নুরুল হুদাকে নির্লজ্জ, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংসকারী হিসেবে অবিহিত করেন।

জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সাধারণ সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নির্বাচন কমিশন থেকে বেতন ভাতা কারা নেন? এদের লজ্জা-শরম নেই। কেউ ব্যর্থ হতে পারে; তার মানে এই নয় নিজের দোষ শিকার করা যাবে না। দায়িত্বশীলরা যখন নিরপেক্ষ ভোট গ্রহণে ব্যর্থ হয় তখন এই নির্বাচন কমিশন অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপায়। বর্তমান নুরুল হুদা ও আগের কাজী রকিবউদ্দিন কমিশন জনগণের ভোটাধিকার হরণ এবং দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা ধ্বংস করেছে। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করায় এদের বিচার হওয়া উচিত।

২০২১ সালের মার্চ মাসে ইউপি নির্বাচনে প্রথম ধাপে তফসিল ঘোষণা করা হয়। দ্বিতীয় ধাপে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে, তৃতীয় ধাপে অক্টোবরে, চতুর্থ ধাপে নভেম্বরে এবং পঞ্চম ধাপে ২০২২ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে মাঠের বিরোধী দল বিএনপি অংশ গ্রহণ করেনি। ফলে চেয়ারম্যান পদে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বনাম বিদ্রোহী প্রার্থী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে। প্রতি ধাপের ইউপি নির্বাচনে হামলা, সংঘর্ষ ও গোলাগুলি, ব্যালট ছিনতাই, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ, প্রার্থীকে হত্যা, প্রকাশ্যে ব্যালটে সিল মারা, ভয়-ভীতি দেখানো, অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ঝনঝনানি। পঞ্চম দফার নির্বাচনে ব্যাপক সহিংসতা ঘটেছে। বগুড়ায় নির্বাচনের পর ভোট গণনা ইস্যুতে বিজিপির গুলিতে ৫ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। গাবতলী উপজেলার আদমদীঘি উপজেলার থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। নোয়াখালির বেগমগঞ্জে পুলিশের গাড়িতে হামলা এবং একজনকে কারাদণ্ড দেয়া হয়, শরিয়তপুরের নড়িয়ার নওয়াপাড়ায় পরাজিত মেম্বার প্রার্থীকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়, মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানের নির্বাচনী সহিংসতায় টেঁটাবিদ্ধ অন্তঃসত্ত্বা নারীসহ ৯ জন আহত হয়। এছাড়াও বিভিন্ন স্থানে সংঘাত সহিংসতার ঘটনা ঘটে।

পঞ্চম ধাপের ইউপি নির্বাচন নিয়ে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ থেকে নভেম্বর পর্যন্ত আট মাসে সারাদেশে ইউপি নির্বাচনে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে প্রায় তিনশটি। এতে আহত হয়েছেন প্রায় হাজার মানুষ। প্রাণ হারিয়েছেন ৭৫ জন। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে প্রাণ হারিয়েছে ১১ জন। এ ছাড়াও সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন ও পৌরসভা নির্বাচনে আরো কয়েকজনসহ প্রায় শতাধিত মানুষ প্রাণ হারিয়েছে।

নির্বাচনে জনগণের অংশগ্রহণের এখন বেহাল অবস্থা। নির্বাচনে যেনতেনভাবে ক্ষমতাসীন দলের মনোনীত প্রার্থীকে জিতিয়ে দেয়ার কারণে ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। বিএনপির মতো বৃহৎ রাজনৈতিক দল ছাড়াও দেশের বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল ইসির ওপর আস্থা না থাকায় নির্বাচন বর্জন করছেন। দেশ-বিদেশের গণমাধ্যম থেকে শুরু করে সর্বোত্রই নির্বাচন কমিশনের ব্যর্থতা ও পক্ষপাতিত্ব নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে। তখন ইসির দায়িত্বশীলরা নিজেদের সাংবিধানিক দায়িত্বের কথা ভুলে তর্কাতর্কিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশনের ইমেজ তলানিতে নিয়ে গেছেন সাবেক সিইসি কাজী রকিব উদ্দিন ও বর্তমান সিইসি নুরুল হুদা কমিশন।

