চুয়াডাঙ্গা বৃহস্পতিবার , ৪ আগস্ট ২০২২
আজকের সর্বশেষ সবখবর

মূল্যস্ফীতির চাপে বেশি ভুগছে গ্রামের মানুষ

সমীকরণ প্রতিবেদনঃ
আগস্ট ৪, ২০২২ ৮:৫০ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

সমীকরণ প্রতিবেদন: পণ্যের মূল্য বৃদ্ধিতে শহরের তুলনায় গ্রামের মানুষ বেশি ভুগছে। চাল, ডাল, আটা, তেল থেকে শুরু করে প্রায় সব ধরনের নিত্যপণ্যের দাম শহরের চেয়ে গ্রামে বেশি। এছাড়া পরিবহন, চিকিৎসা, পোশাক ও আসবাবের জন্যও গ্রামের মানুষকে বেশি অর্থ খরচ করতে হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হালনাগাদ প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এমন তথ্য মিলেছে। গতকাল বুধবার বিবিএস’র ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, গত জুলাই মাসে গ্রামাঞ্চলে গড় মূল্যস্ফীতি হয়েছে শতকরা ৮ দশমিক ০২ শতাংশ। একই সময়ে শহরের গড় মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৫১ শতাংশ। অর্থাৎ গত মাসে গ্রামাঞ্চলের  একজন মানুষ যেখানে একটি পণ্য কিনেছেন ১০৮ টাকা ২০ পয়সায়, সেখানে একই পণ্য শহরের একজন গ্রাহক কিনেছেন ১০৬ টাকা ৫১ পয়সায়। আবার শহরাঞ্চলে খাদ্যের মূল্যস্ফীতি যেখানে ৬ দশমিক ৮৪ শতাংশ, সেখানে তা গ্রামে ৮ দশমিক ৭৯ শতাংশ। খাদ্য বহির্ভূত মূল্যস্ফীতিও শহরের তুলনায় গ্রামে বেশি। জুলাইয়ে শহরাঞ্চলে খাদ্য বহিভর্ভূত মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ১৫ শতাংশে উঠেছে, যা গ্রামে ৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) মানুষের জীবনযাত্রার সব ধরনের উপকরণের মূল্য ও চাহিদা বিশ্লেষণ করে প্রতি মাসে এগুলোর দাম বাড়া-কমার ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতির হিসাব প্রকাশ করে।

এতে খাদ্য, পানীয়, টোব্যাকো, পোশাক-পরিচ্ছদ, জুতা, বিভিন্ন সেবার মূল্য, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, ফার্নিচার, অন্যান্য গৃহসজ্জা, গৃহসামগ্রী, চিকিৎসা ব্যয়, পরিবহন, বিনোদন, শিক্ষা ও সংস্কৃতি এবং অন্যান্য পণ্য ও সেবার মূল্যসহ জীবনযাত্রার প্রায় সব ধরনের উপকরণ থাকে। এগুলোর সমন্বয়ে একটি সূচক তৈরি করে। এতে খাদ্যপণ্যের ওপর ভর থাকে অর্ধেকের বেশি। খাদ্যবহির্ভূত পণ্যে থাকে কম।

শহরাঞ্চলের তুলনায় গ্রামাঞ্চলের মূল্যস্ফীতির হার বেশি হওয়ার কারণ জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. এবি মীর্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, গ্রাম ও শহরের মানুষের খরচের বাস্কেটের মধ্যে ভিন্নতা রয়েছে। গ্রামের মানুষ আয়ের বেশিরভাগ অর্থ খাদ্যের জন্য ব্যয় করে। সেখানে শহরের মানুষ খাদ্যের জন্য কম অর্থ ব্যয় করে। বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে খাদ্যের মূল্য যে পরিমাণে বেড়েছে সে অনুযায়ী অন্যান্য পণ্যের দাম বাড়েনি। বেশিরভাগ নিত্যপণ্যের দামই বেড়েছে। সেক্ষেত্রে গ্রামের মানুষ যেহেতু খাদ্যের জন্য বেশি অর্থ ব্যয় করে সেহেতু শহরের তুলনায় তাদের খাদ্যে মূল্যস্ফীতির পরিমাণ বেড়েছে। অন্যদিকে খাদ্য বহির্ভূত পণ্যে শহরের তুলনায় গ্রামে মূল্যস্ফীতি বেশি হওয়ার কারণ হিসেবে তিনি পরিবহন খরচ ও বিপণন ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করেন।

