চুয়াডাঙ্গা শনিবার , ৫ জুন ২০২১
আজকের সর্বশেষ সবখবর

যাত্রীরা গুনছেন দ্বিগুণ ভাড়া; অপ্রত্যাশিত যানজটে নাকাল শহরবাসী!

সমীকরণ প্রতিবেদন
জুন ৫, ২০২১ ৯:১৬ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

চুয়াডাঙ্গা শহরজুড়ে দাপট এখন ইজিবাইকের : সরকারি নির্দেশনা ও স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষিত

ভাড়া বাড়ালে এবং স্বাস্থ্যবিধি না মানলে মোবাইল কোর্টে ব্যবস্থা-ডিসি নজরুল ইসলাম
মেহেরাব্বিন সানভী:
চুয়াডাঙ্গা শহরজুড়ে দাপট এখন ইজিবাইকের। তীব্র যানজটের কারণে শহরবাসীর চরম ভোগান্তির প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে ইজিবাইক। ইজিবাইকের কারণে একদিকে যেমন শহরে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েছে, অন্যদিকে রাস্তায় পা ফেলার জায়গা নেই। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের মধ্যেও স্বাস্থ্যবিধি না মেনে চালকসহ যাত্রী উঠানো হচ্ছে ৮-৯ জন। আবার ভাড়াও নেওয়া হচ্ছে দ্বিগুণ। ফলে যাত্রী সাধারণের যাতায়াতে ইজিবাইক একদিকে যেমন গলার কাটা, অন্যদিকে শহরের মধ্যে বিকল্প পরিবহনের সংখ্যা কম থাকায় ইজিবাইকে ওঠা একরকম নিয়মে পরিণত হয়েছে। ইজিবাইকের দৌরাত্ম্যের হাত থেকে পরিত্রাণ পেতে বেশ কয়েকবার প্রশাসন থেকে নানা কর্মসূচি হাতে নিলেও তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। তাই এ ভোগান্তি থেকে সাধারণ মানুষের মুক্তি মেলেনি। চুয়াডাঙ্গা শহরের প্রাণকেন্দ্র বড় বাজার শহিদ হাসান চত্বর, কোর্ট চত্বর এলাকা, একাডেমি বাসস্ট্যান্ড, ফেরিঘাট রোড, হাসপাতাল সড়ক, রেলওয়ে স্টেশনসহ বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ সড়কে ইজিবাইকের যানজট দেখা যায়। যানজট নিরসনে সড়কে ট্রাফিক পুলিশ লাঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও ইজিবাইকের দৌরাত্ম্যে তারাও ক্লান্ত হয়ে পড়ে অনেক সময়।
চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার হিসাব অনুয়ায়ী শহরে ইজিবাইকের সংখ্যা এক হাজারের মতো। ইজিবাইক যানজট সমস্যা এড়াতে চুয়াডাঙ্গার সাবেক জেলা প্রশাসক জিয়াউদ্দিন আহমেদ হাসপাতাল সড়কে একমুখী সড়ক চালু করেন। তা কিছুদিন চললেও এখন সেটা আর কেউ মানে না। ফলে ইজিবাইকের কারণে সৃষ্ট যানজট সমস্যা রয়েই গেছে।
এদিকে, চুয়াডাঙ্গা শহরের ভেতর যে ইজিবাইকগুলো দেখা যায়, তার অধিকাংশই অন্য উপজেলা থেকে এসে শহরে ভাড়া খাটে। যার কারণে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। নতুনভাবে এই সমস্য সমাধানে প্রশাসন থেকে চার উপজেলার ইজিবাইকের রঙের ভিন্নতা আনার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এতে করে অন্য উপজেলার ইজিবাইক শহরে প্রবেশ করতে পারবে না। তবে বাস্তবে সে উদ্যোগের বাস্তবায়ন চোখে পড়েনি। তবে প্রশাসনের দাবি, বারবার চেষ্টা সত্ত্বেও নাকি থামানো যাচ্ছে না ইজিবাইকের দৌরাত্ম্য।
