মিয়ানমারে দমনপীড়নে ঢাকার উদ্বেগ: রাষ্ট্রদূতকে তলব সীমান্তে অনুপ্রবেশ থামেনি : কক্সবাজারে আটক ৭০ : বিজিবির সতর্ক পাহারা

254

ড়ড়ড়ড়ড়ড়ড়ড়ড়ড়ড়7

সমীকরণ ডেস্ক: মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর দমনপীড়নের কারণে সৃষ্ট মানবিক সংকটে বাংলাদেশ উদ্বেগ জানিয়েছে। অবিলম্বে সেখানকার নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে দেশটিকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। বুধবার দুপুরে ঢাকায় মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত মিউ মিন সানকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করে এ উদ্বেগ জানানো হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (দ্বিপক্ষীয় বিষয়াবলি) কামরুল আহসানের কার্যালয়ে তাকে তলব করা হয়। বৈঠক শেষে বেরিয়ে কামরুল আহসান সাংবাদিকদের বলেন, রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি নিয়ে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতের কাছে তাদের উদ্বেগ তুলে ধরেছেন। সেখানকার লোকজনের দেশে ফিরে যাওয়ার পথ নিশ্চিত করতে তারা তাদের পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে বলেছেন। এ ব্যাপারে রাষ্ট্রদূতের হাতে একটি কূটনৈতিক পত্র দেয়া হয়েছে। গত মাস থেকে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নৃশংস হামলা চলছে। সেখানে আন্তর্জাতিক ত্রাণকর্মীদের ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না। এ হামলা অব্যাহত থাকায় আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়ছে। বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী রাজ্যটিতে জঙ্গি নিধনের নামে নির্বিচারে হত্যা, নারী ও শিশুদের নির্যাতন এবং বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ। সীমান্তে অনুপ্রবেশ থামেনি : কক্সবাজার প্রতিনিধি জানান, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ এখনো থামেনি। মিয়ানমার সরকারের বর্বরোচিত নির্যাতনের ফলে সে দেশের শত শত রোহিঙ্গা এদেশে আশ্রয় নেয়ার চেষ্টা করছে। তারা রাতের সময়কে অনুকূল মনে করে পারাপারের চেষ্টা করে। ইতোমধ্যে প্রায় সহস্রাধিক রোহিঙ্গা টেকনাফের নয়াপাড়া ও উখিয়ার কুতুপালং অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছে। এ ছাড়াও সীমান্তের বিভিন্ন জঙ্গল ও পাহাড়ের পাদদেশে আশ্রয় নিয়েছে অন্তত সহস্রাধিক রোহিঙ্গা। আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা নারী ও শিশুদের নিয়ে দুর্বিষহ দিনযাপন করছে। সীমান্ত এলাকার বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্রে এ খবর জানা গেছে। গত সোমবার তুমব্রুর ঘুমধুম সীমান্ত পথে আসা মিয়ানমারের মংডুর জাম্বুনিয়া এলাকার মো. জুবাইর (৬০) বলেন, ১০ কিলোমিটার পায়ে হেঁটে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে রাতের আঁধারে উখিয়ার কুতুপালং অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা টাল এলাকার পাহাড়ের পাদদেশে অশ্রয় নিয়েছেন। তার পরিবারের সদস্য সংখ্যা নারী ও শিশুসহ ১১ জন। তিনদিন ধরে শুকনো খাবার খেয়ে কোনোরকমে বেঁচে আছেন। সন্তান-সন্তুতি নিয়ে কিভাবে দিন কাটাব এ চিন্তায় আছেন। তিনি বলেন, মিয়ানমারে নিজেদের প্রায় দেড় একর বসতভিটাসহ ধানী জমি ছিল। হালের বলদ ছাড়াও গৃহপালিত হাঁস-মুরগি, ক্ষেতখামার ইত্যাদি ছিল। সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে কোনোরকমে পালিয়ে এসেছেন পরিবার নিয়ে। আগে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা বস্তির বাসিন্দা আবু তৈয়ব জানান, সোমবার ভোররাত থেকে যেসব রোহিঙ্গা সপরিবারে এসেছে, তারা বস্তির বিভিন্ন বাড়িঘরে আশ্রয় নিয়েছে। মোহাম্মদ হাসেম (৩০) নামে আরেক অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গা জানান, তারা মংডু কেয়ারিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। মিয়ানমারের সেনাসদস্যরা তাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়ায় ৪০ দিন ধরে বিভিন্ন বনজঙ্গলে অবস্থান নেয়ার পর প্রায় ৬ মাইল পাহাড়ি পথ অতিক্রম করে উনচিপ্রাং সীমান্ত দিয়ে কুতুপালং বস্তিতে আশ্রয় নিয়েছেন। সীমান্ত পারের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, তারা নৌকা ভাড়া করে নাফ নদী পার হয়ে সেখান থেকে গাড়িতে করে কুতুপালং পৌঁছেছেন। তার পরিবারের সদস্য সংখ্যা হচ্ছে ১০ জন। অনুপ্রবেশের সময় তারা একসঙ্গে ১৫/১৭ পরিবারের শতাধিক রোহিঙ্গা উনচিপ্রাং সীমান্ত দিয়ে এপারে এসেছেন। বর্তমানে উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা টালে আশ্রয় নিয়েছেন। বস্তির বেশকিছু রোহিঙ্গা তাদের শুকনো খাবার খেতে