যে নিয়ম বাস্তবতা-বর্জিত, সেই আইন বানানোর দরকারটা কী

100

– রাজিব আহমেদ
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম মুসলমান প্রধান দেশ। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় এই যে, এ দেশের অনেকে নামকাওয়াস্তে মুসলমান (মানে মুখে মুখে ঈমান থাকলেও কার্যত সেই অনুযায়ী আমল নাই)! অধিকাংশ মুসলমান নামধারীর ধর্মীয় জ্ঞান খুবই সীমিত (ধর্মচর্চার বেহাল দশার কথা বরং উহ্যই থাক)। করোনা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় দেশব্যাপী লকডাউন ঘোষণার পাশাপাশি মসজিদে নামাজ আদায়ের ক্ষেত্রেও বেশকিছু বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়েছে (যেমন : তারবিহ্-এর নামাজে ২০ জনের বেশি শামিল হতে নিরুৎসাহিত করা)।
প্রশ্ন হলো- বাংলাদেশের সব মসজিদের আকার (ধারণক্ষমতা) তো সমান নয়। ছোট মসজিদগুলোতে যেমন ঠেসে-ঠুসে ২০-২৫ জন একত্রে নামাজ আদায় করতে পারেন, আবার একত্রে সহস্রাধিক মুসল্লি নামাজ আদায় করেন, এমন মসজিদেরও তো অভাব নেই। তাহলে ছোট-বড় নির্বিশেষে সকল ক্ষেত্রে ২০ জনের কোটা নির্ধারণ কতখানি যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত? বাংলাদেশে একতলা মসজিদ যেমন আছে, তেমনি পাঁচতলা মসজিদও তো আছে। প্রত্যেক ফ্লোরে শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে ২০-২৫ জন করে নামাজ আদায় করলে সমস্যা কোথায়? নির্দেশনাটা বরং এমন হতে পারতো যে, প্রত্যেক মসজিদে ধারণক্ষমতার এক-তৃতীয়াংশ জায়গা খালি রেখে নামাজ আদায় করতে হবে (যেমনটি সামষ্টিক নিরাপত্তাজনিত কারণে হজ্বের সময়ে ক্বাবা শরীফেও অনুসরণ করা হয়)। তাহলে নির্দেশনাটি বাস্তবসম্মত হতো বলে মনে করি।
একই নির্দেশনায় মসজিদে ইফতার ও সেহেরি খাওয়ার ওপরেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। যারা এই আইন বানিয়েছেন (সিদ্ধান্ত দিয়েছেন), তারা কি জানেন- সব মসজিদের ইমাম সাহেবগণ মসজিদ সংলগ্ন ঘরে বসবাস করেন না? অধিকাংশ ইমাম সাহেবের বাসা মসজিদ সংলগ্ন নয় (এমনকি দূরবর্তী স্থানেও হতে পারে)। তাহলে দূরবর্তী ইমাম সাহেবদের পক্ষে বাসায় ইফতার শেষ করে দশ মিনিটের মধ্যে মসজিদে পৌঁছে মাগরিবের নামাজে ইমামতি করা কি সম্ভব? যে আইনে ফাঁক রয়ে যায়, সেই আইন বানানোর দরকারটা কী? রোজার মাসে খতমে তারাবিহ্ নামাজ আদায়ের জন্য হাফেজ সাহেবগণ সাধারণত মসজিদেই সাময়িকভাবে অবস্থান করেন (মানে সেখানেই তাঁরা থাকা-খাওয়ার সাময়িক ব্যবস্থা করে নেন)। কিন্তু সরকারি নির্দেশনা এ সকল হাফেজ-অতিথিদেরকে বিপাকে ফেলে দিয়েছে। হোটেল থেকে খাবার কিনলেও হোটেলে বসে খেতে দেবেন না, আবার মসজিদেও খাওয়া নিষেধ; তাহলে উপায়টা কী? যে নিয়ম আদৌ বাস্তবায়নযোগ্য নয় (বাস্তবতা-বর্জিত), সেই আইন তৈরি না করলেই কি নয়?
