যত্রতত্র পাহাড় কাটার ফলে ঝুঁকির মুখে পরিবেশ ॥ বৃষ্টি হলে পাহাড় ধসের আশঙ্কা

287

রোহিঙ্গা বসতিতে পাহাড়ের অপূরণীয় ক্ষতি

সমীকরণ ডেস্ক: কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ সড়ক। দু’পাশে যতদূর চোখ যায় দেখা গেল অসংখ্য ঝুপড়িঘর। কালো রঙের পলিথিন দিয়ে বানানো। পাহাড় কেটে, ধাপে ধাপে গড়ে ওঠেছে এসব ঝুপড়ি। সবুজ পাহাড়-বনাঞ্চল উধাও। মনে হলো সবুজ পহাড়ের পিঠে কালো আলকাতরা ঢেলে দিয়েছে কেউ। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নিপীড়ন ও নির্যাতনের হাত থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা কোনোরকমে মাথা গোঁজার জন্য গড়ে তুলেছে এই ঝুপড়ি। বন বিভাগের হিসাব অনুযায়ী এ আবাসনের জন্য কাটা পড়েছে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার একর এলাকার পাহাড়। এভাবে পাহাড় কর্তন ও বনাঞ্চল উজাড়ে ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটু ভারী বৃষ্টিপাত হলেই ধস নামতে পারে পাহাড়। হতাহত হবে বহু মানুষ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মাকসুদ কামাল বলেন, ‘মানবিক কারণে আমরা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছি। কিন্তু পাহাড়গুলো কেটে তারা যে আবাসস্থল বানাচ্ছে তাতে আমাদের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল। একসময় হয়তো রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান হবে, নতুন করে হয়তো গাছও লাগানো যাবে, কিন্তু পাহাড়গুলোর ক্ষতি আর পূরণ করা যাবে না। অন্যখান থেকে মাটি এনে তো আর পাহাড়ের কাটা জায়গা পূরণ করা যাবে না। এই পাহাড়গুলো ১৫-২০ মিলিয়ন বছরের (দেড় থেকে দুই কোটি বছর) পুরনো। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, পাহাড়গুলো কাটার ফলে এখন বৃষ্টি হলে পাহাড়ের মধ্যে পানি ঢুকে পড়বে। এতে যেকোনো সময় পাহাড়ে ধস নামতে পারে। ঘটতে পারে ভয়াবহ বিপর্যয়।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেছেন, সব রোহিঙ্গাকে কুতুপালংয়ে এক জায়গায় ক্যাম্পের ভেতরে নেয়ার কাজ শুরু হয়েছে। ধীরে ধীরে সবাইকে সেখানে নেয়া হবে। তিনি বলেন, সীমান্তবর্তী কুতুপালং ক্যাম্পের পাশে তিন হাজার একর এলাকা নিয়ে ক্যাম্প করে সাময়িকভাবে রোহিঙ্গাদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ক্যাম্পকে ২০টি ব্লকে ভাগ করে প্রতিটি ব্লকের জন্য একটি প্রশাসনিক ও পরিষেবা ইউনিট ও একটি গুদাম স্থাপন করা হচ্ছে, যাতে সব ধরনের সেবা দেওয়া সম্ভব হয়।
পরিবেশবাদীরা বলছেন, রোহিঙ্গা বসতির কারণে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। দ্রুত পরিবেশ বিপর্যয়কারী এই প্রক্রিয়া বন্ধ না করলে বড় রকমের প্রাকৃতিক ও সামাজিক বিপর্যয় ঘটবে।
গত বুধবার দুপুরে সরেজমিন ওই এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, নতুন করে যারা এসেছেন তারাও ঝুপড়িঘর বানাচ্ছে। উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের বালুখালী ঢালার মুখ, তাজনিরমারছড়া, শফিউল্লাহ কাটা, হাকিমপাড়া, টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের পুটিবনিয়া, রইক্ষ্যং এলাকায় বনাঞ্চল ধ্বংস করে রোহিঙ্গারা আবাস গড়ে তুলছেন। প্রতিদিনই এসব এলাকায় পাহাড় ন্যাড়া করে বসতি বানানো হচ্ছে। সেখানে বনের গাছপালা উজাড় করে, পাহাড় কেটে সমতল করছে তারা। যত দূর দেখা যায় পাহাড়ের চূড়ায়, পাদদেশে শত শত পলিথিনের ছাউনিযুক্ত ঘর। কেউ ঘর তৈরি করে বিশ্রাম নিচ্ছে, কেউ নতুন ঘর গড়ার কাজ করছে।