দিয়েছেন। ভাতের দেখা পাননি এক সপ্তাহ ধরে। যেভাবে ঢুকছে রোহিঙ্গারা উখিয়ার বালুখালী, রহমতের বিল, পালংখালী, আনজিমানপাড়া ও তুমব্রু সীমান্ত পয়েন্ট, টেকনাফ সীমান্তের হোয়াইক্যং উলুবনিয়া, লম্বাবিল, কাঞ্জরপাড়া, খারাংখালী, ঝিমংখালী, উনচিপ্রাং, হ্নীলা ইউনিয়নের জাদিমুড়া, নয়াপাড়া, নাথমুড়াপাড়া, গুদামপাড়া, ফুলের ডেইল, হোয়াব্রাং, নাইক্ষ্যংখালী, আনোয়ার প্রজেক্ট দিয়ে রাতের বেলা ও ভোররাতে অনুপ্রবেশের এ ঘটনা ঘটছে। অনুপ্রবেশের পর রোহিঙ্গা নারী-শিশুরা বিভিন্ন আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে, লেদা ও কুতুপালং অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা ক্যাম্প, নয়াপাড়া শরণার্থী ক্যাম্প ও সীমান্ত এলাকার বিভিন্ন মানুষের বাড়িঘরে আশ্রয় নিচ্ছে। উখিয়ার কয়েকটি সীমান্ত এলাকা দিয়ে অনুপ্রবেশকারী মিয়ানমারের বুচিদং, নাচিদং, রাইম্যাবিল, লদাইং ও জাম্বুনিয়াসহ বেশ কয়েকটি এলাকা থেকে আসা কয়েকটি দলের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এক সপ্তাহ ধরে মিয়ানমার সেনাবাহিনী তাদের গ্রামগুলোতে হামলা চালিয়ে অধিকাংশ পুরুষদের আটক করে নিয়ে গেছে। তাদের বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। পরিবারের অনেককে হত্যা করে ও নারীদের ধর্ষণ করেছে। বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়ার পর তারা মিয়ানমারের নাফ নদী উপকূলে প্যারাবন ও জঙ্গলে অনাহার-অর্ধাহারে বেশ কয়েকদিন কাটানোর পর শেষে জীবন বাঁচাতে তারা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে। আরও কয়েক হাজার রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও শিশু বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের জন্য অপেক্ষা করছে বলে জানায় তারা। সীমান্তে বিজিবির সতর্ক পাহারা: টেকনাফের বিজিবি-২-এর ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক লে. কর্নেল আবুজার আল জাহিদ জানান, অনুপ্রবেশ রোধে বিজিবি সদস্যরা অত্যন্ত সতর্ক রয়েছে। তারা চেষ্টা করে যাচ্ছেন অনুপ্রবেশ রোধ করার জন্য। তারপরও কতিপয় দালালদের সহযোগিতায় কিছু কিছু রোহিঙ্গার অনুপ্রবেশ ঘটছে। এদিকে রোহিঙ্গা প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক কায়সার পারভেজ চৌধুরী জানান, অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গারা দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে গেলে সেটা দেশের জন্য বহুমাত্রিক সমস্যা হয়ে দেখা দেবে। গত সাত দশক ধরে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন-নির্যাতন অব্যাহত রয়েছে। সর্বশেষ গত ৯ অক্টোবর সে দেশের একটি সীমান্ত চৌকিতে অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুটের ঘটনার পর রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের ওপর নির্বিচার নির্যাতন ও গণহত্যা শুরু হয়েছে। কক্সবাজারে ৭০ রোহিঙ্গা আটক:  মিয়ানমার থেকে ‘দালালদের’ মাধ্যমে অনুপ্রবেশের পর কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপনে থাকা রোহিঙ্গাসহ ৭০ জনকে আটক করার কথা জানিয়েছে পুলিশ। পুলিশ বলছে, আটকদের মধ্যে চারজন ‘দালাল’ এবং ক্যাম্পের নিবন্ধিত রোহিঙ্গা শরণার্থী রয়েছেন। বুধবার সকালে উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের বালুখালী এবং টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের উনচিপ্রাং এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয় বলে পুলিশ কর্মকর্তারা জানান। আটক চার ‘দালাল’ হলেন- উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের থাইংখালী এলাকার মোহাম্মদ সরওয়ার (১৮), কুতুপালং নিবন্ধিত শরণার্থী ক্যাম্পের বাসিন্দা মোহাম্মদ রফিক (২৯), টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের জাদিমুরা এলাকার ওসমান গণি (৩২) ও হোয়াইক্যং ইউনিয়নের লম্বাবিল এলাকার শাহ আলম (২৭)।
উখিয়া থানার ওসি মো. আবুল খায়ের বলেন, ‘সকালে বালুখালী সীমান্ত দিয়ে বেশকিছু রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে আশপাশের জঙ্গলে আত্মগোপন করে। খবর পেয়ে পুলিশ পালংখালীর থাইংখালী এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৬২ রোহিঙ্গা এবং দুই দালালকে আটক করে।’ দালালরা টাকার বিনিময়ে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে নিয়ে আসে বলে এই পুলিশ কর্মকর্তার ভাষ্য। টেকনাফ থানার ওসি মো. আবদুল মজিদ বলেন, ভোরে হোয়াইক্যং ইউনিয়নের উনচিপ্রাং এলাকা দিয়ে ‘দালালদের সহযোগিতায় কয়েকজন রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করেছে’ খবরে পুলিশ সেখানে অভিযান চালায়। পরে স্থানীয় একটি ঘর থেকে আট রোহিঙ্গা ও দুই দালালকে আটক করা হয়।