চুয়াডাঙ্গা শনিবার , ১৩ নভেম্বর ২০২১
আজকের সর্বশেষ সবখবর

মেয়াদোত্তীর্ণ ৯০ শতাংশ ফেরি দিয়েই চলছে নৌপথ

সমীকরণ প্রতিবেদনঃ
নভেম্বর ১৩, ২০২১ ১০:৪৬ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

ফাইল ছবিফেরিগুলোর বেশির ভাগই পুরনো ও দুর্বল শক্তির হওয়ায় চালকদের সেগুলো চালাতে গিয়ে মাঝেমধ্যেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বিপাকে পড়তে হচ্ছে। এতে ঘটছে নানা ধরনের বিপত্তি । প্রতিবছরই বর্ষা মৌসুমে স্রোতের সঙ্গে পাল্লা দিতে না পেরে কখনো কখনো ফেরি বন্ধ রাখার নজিরও রয়েছে। মেয়াদোত্তীর্ণ ৯০ শতাংশ ফেরি দিয়েই চলছে নৌপথের যোগাযোগ। গত এক বছরে পাঁচটি বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে পদ্মা সেতুর পিলারের সঙ্গে গত ২০শে জুলাই রো রো ফেরি শাহ্মখদুম, ২৩শে জুলাই শাহ্জালাল নামের আরেকটি ফেরি ধাক্কা খায় ১৭ নম্বর পিলারে, ৯ই আগস্ট বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীর ফেরি, ১৩ই আগস্ট ১০ নম্বর পিলারে ধাক্কা দেয় ‘কাকলি’ নামের ফেরি।  জুলাই  মাসে আরও দুটি ধাক্কার ঘটনা ঘটে। গত ২৭শে অক্টোবর মানিকগঞ্জের পাটুরিয়ায় শাহ্ আমানত নামের একটি রো রো ফেরি কাত হয়ে ডুবে যায়। ফেরিটিতে ১৭টি পণ্যবাহী ট্রাক ও ৫-৬টি মোটরসাইকেল ছিল। অবশেষে ১৩ দিন পর গত ৮ই নভেম্বর ৫টি বার্জ ক্রেন দিয়ে ফেরিটি উদ্ধার করা হয়।

বেসরকারি উদ্ধারকারী সংস্থা জেনুইন এন্টারপ্রাইজ প্রায় দুই কোটি টাকার বিনিময়ে উদ্ধারকাজে অংশ নেয়। জেনুইন এন্টারপ্রাইজের এমডি বদিউল আলম গণমাধ্যমকে জানান, ডুবে যাওয়া ফেরি আমানত শাহ্ উদ্ধারকাজ শেষ হয়েছে। এখন পর্যন্ত ফেরির তলদেশে ১০০টির বেশি ছিদ্র পাওয়া গেছে এবং  মেরামত করা হয়েছে। জানা গেছে, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) ডেনমার্ক থেকে ১৯৮০ সালে প্রায় ৫ কোটি টাকা দিয়ে এই আমানত শাহ্ ক্রয় করে। এরপর থেকে দেশের বিভিন্ন নৌরুটে চলেছে এই রো রো ফেরি ‘আমানত শাহ্’। তবে ফেরিটির বয়স ৩০ হয়ে যাওয়ার পর দুই দফায় সার্ভের মাধ্যমে ১০ বছর মেয়াদ বাড়িয়ে ফিটনেস দেয় কর্তৃপক্ষ। নৌযানের তালিকা অনুযায়ী ৩৩৫ জন যাত্রী এবং ২৫টি যানবাহন বহন করার ক্ষমতা ছিল। এর মোট ওজন ৮০৬.৬০ টন। তবে সর্বোচ্চ ১০.২৫ নটিক্যাল মাইল গতিতে চলার সক্ষমতা থাকলেও ফেরিটির ছিল না ফিটনেস।

বিআইডাব্লিউটিসি সূত্র জানায়, বর্তমানে বিআইডব্লিউটিসির বহরে থাকা ৫৩টি ফেরির অনেকগুলোই ৪০ বছরের বেশি পুরাতন। এর মধ্যে ২৬টিই মেয়াদোত্তীর্ণ। আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৪০ বছরের বেশি বয়সী নৌযান চালানোর সুযোগ না থাকলে ৯৫ বছর বয়সী ৫টি ফেরিও এখনো চলাচল করছে। পদ্মা নদীসহ দেশের বিভিন্ন নৌপথে চলাচলকারী এসব ফেরির বেশির ভাগেরই চলৎশক্তি প্রায় শেষের পথে। যেগুলো বেশি পুরনো সেগুলোর মেয়াদও শেষ হয়েছে। তবুও জোড়াতালি দিয়ে এগুলো চালানো হচ্ছে। অনেক ফেরির বয়স ৪০ বছরের বেশি হয়ে গেছে। এমনকি প্রায় একশ’ বছরের পুরনো ফেরিও রয়েছে ফেরিবহরে। কয়েকটি নিয়মিতই ডকইয়ার্ডে রাখতে হয় মেরামতের জন্য। ফলে কখনো সব ফেরি একসঙ্গে চালু রাখা যায় না। আবার এগুলোর বেশির ভাগেরই নেই প্রয়োজনীয় ফিটনেস। ১৯২৫, ১৯৩৮, ১৯৪৭ সালে নির্মিত ফেরি আছে একাধিক।

বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান সৈয়দ মো. তাজুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, ১৪টি ছাড়া বাকি সব ফেরির ফিটনেস রয়েছে। ঢালাওভাবে যে অভিযোগ করেছে তা সঠিক নয়। ফিটনেস না থাকলে তো আর এসব ফেরি চলার কথা নয়। তাজুল ইসলাম আরও বলেন, আমাদের ১২টি নতুন ফেরি অর্ডার দেয়া হয়েছে। এগুলোর কাজ প্রায় ৭০ শতাংশ হয়েছে। জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে এসব ফেরি হস্তান্তর হবে। ১৪টি ফেরির বয়স ৪০ বছরের বেশি।

মেয়াদোত্তীর্ণ ফেরি দিয়ে চলছে অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) গাড়ি পারাপার। বিআইডব্লিউটিসির শিমুলিয়া-বাংলাবাজার ও দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া রুটে চলাচলকারী বেশিরভাগ ফেরির ফিটনেস সনদের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০১৪ সালের ২৫শে জুলাই। গত সাত বছর ধরে ফিটনেস সনদ ছাড়াই চলছিল এ ফেরিগুলো। শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌরুটে ফেরি সার্ভিস বন্ধ থাকায় বিআইডব্লিউটিসির ১৮টি রো রো ফেরি সবগুলো দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া রুটে চলাচল করছিল। এসব ফেরির রয়েছে নানা কারিগরি ত্রুটি। অনেক ফেরিতে ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল স্টিয়ারিংয়ের ব্যবস্থা থাকলেও দুর্ঘটনার সময় মেকানিক্যাল স্টিয়ারিং অকার্যকর। বেশিরভাগ ফেরি ১৯৮০ সালে তৈরি করা হয়েছে। তাই ১৮টি রো রো ফেরির ১৪টিরই ফিটনেস সনদ নেই। বেশিরভাগ ফেরিতে নেই প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জামাদি। অনেক ফেরির বয়স ৪০ বছর পার হয়ে গেছে। আইন অনুযায়ী ৪০ বছরের বেশি বয়সী নৌযানের ফিটনেস সনদ দেয় না বাংলাদেশ নৌপরিবহন অধিদপ্তর। ফেরি শাহ্মখদুম ১৯৮৫ সালে তৈরি করা হয়। ওই হিসেবে ফেরির বয়স ৩৬ বছর। ওই ফেরির ৫০০ হর্সপাওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি ইঞ্জিন ও ঘণ্টায় প্রায় ১৯ কিলোমিটার বেগে চলার কথা। রো রো ফেরি শাহ্জালাল তৈরি করা হয়েছে ১৯৮০ সালে। এ ফেরিতে ৫০০ হর্সপাওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি ইঞ্জিন ও ঘণ্টায় প্রায় ১৯ কিলোমিটার গতিতে চলার কথা। রো রো ফেরি ও বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীর ফেরির একই সমান শক্তিসম্পন্ন দুটি ইঞ্জিন রয়েছে। এটির গতিবেগ ঘণ্টায় প্রায় ১৯ কিলোমিটার। ফেরি কাকলী তৈরি করা হয় ১৯৭৪ সালে। এ ফেরিটির বয়স ৪৭ বছর। নেই ফিটনেস সনদ। এছাড়া ডাম্প ফেরি থোবাল ১৯৩৮ সালে, ফেরি রায়পুরা, রানীক্ষেত ও রানীগঞ্জ ১৯২৫ সালে তৈরি করা হয়। এগুলোরও ফিটনেস সনদ নেই।

এই দুরবস্থা থেকে উত্তরণে সরকার জরুরি ভিত্তিতে ১২টি শক্তিশালী ফেরি নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। এরই মধ্যে এসব ফেরিসহ মোট ৩৫টি বিভিন্ন ধরনের নৌযান নির্মাণের কার্যাদেশ দিয়েছে বিআইডাব্লিউটিসি। ফেরি ছাড়াও রয়েছে যাত্রীবাহী অত্যাধুনিক ১০টি নৌযান। বাকিগুলোর মধ্যে টাগবোট, ট্যাংকার, সি-ট্রাকও রয়েছে। দেশের ৩টি নৌযান নির্মাণ প্রতিষ্ঠানকে গত জুলাই মাসে এই কার্যাদেশ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১৮টি নৌযান তৈরি হচ্ছে ঢাকার কাছেই গজারিয়ায় থ্রি অ্যাঙ্গেল মেরিন লিমিটেডের ডকইয়ার্ডে। বাকিগুলো তৈরি হচ্ছে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী ও আনন্দ শিপইয়ার্ডে। কার্যাদেশ পাওয়ার পর এরই মধ্যে প্রাথমিক কাজ শুরু করেছে নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো।