গতকাল শুক্রবার সরেজমিনে দেখা যায়, ছুটির দিনেও ইজিবাইকের জট লেগেছে শহরের প্রধান সড়কগুলোতে। বর্তমানে প্রয়োজনের তুলনায় পাঁচগুণ বেশি ইজিবাইক চলাচল করছে। এসব ইজিবাইকগুলোর সংখ্যা হবে প্রায় সাড়ে চার হাজারের মতো। অদক্ষ ও অপ্রাপ্ত বয়স্ক চালকেরা ছুটাচ্ছে ইজিবাইক। যার কারণেই সড়কে যানজট ও ছোট-বড় দুর্ঘটনা এখন এই শহরের নিত্যদিনকার সঙ্গী।
অপর দিকে, করোনাভাইরাসের এই প্রার্দুভাবের মধ্যেও একটি ইজিবাইকে চালকসহ ৯ জন যাত্রী উঠানো চোখে পড়ে। স্বাস্থ্যবিধির কোনো তোয়াক্কা না করে এভাবে প্রতিনয়িত যাত্রী পরিবহন করোনা সংক্রমণের আশঙ্কা বাড়াচ্ছে। হয়তো এই কারণে প্রতিদিনই চুয়াডাঙ্গাতে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে।
আবার অর্ধেক যাত্রী নিয়ে পরিবহনগুলোকে ৬০ শতাংশ ভাড়া বেশি নেওয়ার সরকারি নির্দেশনার অপপ্রয়োগ যেন ইজিবাইকেই বেশি প্রতিফলিত হচ্ছে। অর্ধেক যাত্রী নেওয়ার নির্দেশনা না মেনে, ভাড়া দু-গুণ নেওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছে চুয়াডাঙ্গার ইজিবাইক চালকেরা। একটি যাত্রীও কম নিতে ইচ্ছুক না তারা, আবার ১০ টাকার ভাড়া বেড়ে এখন ২০ টাকা। ভাড়া কম দিতে গেলে ইজিবাইক চালকরাই গালভরে শুনাচ্ছেন সরকারি নির্দেশনা আর স্বাস্থ্যবিধির কথা।
চাকরিজীবী আনিস মিয়া নামর এক ব্যক্তি আক্ষেপ নিয়ে জানান, আগে ইজিবাইকে ১০ টাকা দিয়ে দামুড়হুদা থেকে চুয়াডাঙ্গা আসতাম। এখন ২০ টাকার একটি টাকাও কম নেয় না তারা। আবার করোনার মধ্যেও একজন যাত্রী কম হলেও ইজিবাইক ছাড়বে না। যেখানে দুজন বসাও খুব কষ্টসাধ্য। সেখানে তারা তিনজন যেমনে হোক বসাবেই। শুধুমাত্র ভেতরেই অল্প একটু জায়গার মধ্যে ৬ জন আর চালকের দুইপাশে আরও দুজন। এভাবে যাত্রী নেওয়ায় অনেক সময় দুর্ঘটনাও ঘটে। তবে, সব চালকেরই একই কথা। ভাড়া দ্বিগুণ, যাত্রী কম নয়। সবমিলিয়ে এ যেন এক বিদি-খিস্তি অবস্থা।
মিনিবাস চালক আমিনুল ইসলাম একজন জানান, চুয়াডাঙ্গা শহরের তিন কিলোমিটার রাস্তা পার হতে অনেক সময় ভোগান্তির শিকার হতে হয়। ইজিবাইকের যানজটে অল্প এইটুকু রাস্তা, অর্থাৎ শহীদ হাসান চত্বর থেকে বাসস্ট্যান্ডে আসতে সময় লাগে প্রায় আধাঘণ্টা।
মুদি দোকানি রেজাউল করিম জানান, ইজিবাইকগুলো দিনদিন সড়কে বেপরোয়াভাবে চলাচল করছে। চলতি পথে হঠাৎ করেই রাস্তার পাশে সিগন্যাল ছাড়াই দাঁড়িয়ে পড়ে এসব ইজিবাইক। অদক্ষ চালকের কারণে নিয়মিত ঘটছে দুর্ঘটনাও। এখন এর সমাধান দরকার। নাহলে অবস্থা আরও ভয়াবহ হবে।
নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) চুয়াডাঙ্গা জেলার সভাপতি অ্যাড. আলমগীর হোসেন বলেন, ‘অদক্ষ চালকের কারণে ইজিবাইকে নানা দুর্ঘটনা ঘটে। দিনদিন ইজিবাইকের সংখ্যা বাড়ার ফলে যানজট এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চালকরা ইজিবাইক চালালে অন্তত দুর্ঘটনা কম হবে। তাই অতিদ্রুতই কার্যকরী পদক্ষেপ নিয়ে ইজিবাইকের চলাচল নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।’ করোনাভাইরাসের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মানার ব্যাপারে নজর দেওয়ার তাগিদও দেন তিনি।
ইজিবাইকের যানজটের বিষয়ে চুয়াডাঙ্গার পৌর মেয়র জাহাঙ্গীর আলম মালিক খোকন বলেন, ‘প্রশাসনের নির্দেশনা অনুযায়ী পৌরসভা থেকে শহরে ইজিবাইক নিয়ন্ত্রণে কাজ করা হচ্ছে। আগামী মাসে আরও কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’ ইজিবাইক সংগঠনগুলো ও পৌর পরিষদের সাথে আলোচনা করেই সকলের সহযোগিতায় এই সমস্যার পরিত্রাণ হবে বলে আশা রাখেন তিনি।
পূর্ববর্তী মেয়রের সময় থেকে পৌরসভা থেকে ইজিবাইকের নিবন্ধন করে কার্ড দেওয়া হয়ে থাকে, সেটি এখন চালু আছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে মেয়র খোকন বলেন, সেটি আপাতত বন্ধ আছে। সকলের সাথে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক নজরুল ইসলাম সরকার বলেন, ‘ইজিবাইকের কারণে সড়কে দুর্ঘটনা দিনদিন বেড়েই চলেছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে চার উপজেলায় ইজিবাইকগুলোর ভিন্ন রঙ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া হাইওয়ে-এর কোনো সড়কে ইজিবাইক চলতে পারবে না। জেলা ও উপজেলায় ঢোকার প্রবেশমুখে ছোট ছোট চেকপোস্ট বসিয়ে উপজেলার ইজিবাইক উপজেলার মধ্যে চলাচল নিয়ন্ত্রণে কাজ করানো হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় সর্বসম্মতিক্রমে এমনটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর থেকেই তা বাস্তবায়নে কাজ করা হচ্ছে।’
ডিসি নজরুল ইসলাম সরকার আরও বলেন, ‘শহরে যাতে যানজট না হয়, সেজন্য ট্রাফিক পুলিশ, রোভার স্কাউট ও স্বেচ্ছাসেবক দিয়ে নিয়মিত কাজ করানো হচ্ছে। ছোট্ট শহরের তুলনায় ইজিবাইকের সংখ্যা বেড়ে গেছে। সেটি অতিদ্রুতই নিয়ন্ত্রণ করা হবে। বিশেষ করে বাইরের উপজেলার ইজিবাইক শহরে প্রবেশ করতে না পারলে যানজট অনেকাংশে কমে যাবে।’ এছাড়া ইজিবাইকের ভাড়া বাড়ানোর কোনো নির্দেশনা নেই। ভাড়া বাড়ালে এবং স্বাস্থ্যবিধি না মানলে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও ডিসি জানান।

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।