মাহে রমজান ফরজ হওয়ার বিধান

19

– মাওলানা জাহিদ হাসান
আলহামদুলিল্লাহ! একটি বছর পার করে পুনরায় পবিত্র রমজান মাস আজ আবার আমাদেরকে নেক অর্জন করার আওয়াজ তুলে জানান দিচ্ছে আমি হাজির। যার প্রথম ভাগে রহমত, দ্বিতীয় ভাগে মাগফিরাত, তৃতীয় ভাগে নাজাত বা জাহান্নাম থেকে মুক্তি। যাইহোক, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কোরআনে কারীমের সূরাতুল বাক্বারার ১৮৩ নম্বর আয়াতে বলছেন- হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা (সিয়াম/সওম) ফরজ করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের ওপর, যেন তোমরা পরহেজগারী অর্জন করতে পার।
‘সওম’ এর শাব্দিক অর্থ বিরত থাকা বা বেঁচে থাকা। শরীয়তের পরিভাষায় খাওয়া, পান করা এবং স্ত্রী সহবাস থেকে (সেহরি খাওয়া থেকে ইফতার খাওয়া পর্যন্ত) বিরত থাকার নাম ‘সওম’, যা প্রচলিত বাংলা ভাষাভাষী মানুষ হিসেবে আমরা যাকে রোজা বলে জানি। সুবহে সাদিক হওয়ার পূর্ব থেকে শুরু করে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোজার নিয়তে একাধারে এভাবে বিরত থাকলেই তা রোজা বলে গণ্য হবে। অনেকে মনে করতে পারেন, এক মিনিটে কি আসে যায়, কিন্তু না প্রকৃত এক মিনিটে অনেক কিছু এসে যায়। সূর্যাস্তের (ইফতারের) এক মিনিট আগেও যদি কেউ কোনো কিছু খেয়ে ফেলে, পান করে কিংবা সহবাস করে, তবে রোজা হবে না। অনুরূপ উপায়ে সবকিছু থেকে পূর্ণ দিবস বিরত থাকার পরও যদি রোজার নিয়্যত না থাকে, তবে তা রোজা হবে না। আয়াতে কারিমার মধ্যে আল্লাহ তায়ালা যে বলেছেন- পূর্ববর্তী উম্মতের ওপর রোজা ফরজ হওয়ার হুকুম দ্বারা বোঝানো হয়েছে রোজা যে শুধু তোমাদের ওপরে ফরজ করলাম তা নয়, আগেও করেছি। এখানে এ কথাও বোঝানো হয়েছে রোজা কষ্টকর একটা ইবাদত সত্য, তবে তা শুধুমাত্র তোমাদের ওপরেই ফরজ করা হয়নি, তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলোর ওপরও ফরজ করা হয়েছিল।
অন্যদিকে আল্লাহ তায়ালা বান্দার দিকে সহানুভূতির দৃষ্টিতে একথাও বলেছেন- রূগ্ন/অসুস্থ, মুসাফিরদের আল্লাহ তায়ালা ছাড়ও দিয়েছেন/অবকাশ দিয়েছেন। আবার একেবারে শয্যাশায়ীদের জন্য বিকল্প হিসেবে ফিদিয়ার ব্যবস্থা রেখেছেন যেহেতু রোজা আল্লাহ তায়ালার হুকুম সমূহের মধ্য হতে বহুত বড় এক হুকুম। আবার একথাও বলা হয়েছে যে, ফিদিয়া মসজিদ/মাদ্রাসার জন্য না, দরিদ্র অসহায় মিসকিন রোজাদারদের জন্য ব্যয়ীত হতে হবে।
হাদীস শরীফের মধ্যে এসছে- রোজা আমার জন্য এবং আমিই তাঁর প্রতিদান। একজন মুসলমানের স্কন্ধে ঈমান পরবর্তী শরয়ী যত বিধি-বিধান অর্পিত হয়, তার মধ্যে হতে রোজা হল অন্যতম ও অতীব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিধান। এর মাধ্যমেই সৃষ্টি তথা মানবজাতি তাঁর স্রষ্টার তথা আল্লাহ তা’য়ালার নৈকট্য অর্জনে সক্ষম হয়। আর এর মাধ্যমে সে দুনিয়া আখেরাতে মুক্তি অর্জন করতে পারে। রোজার গুরুত্ব, মাহাত্ম্য, শ্রেষ্ঠত্ব এর দ্বারাই স্পষ্ট হয়ে যায় যে, আল্লাহ তা’য়ালা একমাত্র রোজার জন্যই বলেছেন ‘রোজা একমাত্র আমার জন্য এবং আমিই তাঁর প্রতিদান’। অন্য কোনো ইবাদতের জন্য আল্লাহ তা’য়ালা এমনটি বলেননি। তবে সে বৈশিষ্ট্যের অধিকারী যেকোনো রোজাদার হবে এমনটিও নয়।
প্রকৃতপক্ষে ঐ রোজাদারই সেই বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হবে, যার রোজা নবী-রাসুল, সাহাবা, তাবেয়ী, তাবে তাবেয়ী, মুজতাহিদ ইমামগণ, ওলী-আউলিয়া ও নেককার বান্দাদের রোজার মতো হবে। অর্থাৎ আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নির্দেশিত পন্থা ও পদ্ধতিতে হবে। আর তখনই সম্ভব যখন সে সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জন হবে ও সে অনুযায়ী আমল করা হবে। পরিশেষে বলা যায়, রোজা মানুষের আত্মকল্যাণের মাধ্যম। মানবজাতির কল্যাণের লক্ষ্যে মানুষকে পানাহার থেকে বিরত রেখে পশুর স্তর থেকে ফেরেশতার স্তরে উন্নিতকরণ এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম। বরং সিয়াম সাধনার লক্ষ্যই হচ্ছে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন।
ফজিলত ও মর্যাদার দিক দিয়ে অন্যান্য মাসের তুলনায় বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাস হলো রমজান। আসলে রমজান মাসের এমন কোনো বিশেষ ফজিলত নেই যে, যার কারণে আল্লাহ রব্বুল আলামিন এ মাসে রোজা ফরজ করবেন। তবে রমজান মাস, কোরআন অবতারণের মাস। তাই সে বিশেষ মর্যাদা পেয়েছে। কোরআনের আলোই আলোকিত হয়েছে। এ জন্যই রমজান মাসের গুরুত্ব অন্যান্য মাসের তুলনায় অনেক গুণ বেশি। কোরআন অবতীর্ণ হওয়ার রাতও রমজান মাসে অন্তর্গত। যাইহোক আজ পহেলা রমজান, রমজানের বাকি দিনগুলোতেও আলোচনা করার এবং আমল করার তৌফিক আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা আমাদের সকলকে দান করুন। ‘আমিন’

লেখক, ইমাম ও খতিব
বায়তুল মামুর জামে মসজিদ
কলেজ রোড, চুয়াডাঙ্গা।