বিআইডাব্লিউটিসি সূত্র জানায়, আগে দেশে ফেরি তৈরি হতো না। বাইরে থেকে তৈরি করে আনতে হতো। দেশেই ফেরি তৈরি শুরু হলেও এতদিন বিভিন্ন সরকারের সময় নতুন ফেরি তৈরির দিকে খুব একটা নজর দেয়া হয়নি। এখন ধীরে ধীরে পুরনো ফেরি বাদ দিয়ে নতুন ফেরি নামানোর দিকে নজর দেয়া হয়েছে।  ফেরি ও অন্যান্য নৌযান নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম থ্রি অ্যাঙ্গেল মেরিন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী আমিনুল ইসলাম বলেন, আমরা ৬টি ইউলিটি ফেরিসহ মোট ১৮টি নৌযান তৈরির দায়িত্ব পেয়েছি। ফেরি ছাড়া অন্যগুলোর মধ্যে রয়েছে দুটি টাগবোট, দুটি ট্যাংকার, চারটি সি ট্রাক ও ৩টি অত্যাধুনিক যাত্রীবাহী নৌযান।’ তিনি বলেন, এর আগেও আমরা সরকারকে অনেকগুলো নৌযান দিয়েছি। সবগুলোই সময়মতো দেয়া হয়েছে। এবারো আশা করি, নির্দিষ্ট সময়ের আগেই আমরা ফেরিগুলো দিতে পারবো। ওই প্রকৌশলী বলেন, ফেরির পাশাপাশি এবার তারা দেশের নৌপথের জন্য সরকারি উদ্যোগে বিশ্বমানের ৩টি যাত্রীবাহী নৌযান তৈরি করবেন। আরও কয়েকটি একই ধরনের নৌযান তৈরির কার্যাদেশ পেয়েছে অন্য দুটি প্রতিষ্ঠান।

অনুসন্ধানে জানা যায়, মেয়াদোত্তীর্ণ ২৬টি ফেরির ২০টিরই বয়স চল্লিশের বেশি। যদিও এসব ফেরি চলাচলে নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে ওয়াকেফহাল নন ফেরির মাস্টার বা চালকরা। মেয়াদোত্তীর্ণ ফেরিগুলো হলো- ফেরি কর্ণফুলী, ফেরি ঢাকা ও ফেরি কুমিল্লার বয়স ৫৮ বছর। ফেরি কুমারী, ফেরি করবী ও ফেরি কন্তরীর বয়স ৪৯ বছর। ফেরি কেতকীর বয়স ৪৮ বছর। ফেরি কাকলী, ফেরি কামিনী, ফেরি কিশোরী, আইটি ৮-৩৯০ ও ফেরি ফরিদপুরের বয়স ৪৭ বছর। ফেরি কপোতী, আইটি ৮-৩৯১, আইটি ৮-৩৯৪ ও আইটি ৮-৩৯৫ বয়স ৪৬ বছর। আইটি ৮-৩৯৬ ও আইটি ৮-৩৯৭ বয়স ৪৫ বছর। ফেরি আমানত শাহ ও ফেরি শাহ্জালালের বয়স ৪১ বছর। ফেরি শাহ্ আলী ও ফেরি শাহ্ মখদুমের বয়স ৩৭ বছর। ফেরি শাহ্ পরান ও ফেরি খানজাহান আলীর বয়স ৩৪ বছর। ফেরি এনায়েতপুরী ও ফেরি কেরামত আলীর বয়স ৩৩ বছর। এ ছাড়া ১৯২৫ সালে তৈরি পাঁচটি ফেরির বয়স হয়েছে ৯৫ বছর। এগুলো হলো- টেপলো, রায়পুরা, রানীগঞ্জ, রানীক্ষেত ও রামসিরি। এ ফেরিগুলো এতদিন শিমুলিয়া-বাংলাবাজার রুটে পদ্মা সেতুর নিচ দিয়ে চলাচল করতো। সম্প্রতি পদ্মা সেতুর পিলারে ফেরির ধাক্কা লাগার ঘটনার পর এসব ফেরি বন্ধ রাখা হয়েছে। অন্যদিকে মেয়াদ রয়েছে এমন ফেরিগুলোর মধ্যে রো রো বা বড় ফেরি ৬টি বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীর, বীরশ্রেষ্ঠ বরকত, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান, বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান, বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন ও গোলাম মাওলা। এর মধ্যে জাহাঙ্গীর ও বরকত ফেরি দুটির ৩০ বছর পূর্ণ হতে আর মাত্র এক বছর বাকি রয়েছে। এছাড়া চলতি বছরে বিআইডব্লিউটিসির বহরে ৪টি নতুন ফেরি যোগ হয়েছে। এগুলো হলো বেগম রোকেয়া, বেগম সুফিয়া কামাল, কদম ও কঞ্জুলতা।

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।