চুয়াডাঙ্গা রবিবার , ১৬ অক্টোবর ২০১৬

মুজিবনগরের তারানগর গ্রামে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিকে আক্রান্ত প্রায় প্রত্যেক পরিবার সুপেয় পানির তীব্র সংকট : এই জনপদ মৃত্যুপুরিতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা!

সমীকরণ প্রতিবেদন
অক্টোবর ১৬, ২০১৬ ১:২৭ অপরাহ্ণ
Link Copied!

IMAGE00056মুনশী মোকাদ্দেস হোসেন মেহেরপুর (মুজিবনগর) থেকে: মেহেরপুর জেলার মুজিবনগর উপজেলার বাগোয়ান ইউনিয়নের তারানগর গ্রামে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিকে আক্রান্ত প্রায় প্রতিটা পরিবারই। এ সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের জন্য এই প্রতিবেদক গেলে আর্সেনিকে আক্রান্ত  স্কুল পাড়ার রাফিজা (৪৫) বলেন, “আমার শরীর খুলে যদি দেখাতে পারতাম, তাহলে সরকার আমাকে চিকিৎসার জন্য সাহায্য করত। রাতে প্রচন্ড যন্ত্রনা ও ব্যাথা করে।” এরপর পরই রোগিরা ভীড় করতে থাকে, সকলের আকুতি সুপেয় পানি আর উপযুক্ত চিকিৎসা। স্কুলের পাশে চা বিক্রেতা শওকত আলী ঘরামী বলেন, স্কুলে সেভ দ্য চিল্ড্রেন কর্তৃক স্থাপিত যে ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প¬্যান্ট বসিয়েছে চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট না। তারানগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক প্রশান্ত মন্ডল মুঠোফোনে বলেন, বিদ্যালয়ের ৩ শত ছাত্র-ছাত্রী এ পানি পান করে, পাশাপাশি এ পাড়ার প্রতিটি পরিবার এ সুবিধাভোগ করে। তবে এ পাড়ার লোকসংখ্যার তুলনায় পানির সরবরাহ অপ্রতুল। পানি ফুরিয়ে গেলে কয়েকঘন্টা তালা মেরে রাখি। তারপর পানি জমা হলে আবার তালা খুলে দিই। এতে শিক্ষার্থীদের কষ্ট করতেই হয়। স্কুল কর্তৃপক্ষ ওয়াটার ট্রিটমেন্ট  প¬্যান্ট স্থাপনের কোন পরিকল্পনা করছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ ধরনের কোন পরিকল্পনা নেই। তবে সংশি¬ষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। এ ব্যাপারে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপ-সহকারী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, তারানগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১ লাখ ৮৬ হাজার টাকা ব্যয়ে এআইআরপি (আর্সেনিক অ্যান্ড আয়রন রিমুভাল প¬ান্ট) আগামি জুলাই/১৭তে বসানো হবে। আর্সেনিকের কত মাত্রা তারানগরে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মাটিতে একশ ছাড়িয়ে গেছে, আর নলকূপে একশ ভাগ নির্ণয় করা হয়েছে। তারানগরের বিলপাড়া, মিস্ত্রিপাড়া ক্লাবপাড়ায় তথ্য সংগ্রহের জন্য গেলে যে চিত্র দেখা গেল তাহলো ক্লাব পাড়ার ওয়াটার প¬ান্ট দুবছর ধরে অকেজো হয়ে আছে। এগুলো তত্ত্বাবধানের জন্য একটি করে কমিটি থাকলেও জনগণ সচেতনতার অভাবে এগুলো চালানো সম্ভব হচ্ছেনা। এ ব্যাপারে ঐ কমিটির সভাপতি আরিফ মাস্টার বলেন, এ প¬ান্টের অধীনে ১২০টি সুবিধাভোগী পরিবার আছে, কিন্তু তারা এর বিদ্যুৎ বিল দিতে চাইনা। সরকারিভাবে এর ব্যবস্থা করলে ভালো হয়। এ ব্যাপারে জনস্বাস্থ্য উপসহকারি প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম IMAGE00054বলেন, জেলা প্রশাসক আয়োজিত সভায় আবাসিক হারে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য পল¬ী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তবে বিনামূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব নয়। সুবিধাভোগীরা বিদ্যুৎবিল না দিলেও মিস্ত্রি পাড়ার পানি সরবরাহ চালু রয়েছে। এখানেও চাহিদার তুলনায় পানি সরবরাহ কম বিধায় মানুষ মালেক মাষ্টারের কূয়ার আর্সেনিকমুক্ত পানি পান করে আসছে। আশ্চর্য্যরে বিষয় হলো একূয়ার পাশেই বিশাল পদ্মবিল, এ বিলের পানিতেও আর্সেনিক। বিল পাড়ার তাহাজদ্দিন বলেন, আমাদের খাবার চালেও পরীক্ষাতে আর্সেনিক পাওয়া গেছে। বাধ্য হয়ে আমাদের ঐ চালের ভাত খেতে হচ্ছে। জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে মানবদেহে দশ বছর পর্যন্ত এ জীবাণু বেঁচে থাকে। সচেতনতার পাশাপাশি চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হবে। তারানগরের বিলপাড়ায় দেখা হলো আর্সেনিক আক্রান্ত ফজলুল হক (৫৫) পিতা মৃত নিয়ত আলী, লস্কর (৬০) পিতা বাল¬ক মন্ডল, হামিদুল (৫০) পিতা মৃত মহিরদ্দিন, সাহার আলি (৪৫) পিতা পাঁচু শেখ, রওশনারা (৪০) পিতা আয়ুব আলি, পপি (১৩) পিতা আনসার আলি, রাফিয়া খাতুন স্বামী আনসার আলি, জেসমিন (৩৫) স্বামী শাহিন আলম, ইউনুচ (৫০) পিতা মৃত খোদাবক্স, হোসেন (৩৫) পিতা মৃত হেকমত, আয়ুব মন্ডল (৪০) পিতা মৃত আহাম্মদ মন্ডল, সাবরিনা (৪৫) স্বামী নজরুল, মেহেজান (৬৫) স্বামী ফকির মোহাম্মদ, গফুর (৫০) পিতা ফকির মন্ডল, সুফিয়া (৪০) স্বামী আ: গফুর, আরজিনা (২৫) স্বামী নজরুল, মধুমালা( ৩৫) স্বামী আ: সালাম, সাইফুল (৩৫) পিতা অম্মত মন্ডল, আমেনা (৫০) স্বামী নওশাদ, গরিবুল¬া (৬০) পিতা মৃত IMAGE00051আলিমদ্দিন শেখ, শরিফউদ্দিন মন্ডল (৩৫) পিতা করিম বক্স, মন্টু (৩০) পিতা মৃত তরফদারের সাথে। তারানগর থেকে তথ্য সংগ্রহ শেষে ফেরার পথে জয়পুর তারানগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মাঠে ক্রিকেট খেলায় ব্যস্ত বেশ কিছু ছাত্রের সাথে দেখা হলে তাদের নলকূপে আর্সেনিক আছে কিনা জানতে চাইলে তারা বলে এই বিষ আছে বলেই আমরা বিশ মিনিট পথ হেটে গিয়ে তারানগর স্কুল থেকে বোতলে করে পানি নিয়ে আসি। এতে আমাদের সময়ের অপচয় ও কষ্ট হয়। এর সত্যতা যাচাইয়ের জন্য বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের সাথে মুঠোফোনে কথা বললে তিনি এর সত্যতা স্বীকার করেন। তিনি আরও বলেন, অনেক রিপোর্ট, ফরম পূরণ করেছি কোন সুরাহা হয়নি। এ প্রেক্ষিতে জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা বলেন, যেহেতু তারানগরের মত জয়পুরেও একই অবস্থা, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানালে এ সমস্যার সমাধান হবে। এদিকে বাগোয়ান নতুন পাড়ায় আর্সেনিকের পরীক্ষা চালিয়ে ভবরপাড়া কারিতাস (এনজিও) অসহনীয় আর্সেনিকের সন্ধান পেয়েছেন বলে জানা গেছে। এ পাড়ায় সবুরের ছেলে করিমন চালক রফিকুল ইসলাম (২৯) ভয়াবহ আর্সেনিকে আক্রান্ত। এভাবে আর্সেনিক ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে থাকলে আক্রান্ত গ্রামের পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোতেও এর প্রভাবে এই জনপদ এক সময় মৃত্যুপুরিতে পরিণত হবে বলে আশঙ্কা করছে এলাকাবাসী। এখনই এর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে সংশি¬ষ্ট কর্তৃপক্ষ এমনটাই গ্রামবাসীর প্রত্যাশা।

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।