এ প্রসঙ্গে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, আমাদের বেশকিছু নিত্যপণ্য আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আমদানি করতে হয়। এরপর আমদানি করা পণ্যগুলো শহরাঞ্চলে আসে। পরবর্তীতে সেগুলোকে আবার গ্রামাঞ্চলে পাঠানো হয়। এসব পণ্য পরিবহন, বিপণন ও বাজারজাতকরণের জন্য কোনো কোনো সময় মূল্য বেড়ে যায়। এছাড়া অনেক সময় গ্রামে উৎপাদিত পণ্য শহরে বেশি পরিমাণে চলে আসে। তখন গ্রামে ওই পণ্যগুলো দুষ্প্রাপ্য হয়ে যায়। তখন গ্রামে সে সকল পণ্যের দাম কিছুটা বেড়ে যায়। তবে গ্রামের থেকে শহরাঞ্চলের মূল্যস্ফীতি খুব বেশি হয় না বলে জানান তিনি। গত জুলাই মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও বেড়েছে খাদ্য বহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী জুলাই মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৪৮ শতাংশে, যা জুন মাসে ছিল ৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ। খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি কমে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ১৯ শতাংশে, যা আগের মাসে ছিল ৮ দশমিক ৩৭ শতাংশ। অন্যদিকে খাদ্য বহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৫৮ শতাংশে, যা জুন মাসে ছিল ৬ দশমিক ৫১ শতাংশ।

সার্বিক মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমার কারণ জানতে চাইলে ড. এবি মীর্জ্জা আজিজ বলেন, সরকার টিসিবি থেকে স্বল্পমূল্যে পণ্য বিক্রি করছে। এটার কারণে জিনিসের মূল্য কিছুটা কমেছে। এছাড়া ইউক্রেনের গম রপ্তানির বিষয়ে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে একটি চুক্তি হয়েছে। এটাও একটি কারণ হতে পারে।  অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে এটা ইতিবাচক দিক। তবে মূল্যস্ফীতি যেটির তুলনায় কমেছে সেই মূল্যস্তর ইতিমধ্যে অনেক উপরে উঠে গেছে। তিনি বলেন, ১০০ থেকে ১১০ হয়েছে। তারপর ১১০ থেকে ১১৮ হয়েছে। সেক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার তো কমলো। কিন্তু এটা তো ১০০ থেকে ১১৮ হয়ে গেল। সুতরাং আমি বলবো কিছুটা পড়তির দিকে এটি ইতিবাচক। কিন্তু মূল্যস্তর ইতিমধ্যে অনেক উপরে আছে। সেখান থেকে কিছুটা কমলেও মানুষের ক্রয়ক্ষমতার উপরে যে চাপ সেটা অব্যাহত আছে।

এ বিষয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, বাজারে চালের দাম বাড়েনি; কোনো কোনো ক্ষেত্রে কমেছে। ভোজ্য তেলের দাম ১৮ থেকে ২০ টাকা কমেছে। ডালের দাম বাড়েনি।  এসব কারণে খাদ্যে মূল্যস্ফীতি কমেছে। এর প্রভাব পড়েছে সার্বিক মূল্যস্ফীতিতে। তিনি জানান, ৪২২টি পণ্যের দাম নিয়ে মূল্যস্ফীতির এই হিসাব করে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো। হিসাব অনুযায়ী সার্বিক মূল্যস্ফীতি জুলাই মাসে কমেছে দশমিক ৮ শতাংশ। আর খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমেছে দশমিক ১৮ শতাংশ।  তিনি আরও বলেন, আমরা এখন সব শ্রেণির মানুষের তথ্য এক করে গড় হিসাব করি। তবে আগামীতে নিম্ন আয়ের মানুষের ব্যবহৃত সবচেয়ে বেশি ২০ থেকে ২২টা পণ্য নিয়ে আলাদা মূল্যস্ফীতির হিসাব করার পরিকল্পনা আছে। নিম্ন আয়ের মানুষের তুলনায় ধনীরা ৬০ থেকে ৭০টা পণ্য বেশি ব্যবহার করেন।

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।