এ দেশের আম-জনতা সাধারণত আইন ভাঙতে চায় না। কিন্তু কোনো আইন যদি বাস্তবসম্মত না হয়, সেক্ষেত্রে আইন মেনে চলা কি সম্ভব (এমনকি যাদেরকে আইন কার্যকর করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তারাও যেখানে আইন প্রয়োগের ব্যাপারে পুরোপুরি নিঃসন্দেহ/আস্থাশীল নন)? সচেতনতামূলক যত প্রচারণাই চলুক না কেন, বাস্তবতা এটাই যে, করোনার প্রকোপ বেড়ে যাওয়ার পরেও সবাই বারবার হাত ধৌত করছেন না! একবার ধুলে পরেরবার হয়ত মনেই থাকে না (ভুলে যান) অথবা গাফিলতি করেন। কিন্তু মসজিদ একমাত্র জায়গা- যেখানে ঢোকার আগে নিশ্চিত সবাই হাত-মুখ-চোখ-কান-মাথা ও পা ধুয়ে নেন (ওজু করেন)। আর রোগের ন্যূনতম লক্ষণ দেখা দিলে রোগীরা চিকিৎসাসেবা গ্রহণ বাদ দিয়ে অন্তত মসজিদে যাবেন না। সুতরাং মসজিদ থেকে করোনা ছড়াতে পারে, এটা কোনোভাবেই বিশ্বাসযোগ্য/গ্রহণযোগ্য নয়। এমনটি যারা মনে করেন, তাদের ধর্মীয় ও সুস্বাস্থ্যের ব্যবহারিক জ্ঞান শূন্যের কোঠায় (তারা আসলে ইসলাম ধর্মের প্রকৃত অনুসারী বা সমর্থক/বিশ্বাসী নন)।
দুঃখজনক ব্যাপার হলো- মুসলমান প্রধান এই দেশে নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে সেইসব মানুষেরাই আসীন, যাদের অধিকাংশের ন্যূনতম ধর্মীয় জ্ঞান নেই। অল্প কিছু সরকারি কর্মকর্তার যদিও সেই জ্ঞান আছে, কিন্তু পদ-পদবি হারানোর ভয়ে তারাও চুপচাপ (যেমন : জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জনাব আবদুর রহিম ধর্ম ও বিজ্ঞানসম্মত সঠিক নির্দেশনা দিয়েও বিপাকে পড়ে গেছেন; কেউ তাঁর পাশে নেই)!
অসুস্থ হলে মানুষ দ্রুত চিকিৎসকের শরনাপন্ন হয় (আজকাল অবশ্য চিকিৎসা-ব্যবসায়ীদের খপ্পরেই বেশি পড়ছে)। কিন্তু কোনো কোনো রোগীর শেষ অবস্থায় চিকিৎসকেরাও যখন হাল ছেড়ে দেন, তখন রোগীর আত্মীয়-স্বজনেরা কেবলমাত্র সর্বশক্তিমানের ওপরেই ভরসা রাখেন। তো করোনার প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় আমাদের সবার উচিত- নামাজ রোজার পরিমাণ বাড়িয়ে দেওয়া; বেশি বেশি ইবাদত করে স্রষ্টার কৃপা ও অনুগ্রহ লাভ করা। বিশেষত রমজান মাস হলো রহমতের মাস। রমজান মাস এলে কবরের আজাবও স্থগিত রাখা হয়, সেখানে জীবন্ত মানবজাতিকে আল্লাহ্ সুবহানুতায়ালা কারোনার কবলে ফেলবেন, এটা হতেই পারে না। কিন্তু সেটাই ঘটছে মূলত আমরা আল্লাহর ওপরে পরিপূর্ণ আস্থা ও ভরসা রাখতে পারছি না বলে।
যে চীন দেশে প্রকাশ্যে নামাজ আদায় একপ্রকার নিষিদ্ধ, গতবছর করোনার প্রকোপ শুরু হলে সেখানেও মুসলমানদেরকে মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায়ের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছিল। চীনা সরকার এ ব্যাপারে সর্বাত্মক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। তারপরে ওখানে করোনার প্রকোপ কমে আসে। আর বাংলাদেশ মুসলমান প্রধান দেশ হওয়া সত্ত্বেও করোনার দোহাই দিয়ে মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায়ে নানারকম বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এর চেয়ে দুঃখজনক ঘটনা আর কীই-বা হতে পারে?
অনুগ্রহ করে মসজিদে যাতায়াত (অবশ্যই সুস্বাস্থ্যের বিধি-বিধান মেনে ও শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে) অবাধ করুন- যাতে মুসল্লির উপস্থিতি বাড়ে এবং সবাইকে জামাতে নামাজ আদায়ের সুযোগ করে দিন। কয়েকদিনের মধ্যেই করোনার প্রকোপ কমে যাবে ইনশাল্লাহ্। কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্যি যে, মুসলমান-প্রধান এই দেশে আমার উপরোক্ত কথার মর্মোপলব্ধি করার মতো মানুষের সংখ্যা খুবই নগণ্য! আরও দুঃখজনক ব্যাপার হলো- ধর্মীয় জ্ঞান যাদের প্রখর (অর্থাৎ যারা বোঝেন), সেই আলেম-ওলামাগণও পিঠ বাঁচাতে মৌনতা অবলম্বন করে (উচিত কথা বলা থেকে বিরত) আছেন!
বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের সেই বিখ্যাত উক্তিটি আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে- ‘এই পৃথিবী মন্দ লোকের খারাপ কাজের জন্য ধ্বংস হবে না, বরং ভালো ও বুদ্ধিমান মানুষগুলোর (উচিত কথা না বলে) নীরবতা পালনের কারণেই ধ্বংস হয়ে যাবে!’