পঞ্চম দফা ইউপি নির্বাচনের বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদে ব্যালট পেপার ছিনতাইয়ের প্রসঙ্গ টেনে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার বলেছেন, যেকোনো মূল্যে ব্যালট পেপারের সুরক্ষা দিয়ে এ অবস্থার অবসান ঘটানো প্রয়োজন। ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালট পেপারে সিল মারার ঘটনাটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশ করার পর নির্বাচন কমিশন দিনের ভোট রাতে করে বলে আমরা (ইসি) প্রশ্নবিদ্ধ হই। এটি কোনোভাবেই কাম্য ছিল না। নির্বাচনের মৌলিক শর্ত ভোটের আগে ও পরে ব্যালট পেপারের নিরাপত্তা বিধান। আমরা (ইসি) যথাযথভাবে তা দিতে ব্যর্থ হয়েছি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এর দায় এড়াতে পারবে বলে মনে হয় না। এখন ভোটযুদ্ধে যুদ্ধ আছে, ভোট নেই। ইউপি নির্বাচনে এখন উৎসবের বাদ্যের বদলে বিষাদের করুণ সুর বাজছে। কিন্তু নির্বাচন ও সন্ত্রাস একসঙ্গে চলতে পারে না। তিনি আরো বলেন, নির্বাচনী আইন ভঙ্গ করে আচরণবিধি লঙ্ঘন সুষ্ঠু নির্বাচনের গোড়াকর্তনের নামান্তর। কিছু এমপি সরাসরি আচরণবিধি লঙ্ঘন করে চলমান ইউপি নির্বাচনকে কলুষিত করেছেন। ইসি কেবল চিঠি দেয়া ছাড়া তাঁদের সম্পর্কে আর কোনো ব্যবস্থা নেয়া যায়নি।

মাহবুব তালুকদারের এই আত্মপোলব্ধির কঠোর সমালোচনা করেন সিইসি কে এম নূরুল হুদা। তিনি বলেন, নির্বাচনে সহিংসতা ও মৃত্যুর দায় নির্বাচন কমিশনের নয়। দায় প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের। সহিংস ঘটনাগুলো ঘটেছে কেন্দ্রের বাইরে। আমরা তাদের বারবার বলি সহনশীল হতে। মাহবুব তালুকদারের মূল্যায়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, উনি (মাহবুব তালুকদার) তো এরকম সব সময় বলেন। একেক সময় একেক শব্দচয়ন করেন, মিডিয়ায় প্রচার করার জন্য। এই কথাগুলো অপ্রাসঙ্গিক, অপ্রচারমূলক। নির্বাচন কমিশনকে অপবাদ দেয়া কথা। ভোটযুদ্ধ আছে, ভোট নেই, তাহলে ৭৫ শতাংশ ভোটার কোত্থেকে আসে? টেলিভিশনে দেখিয়েছেন সারিবদ্ধভাবে নারী-পুরুষ দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দেন। তাহলে এরা কারা? এরা কী ভোটার নন? সুতরাং উনার কথার কোনো প্রাসঙ্গিকতা নেই। তিনি আরো বলেন, মাহবুব তালুকদার উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ইসির বিরুদ্ধে কথা বলে থাকেন। হয়তো উনার কোনো এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য, নির্বাচন কমিশনকে হেয় করার জন্য এই কথা বারবার বলেন। তার কথা মিথ্যাচার, অপ্রাসঙ্গিক, অপবাদ। নির্বাচনে সহিংসতা ও মৃত্যুর দায় নির্বাচন কমিশনের নয়। আমরা প্রত্যেকটি হত্যাকাণ্ডের জন্য মর্মাহত। এগুলো অপ্রত্যাশিত। আমরা এগুলো চাই না। প্রার্থীদের আমরা বারবার অনুরোধ করি, নির্বাচন হবে প্রতিযোগিতামূলক, প্রতিহিংসাপরায়ণ নয়, রক্তপাত নয়। প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে সহিংসতা হচ্ছে। পুলিশও অনেক সময় ভিকটিম হচ্ছে, আহত হচ্ছে, নিহত হচ্ছে। প্রচুর ধৈর্য সহকারে তারা দায়িত্বপালন করেন।

নির্বাচনের এই অবস্থা নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান এবং জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা জিএম কাদের বলেছেন, দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা এভাবে চলতে থাকলে দেশের রাজনীতি এবং রাজনৈতিক দলগুলো হুমকির মুখে পড়বে। দেশ থেকে রাজনীতি আর রাজনৈতিক দলগুলো হারিয়ে যাবে। নির্বাচন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। মনে হচ্ছে নির্বাচন কমিশন খুবই অসহায়। তাদের যে ফলাফল ধরিয়ে দেয়া হয়, তারা তাই ঘোষণা করে। কোথাও কোথাও প্রশাসন ও আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে একত্রিত হয়ে নির্বাচনী ব্যবস্থাকে কলুষিত করছে।

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।